মণ্ডা মিঠাই | রামমোহনের সংবাদ ও সাংবাদিকতা
ঋষিরাজ দাস
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ২৪ মে ২০২৬ | রাজা রামমোহন রায় ২৫৪
রাজা রামমোহন রায় বললেই সব সময় যে বিষয়টি মনে পড়ে যায় সেটি হল সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণভাবে রোধ করা। আবার একটু বুদ্ধি খাটালে দেখা যায়, ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠা ও তৎকালীন সমাজের সাথে রাজা রামমোহন রায়ের নাম চিরকালের মতো যুক্ত। কিন্তু আরও যদি খুঁটিয়ে দেখি তাহলে রাজা রামমোহন রায় কে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখা সত্বেও তাঁকে দেখা যাবে এক সাংবাদিক হিসেবে।
ভারতীয় সাংবাদিকতার একজন অন্যতম অগ্রদূত পথপ্রদর্শক এর নাম হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের নাম আজও উজ্জল। তৎকালীন সমাজে যখন একদিকে বিভিন্ন অনাচার, অত্যাচার, অবিচারের প্রতিবাদ করছেন রামমোহন তখন আরেক দিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য আলাদা আলাদা ভাষায় প্রকাশ করছেন বিভিন্ন পত্রিকা। ভাবা যায়? আজকালকার মডার্ন জেনারেশনকে এখনকার দিনে দাঁড়িয়ে এই কাজ করতে বললে তো তাদের অবস্থা যেরকম হবে তা অনেকেই আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, পারছেন এবং পারবেন। আবার সেই সাথে সরকারবিরোধী বক্তব্য লিখলে যেকোনো সময় পত্রিকার সম্পাদকের যে বাড়িতে বসে শুধু সময় কাটিয়ে সরকারের সবকিছু অন্যায় দেখে যেতে হবে সেটা রামমোহন ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাতেও তীব্র প্রতিবাদের মাধ্যমে ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন অন্যতম প্রথম পথিকৃৎ হলেন আমাদের "ভারতপথিক"। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত গঠনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন যে একমাত্র বাঙালি তিনিই হলেন রাজা রামমোহন রায়।
সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ নারী শিক্ষা এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত গড়ে তোলার জন্য ১৮২১- এ প্রথম সম্পাদনা করলেন বিখ্যাত বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা "সম্বাদ কৌমুদী"। সাথে সাথে শিক্ষিত সমাজ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে নিজের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চিন্তাভাবনা পৌঁছে দিতে ফার্সি ভাষায় অবাধ বিচরণকারী রাজা রামমোহন ১৮২২-এ সম্পাদনা করলেন দ্বিতীয় পত্রিকা ও একাধারে ফার্সি পত্রিকা "মীরাৎ-উল- আখবার"। আবার খ্রিস্টান মিশনারীদের হিন্দু ধর্ম বিরোধী প্রচারণার যৌক্তিক জবাব দিতে ১৮২১-এ "ব্রাহ্মণ সেবধি" নামক ইংরেজি- বাংলা দ্বিভাষিক পত্রিকা প্রকাশের পিছনে যে নামটি আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে সেই নামটি হল রাজা রামমোহন রায়।
রাজা রামমোহন সংবাদপত্রকে কেবল খবর পরিবেশন এর মাধ্যম হিসেবে না দেখে এটিকে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন । সতীদাহ প্রথার অমানবিকতা নিয়ে ধারাবাহিক নিবন্ধ লিখে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নারীর উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তির অধিকার নিয়ে পত্রিকায় জোড়ালো সওয়াল করেন একমাত্র রাজা রামমোহন। ভারতীয়দের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতি ও বিজ্ঞানের চেতনা ছড়িয়ে দিতে পত্রিকায় আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং লাতিন আমেরিকার বিপ্লবের মতো আন্তর্জাতিক খবর গুরুত্ব সহকারে ছাপাতে একটুও ভয় পাননি রাজা রামমোহন রায়। দেশীয়, আন্তর্জাতিক খবরের মেলবন্ধনে ভারতীয় সাংবাদিকতাকে বৈশ্বিক রূপ দিতে সাহায্য করবেন যে একজন দাপুটে বাঙালি ,তা ব্রিটিশ সরকার কোনো ভাবেই আঁচ পায়নি। আসলে তারা চলন বলনে দেখাতো পরাক্রমশালীতা, শাসনে দেখাতো অত্যাচারিতা। কিন্তু এসব তো শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো কান্ড। যখন ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারল রাজা রামমোহন সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে একের পর এক ঠোঁটকাটা ব্রিটিশ বিরোধী বক্তব্য পেশ করছেন তখন সামনে বেরিয়ে পড়ল তাদের ভীতসন্ত্রস্ত কান্ড। ১৮২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করতে "অর্ডিন্যান্স বা লাইসেন্স কানুন"জারি করে। ফলস্বরূপ ক্ষুব্ধ রাজা রামমোহন সুপ্রিম কোর্ট এবং ব্রিটিশ রাজ দরবারে এই কালো আইনের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি পাঠান। যদিও প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি নিজেই নিজের দ্বিতীয় কন্ঠকে কণ্ঠরোধ করলেন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে। অত্যন্ত জনপ্রিয় ফার্সি পত্রিকা "মীরাৎ-উল- আখবার"প্রকাশ করা বন্ধ করে দিলেন রাজা রামমোহন। রামমোহন যুক্তি দিয়েছিলেন স্বাধীন সংবাদপত্র এমন একটি বৈধ মাধ্যম যেখানে জনগণের ক্ষোভ ,দুঃখ ও অভাব-অভিযোগ সরকারের কাছে প্রকাশ করা যায়। রামমোহন এও উল্লেখ করেন সংবাদপত্রের মাধ্যমে ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস এবং বিশ্ব রাজনীতির সম্পর্কে জানতে পারছে। লাইসেন্স প্রথা চালু করলে এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ থমকে যাবে। সাথে রামমোহন যুক্তি দেন কোনো সংবাদপত্র যদি রাষ্ট্রদ্রোহী বা মানহানিকর কিছু প্রকাশ করে,তবে তার বিচারের জন্য দেশে প্রচলিত সাধারণ আইন ই যথেষ্ট। এর জন্য নতুন করে প্রতিটি পত্রিকা প্রকাশের আগে আগাম অনুমতি বা লাইসেন্স নেওয়ার নিয়ম করা অযৌক্তিক। তাই এই স্মারকলিপিটিকে ভারতের সাংবাদিকতার ইতিহাসে "সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রথম ম্যাগনাকার্টা"বলা হয়ে থাকে যার অন্যতম বাঙালি পথিকৃৎ হলেন রাজা রামমোহন রায়।
ওদিকে রাজা রামমোহন রায়ের প্রগতিশীল চিন্তাধারার বিরুদ্ধে সমসাময়িক রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল যার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো। ১৮২০ ও ১৮৩০ এর দশকে কলকাতার সাংবাদিকতা মূলত রামমোহনের "সংস্কারপন্থী দল" এবং রক্ষণশীলদের "সনাতনপন্থী দল" এর মধ্যেকার তীব্র আদর্শিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে রামমোহনের "সম্বাদ কৌমুদী"নামক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র লেখালেখি যখন শুরু করা হয় তখন রক্ষণশীল ভবানীচরণ তা মেনে নিতে পারেননি। তাই রামমোহনের মতবাদের বিরোধিতা করতে ভবানীচরণ ১৮২২ সালে প্রথম প্রকাশ করলেন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রধান মুখপত্র
"সমাচার চন্দ্রিকা"। রামমোহন তার প্রথম পত্রিকাতে শাস্ত্রীয় প্রমাণ দিয়ে দেখাতেন যে সতীদাহ ধর্মসম্মত নয়। জবাবে "সমাচার চন্দ্রিকা" দাবি করত এই প্রথা হিন্দু ধর্মের এক পবিত্র ও অপরিহার্য অঙ্গ এবং এটি বন্ধ করলে ধর্মনাশ হবে। সাংবাদিক রামমোহনের বেদান্ত ও উপনিষদ ভিত্তিক একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম প্রচারকে রক্ষণশীলরা সনাতন হিন্দু ধর্মের উপর আঘাত হিসেবে দেখতো । এমনকি "সমাচার চন্দ্রিকা"র সমর্থক দল "ধর্মসভা"(১৮৩০) রামমোহন কে "ধর্মদ্রোহী" ও "ম্লেচ্ছ" বলে আক্রমণ করত। সংস্কারক রামমোহনের ইংরেজি শিক্ষা এবং নারী শিক্ষার সমর্থনকে রক্ষণশীল পত্রিকা গুলি ধ্বংসের চক্রান্ত বলে প্রচার করত। রামমোহন ও রক্ষণশীলদের এই বিতর্ক কেবল যুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রক্ষণশীল পত্রিকা গুলো প্রায়শই রামমোহন এবং তার অনুসারীদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ ও উপহাস করত। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে ক্ষুদ্র রামমোহন অত্যন্ত সংযত যুক্তিপূর্ণ শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ পাল্টা জবাব দিতেন। তার এই যুক্তি খন্ডনের লড়াইয়ে তার নিজস্ব দ্বিভাষিক পত্রিকা "ব্রাহ্মণ সেবধি" গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই তীব্র সংবাদ যুদ্ধের ফলে তৎকালীন বাঙালির সমাজ স্পষ্টর দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তবে এই বিতর্কের একটি ইতিবাচক দিক ছিল এটাই যে এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পড়ার অভ্যাস বৃদ্ধি পায় এবং বাংলা গদ্য সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ ঘটে। বলতে গেলে এর পিছনে সাংবাদিক হিসেবে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা অপরিসীম।
রাজা রামমোহন রায় কেবল আধুনিক ভারতের স্রষ্টাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ভারতীয় মুক্ত সাংবাদিকতার প্রকৃত জনক। তাঁর সামগ্রিক সাংবাদিকতার ভূমিকা থেকে দেখা যায়, তিনি সংবাদমাধ্যমকে কেবল ব্যবসা বা খবর পরিবেশনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। একে তিনি সমাজ সংস্কার, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং শোষিতের অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮২৩ সালের স্মারকলিপির মাধ্যমে একমাত্র তিনিই প্রমাণ করেছিলেন যে, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের মুক্তি যে কোনো সভ্য সমাজের মৌলিক অধিকার। ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর এই আইনি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে পরবর্তীকালে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি তৈরি করেছিল। আবার রক্ষণশীল পত্রিকা গুলোর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে যুক্তি ও শাস্ত্রীয় প্রমাণের সাহায্যে নিজের মতবাদকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন তা ভারতীয় সাংবাদিকতার সুস্থ বিতর্ক ও জনমত ঘটনার এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
তাই সংক্ষেপে বলা যায়, রামমোহন রায় বাংলা ও ভারতীয় সাংবাদিকতাকে যে নির্বিকতা বহুভাষিক রূপ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা শিখিয়েছিলেন ----- তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
নবম শ্রেণী, কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ, উত্তর ২৪ পরগনা মজুমদার ভিলা, কল্যাণনগর, খড়দহ।
Comments :0