Editorial

ইথানল আসক্তির বিপদ

সম্পাদকীয় বিভাগ

শেষ পর্যন্ত সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে ইথানল মিশ্রিত পেট্রল জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার হলে গাড়ির মাইলেজ অর্থাৎ প্রতি লিটারে দূরত্ব অতিক্রম ৫ কিলোমিটার কমে যায়। বিশুদ্ধ পেট্রলে কোনও গাড়ি প্রতি লিটারে যত দূর যাবে ই-২০ জ্বালানিতে (৮০ শতাংশ পেট্রল ও ২০ শতাংশ ইথানলের মিশ্রণ) ৫ কিলোমিটার কম যাবে। অথচ পেট্রল এবং ই-২০-এর দাম কিন্তু প্রতি লিটার একই থাকবে। কম দূরত্ব গেলেও তুলনামূলকভাবে বেশি দামেই কিনতে হবে ই-২০। একমাত্র মাইলেজ ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে ই-২০ সুবিধাজনক বলে সরকার ব্যাখ্যা করতে চাইলেও ক্রেতারা বা গাড়ি ব্যবহাকারীরা তা মানতে চাইছেন না। কারণ নানা মহল থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছে ই-২০ জ্বালানিতে গাড়ির ইঞ্জিন সহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ, বিশেষ করে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিস্তর ক্ষতি হতে পারে। তাতে গাড়ির আয়ু ও কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এই বিতর্ক অবশ্য ভারতেই নয় আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপের যেখানে যেখানে ইথানলকে গাড়ির জ্বালানি হিসাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেখানেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে কোনও দেশেই ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা সহজ হয়নি। বিলম্বে এবং ধীর গতিতে চালু করা হলেও ৫ শতাংশ বা ১০ শতাংশের বেশি ইথানল মিশ্রণ চালু হয়নি।
ভারতে মোদী সরকার অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথমে ৫ শতাংশ পরে ১০ শতাংশ এমন ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ কার্যত জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে ২৫ শতাংশ মিশ্রণের প্রস্তাবও ঘোষণা হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো সরকারের এত তাড়াহুড়োর আদৌ কোনও যুক্তি আছি কি? মানুষের উদ্বেগ, আশঙ্কার নিরসন ঘটিয়ে তাদের সম্মত করেই কাজে নামা বাঞ্ছনীয়। গণতান্ত্রিক সরকারের এটা দায়বদ্ধতা।
ইথানল ব্যবহার গাড়ির মাইলেজ বা আয়ু হ্রাস করছে বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। ইথানল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সঙ্কট তৈরি হচ্ছে কিনা ভেবে দেখার দরকার আছে। ইথানল তৈরি হয় প্রধানত খাদ্যশস্য (ভুট্টা, মেইজ, চাল, গম ইত্যাদি) ও আখ থেকে। মানুষের খাবার যদি গাড়ির জ্বালানির কাজে ব্যবহার বাড়তে থাকে তাহলে বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হবার আশঙ্কা যেমন থাকে তেমনি খাদ্যশস্যের অত্যধিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দাম বাড়ার অতিরিক্ত বিপদ থাকে। তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মানুষের গড়ির জ্বালানির জোগান দিতে গিয়ে গরিব মানুষের খাবারে টান পড়বে না তো?
তাছাড়া এই সব ফসলের চাষ বাড়াতে গেলে সার, কীটনাশক, জলের ব্যবহার বাড়বে। তাতে সারের ভরতুকি অথবা দাম বাড়বে। কীটনাশক পরিবেশের ক্ষতি বাড়াবে।  আর অতিরিক্ত জলের ব্যবহার ভূগর্ভস্থ জলস্তর আরও নামাবে। তাছাড়া বর্তমান সেচ ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে।
মনে রাখতে হবে আগামী ১০০ বছর ধরে ভারতের জনসংখ্যা বাড়বে এবং জনসংখ্যায় বৃহত্তম দেশ থাকবে। চাষের জমি কিন্তু বাড়বে না। বরং কমে যাবে। বনভূমি ধ্বংসের আগ্রাসন বাড়বে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বর্ধিত খাদ্যের চাহিদা পূরণে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। জমি না বাড়াই একর প্রতি উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাতে সার, বিদ্যুৎ, জল ইত্যাদির জোগান বাড়াতে হবে। এই সবটাই পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক। এবার ইথানলের জন্য উৎপাদন বাড়াতে গেলে পরিবেশের দ্বিগুণ সর্বনাশ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

Comments :0

Login to leave a comment