অনাদি সাহু
১০ আগস্ট, ২০২৬ শ্রমিক কৃষকদের দেশজুড়ে আইন অমান্য ও জেল ভরো কর্মসূচি সফল করতে হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী জনবিরোধী নীতির পরিবর্তনের দাবিতে শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলির ডাকে আগামী ১০ আগস্ট, ২০১৬ দেশজুড়ে আইন অমান্য ও জেল ভরো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৯ জুলাই, ২০২৬ দিল্লির তালকোটরা স্টেডিয়ামে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন, শিল্প ভিত্তিক ফেডারেশন এবং সংযুক্ত কিষান মোচার যৌথ উদ্যোগে শ্রমিক-কৃষকদের জাতীয় কনভেনশন থেকে কেন্দ্রের নীতির পরিবর্তন ঘটাতে দেশব্যাপী যৌথ আন্দোলন তীব্র করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে জেন জি’র সফল আন্দোলনের পর আগামী ১০ আগস্ট সারা দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কৃষক আরও একটি বড় লড়াইতে শামিল হতে চলেছে। যখন দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি ঘটছে, তখন পুঁজিপতিদের কর ছাড় জনগণের উপর কেন্দ্রীয় সরকার বিপুল হারে ট্যাক্সের বোঝা বৃদ্ধি করে চলেছে। প্রতিদিন পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরে লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকার লাগাম ছাড়াভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বেসরকারিকরণ করে চলেছে। কয়লা, ইস্পাত, রেল, বিমা, ব্যাঙ্ক, প্রতিরক্ষা, বন্দর, বিমান বন্দর সবই বিক্রি করা হচ্ছে। ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপ লাইনের নামে দেশের জাতীয় সম্পদ বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কার্যত লুট চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি ক্ষেত্রে সঙ্কট তীব্র হচ্ছে।
বিজেপি, আরএসএস’র নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার গত ১২ বছর ধরে দেশি-বিদেশি বৃহৎ পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন ও রূপায়ণ করে চলেছে। পরিণতিতে দেশে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, গরিবি বাড়ছে। শ্রমিক কৃষকের জীবন-জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
কল-কারখানায় শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থায়ী কাজে অস্থায়ী কন্ট্রাক্টচ্যুয়াল শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে। কৃষকরা ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক বৃদ্ধির ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতি তথা শিল্প ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, শ্রমিক কৃষকরা বেকারে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে ভারত মার্কিন আসাম বাণিজ্য চুক্তি আরও বড় বিপদ ডেকে আনতে চলেছে।
গত ছয় বছর ধরে শ্রমিক বিরোধী শ্রম কোডের বাতিলের দাবিতে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি ধারাবাহিকভাবে লড়াই চালাচ্ছে। শ্রমিক সমাবেশ, ধর্মঘট করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে শ্রমিক কৃষকদের দাবিতে যৌথভাবে ও সংযুক্ত কিষান মোর্চার সাথেও দেশজুড়ে শ্রমিক-কৃষক সমাবেশ, সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়েছে।
এতদ্সত্বেও সাম্রাজ্যবাদ ও বৃহৎ পুঁজিপতিদের চাপে নভেম্বর, ২০২৫ থেকে শ্রমকোড লাগু করা হয়েছে। গত ৮-৯ মে, ২০২৬ থেকে রুলস জারি করা হয়েছে। এতে সংগঠিত ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ শিল্পের ৯০ শতাংশ শ্রমিককে শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বকে জেল জরিমানায় অভিযুক্ত করার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। পরিবর্তে আইন ভঙ্গকারী দুর্নীতিগ্রস্ত মালিকদের জেল জরিমানা থেকে ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শ্রমিক বিরোধী এই নতুন আইনে ন্যূনতম মজুরি, ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার, স্থায়ী কাজে স্থায়ী চাকরির অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে। সর্বত্র কম মজুরিতে কন্ট্রাকচ্যুয়াল ব্যবস্থাকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার অধিকার নতুন আইনে অনেক ক্ষেত্রেই অস্বীকার করা হয়েছে। স্থাধীনতার ৭৯ বছর অতিবাহিত। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৯৫ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রে, জাতীয় সম্পদের প্রায় ৫০ শতাংশ এরা উৎপাদন করে অথচ এখনো অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা, বাঁচার মতো ন্যূনতম মজুরি বা আয় অনিশ্চিত। বিড়ি, নির্মাণ সহ বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকদের দের সুযোগ-সুবিধাকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করা, মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই করার অধিকারকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের চাপে পরে কৃষক বিরোধী তিনটি আইন প্রত্যাহার করতে কেন্দ্র বাধ্য হলেও প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আজও ফসলের দামের (এমএসপি) কেন্দ্রীয় আইন করা হয়নি। ফলে আজও ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে।
দেশজুড়ে কৃষক খেতমজুর ইউনিয়নের আন্দোলনের পরেও ভিবি রামজি প্রকল্প বাতিল করে এমজিএনআরইজিএ প্রকল্প ফিরিয়ে আনার দাবি, ২০০ দিনের কাজ, ৭০০ টাকা মজুরির দাবি কোনোটিই কেন্দ্র গ্রহণ করেনি।
দেশে গণতন্ত্রের পরিসর ক্রমশই সঙ্কুচিত হচ্ছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় বিভিন্ন ধারা, বিনা বিচারে আটক আইন (ইউএপিএ)’র প্রয়োগ, মহারাষ্ট্র বা পশ্চিমবাংলায় গুন্ডা দমন আইনের বিভিন্ন ধারায় বিনা বিচারে আটক বা আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগকে যেভাবে নস্যাৎ করা হয়েছে তা ভয়ঙ্কর।
সম্প্রতি জেন জি’র ছাত্র-যুবদের আন্দোলনে যেভাবে স্টেনগান, মেশিনগান ব্যবহার করার মতো ঘটনা ঘটলো বা দেশের সামগ্রিক ঘটনাবলি দেশে স্বৈরতন্ত্র ও নয়া ফ্যাসিবাদের পথে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক বিজেপি সঙ্ঘ পরিবার যে অগ্রসর হচ্ছে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে অস্বীকার করছেন, পার্লামেন্ট এড়িয়ে চলছেন। দেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে। সংবিধান প্রদত্ত প্রতিটি অধিকার রক্ষার প্রশ্নে শ্রমিক কৃষকরা রাস্তায় নামতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, শ্রমিক কৃষকের অধিকার, ছাত্র-যুবদের শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকার, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের অধিকারকেও রক্ষা করতে হবে। শ্রমিক বিরোধী শ্রমকোড বাতিল করতে হবে। তাই আসুন আগামী ১০ আগস্ট, ২০২৬ শ্রমিক-কৃষক খেতমজুরদের সাথে ছাত্র-যুব-মহিলা— সবাই আমাদের এই দেশ রক্ষার লড়াইতে শামিল হই।
গত ২৯জুলাই ’২৬ জাতীয় কনভেনশনের পর থেকে সারা দেশে ও রাজ্যে, জেলায় আইন অমান্য জেল ভরো কর্মসূচির প্রস্তুতি চলছে, জেলায় জেলায় শ্রমিক কৃষকদের যৌথ কনভেনশন প্রচার মিছিল মিটিং চলছে। রাজ্যের শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। রাজ্যের শ্রমিক কৃষকদের যৌথ সভা থেকে রাজ্যের ছাত্র-যুব-মহিলাদেরও এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামিল হতে আহ্বান জানানো হয়েছে। আশাকরি সামিল হবেন।
কেন্দ্রের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী, জনবিরোধী নীতির পরিবর্তনের দাবিতে শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলির ডাকে আগামী ১০ আগস্ট, ২০১৬ দেশজুড়ে আইন অমান্য ও জেল ভরো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২৯ জুলাই, ২০২৬ দিল্লির তালকোটরা স্টেডিয়ামে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন, শিল্প ভিত্তিক ফেডারেশন এবং সংযুক্ত কিষান মোচার যৌথ উদ্যোগে শ্রমিক-কৃষকদের জাতীয় কনভেনশন থেকে কেন্দ্রের নীতির পরিবর্তন ঘটাতে দেশব্যাপী যৌথ আন্দোলন তীব্র করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
Comments :0