কৌশিক দাম
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতির সরকারি স্বীকৃতি জাতীয় স্তরে। লোকসভায় এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লোকসভায় এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে জানিয়েছেন যে, উত্তরবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প সহ সংলগ্ন বনাঞ্চলে বর্তমানে অন্তত দুটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ক্যামেরায় বন্দি হওয়া ছবি এবং ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই তথ্য রাজ্যসভায় পেশ করা হয়েছে। তবে ওই দুই বাঘের নির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জবাবে জানানো হয়নি।
উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বন দফতর ও বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা অনুসন্ধান চালাচ্ছেন।বিশেষ ভাবে কালিম্পঙের নেওড়াভ্যালি জাতীয় উদ্যানে ২০১৭ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘের ছবি ধরা পড়েছে।বন দফতরের ক্যামেরার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মোবাইল ক্যামেরাতেও একাধিকবার রয়্যাল বেঙ্গলের ছবি উঠে এসেছে।ফলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা,সংসদে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া দুই বাঘের তথ্যের সঙ্গে নেওড়াভ্যালিতে নিয়মিত বাঘের উপস্থিতির যোগসূত্র রয়েছে।
সিকিম ও ভুটান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত নেওড়াভ্যালি জাতীয় উদ্যান ঘন জঙ্গল,পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত।বন ও পরিবেশবিদদের মতে,এই এলাকার পরিবেশ বাঘের মতো বৃহৎ মাংসাশী প্রাণীর বসবাসের উপযোগী।বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অভিযান সাহা বলেন, ‘‘নেওড়াভ্যালি উত্তরবঙ্গের অন্যতম সংরক্ষিত ও দুর্গম বনাঞ্চল। বাঘ তফসিল-১ভুক্ত সর্বোচ্চ সুরক্ষিত বন্যপ্রাণ।কোনও জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি প্রমাণ করে সেখানকার সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র যথেষ্ট সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ।’’
দেশে প্রতি চার বছর অন্তর বাঘের সংখ্যা নির্ধারণে সর্বভারতীয় বাঘ শুমারি হয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত সরকারি স্ট্যাটাস রিপোর্ট অনুযায়ী, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ২০১৮ সালের ৮৮ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ১০১ হয়েছিল। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে ২০১৮ সালের আনুষ্ঠানিক বাঘ শুমারিতে কোনও বাঘের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়নি। ২০২২ সালের শুমারিতে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে একটি বাঘের উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল।
এদিকে নেওড়াভ্যালিতে চলতি বছরও বাঘের উপস্থিতি যাচাইয়ে শুমারি ও নমুনা সংগ্রহের কাজ হয়েছে। গরুমারা বন্যপ্রাণ বিভাগের এডিএফও রাজীব দে জানান, এপ্রিল-মে মাসে নেওড়াভ্যালিতে বাঘ শুমারির কাজ চালানো হয়েছে। জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা বাঘের মল এবং গাছের গায়ে নখের আঁচড়ের তাজা নমুনা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া-তে পাঠানো হয়েছে। ওই পরীক্ষার ফলাফল বাঘের সংখ্যা, বিচরণক্ষেত্র এবং জিনগত পরিচয় সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলে বাঘের উপস্থিতি শুধু একটি প্রাণীর ফিরে আসার খবর নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তাই বাঘের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করা, শিকার বন্ধ করা। বনাঞ্চলের সংযোগস্থল বা করিডর রক্ষা এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণের সংঘাত কমানোর উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবেশপ্রেমী মহলের দাবি, নেওড়াভ্যালিতে বাঘের নিয়মিত উপস্থিতির প্রমাণ এবং এলাকার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যকে সামনে রেখে দ্রুত এই বনাঞ্চলকে পূর্ণাঙ্গ ‘টাইগার রিজার্ভ’-এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।তাঁদের মতে, যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, সংরক্ষণ পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উত্তরবঙ্গ ফের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাঘের আবাসস্থলগুলির অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।
Comments :0