প্রবন্ধ | ধর্মের প্রাচীর ভেঙে মানবতার মহাবিজয়
আকাশ বিশ্বাস
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৮ মে ২০২৬ | ঈদ মুবারক
আমরা মানুষরা হলাম সমাজবদ্ধ জীব। মানুষের বিপদে মানুষকে ছুটে আসতে হয়। এটাই তো মানবতা। মানুষের পরিচয় তার ধর্মের দ্বারা নয় তার কর্মের দ্বারা রচিত হয়। প্রত্যেক মানুষের রক্ত যখন লাল তাহলে মানুষে- মানুষে এত বিভেদ কিসের? আমরা যদি আগে মানুষই না হতে পারলাম তাহলে ধর্ম নিয়ে বড়াই করি কোন মুখে? হিন্দুরা যেমন কোনো চেনা-পরিচিত কে দেখলে “নমস্কার” বলে তেমনি মুসলমানরা চেনা-পরিচিত কে দেখলে “আসসালামু আলাইকুম" বলে। পদ্ধতি আলাদা হলেও দুই ধর্মের মানুষই তো শুভেচ্ছা জানায়।
ধর্মের আসল অর্থ -
বিভিন্ন ধর্মের( হিন্দু, মুসলিম,খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ প্রমুখ) মূল বক্তব্য হলো যে যেমন কর্ম করবে সে তেমন ফল পাবে। ধর্ম হলো মানুষের সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে একটু শান্তির অনুভূতি। কোনো ধর্মই অন্য ধর্মের চেয়ে বড় নয়। সব ধর্মই সমান। তবে তাদের চলার পথ আলাদা।
কেন মানবতা ধর্ম সবচেয়ে বড় ধর্ম?-
আমরা যদি মানবতাকেই প্রধান ধর্ম ধরি তাহলে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান,বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি হবে সেই ধর্মের বিভিন্ন মত। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, “ যত মত তত পথ” অর্থাৎ এই সমস্ত মতের আমরা মূল আদর্শ যদি খুঁজে পাই তবে আমাদের জীবনের বহু বন্ধ হয়ে যাওয়া পথ খুলে যাবে। হিন্দু ধর্মের আদর্শ দ্বারা যে পথ খোলা সম্ভব হচ্ছে না তা মুসলিম ধর্মের আদর্শ তারা খোলা যেতেও তো পারে। আসলে আমরা চেষ্টাই করিনি কোনদিন। সারা জীবন নিজের ধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্মকে সহ মর্যাদা দেয়নি। তাই আজকে সমাজে ঐক্য ভেঙে গেছে। মানুষ মানুষের জন্য লড়ে না মানুষ নিজের ধর্মের জন্য লড়ে।
বিবেকানন্দের মতো ধর্ম কি?-
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “ জীবে প্রেম করে যেইজন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর ”। একভাবে তিনিও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। রাস্তায় কোনো মানুষ অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে তার সেবা করা ধর্ম। সে কোন মতের তা জেনে তাকে ফেলে চলে যাওয়া ধর্মের নয়। আজকে যখন এক মুসলিম ব্যক্তি হাসপাতালের বেডে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে আছে এবং তার রক্তের প্রয়োজন না হলে সে বাঁচবে না। তাকে যখন রক্ত দেওয়া হয় সে কিন্তু জানে না তার শরীরে কোন ধর্মের মানুষের রক্ত যাচ্ছে। তাই এবার সময় এসেছে ধর্ম নামক প্রাচীর ভেঙে সমস্ত মতের মিলন ঘটানোর।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে ধর্ম কি?-
রবীন্দ্রনাথ ছিল বিশ্ব মানবতার পূজারী। তার মতে ঈশ্বর আলাদা কোথাও নেই মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস। তিনি বলেছেন, “ ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে ”। অর্থাৎ ধর্ম যখন মানুষের মায়ায় পরিনত হয় তখন মানুষ ধর্মের নামে ভন্ডামী শুরু করে এবং অন্য ধর্মকে ছোট চোখে দেখতে শুরু করে। ধর্ম ভুল নয়। আসলে মানুষ ধর্মের আসল আদর্শই প্রচার করতে পারে না।
কাজী নজরুল ইসলামের মতে ধর্ম কি?-
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মের নামে ভন্ডামীর তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতে মানুষের হৃদয়ে হলেও আসল মন্দির বা মসজিদ। তার মতো এমন কবি খুবই বিরল। তিনি এক হাতে রচনা করেছেন শ্যামাসঙ্গীত আর এক হাতে রচনা করেছেন ইসলামী গজল। তিনি বলেছেন, “ মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। হিন্দু যে তাহার নয়নমণি মুসলিম তাহার প্রাণ ”
লালন ফকিরের মত ধর্ম কি?- লালন ফকির ছিলেন একজন প্রকৃতিপ্রেম। তার কাছে হিন্দু, মুসলিম,বৌদ্ধ খ্রিস্টান কিছুই ভেদ ছিল না। তার গানের একটি লাইন -“ কেউ মালা কেউ তসবি গলে, তাই তো রে জাত ভিন্ন বলে, যাওয়া কিংবা আসার বেলায়, জাতের চিহ্ন রয় কারে? ”। কোন মানুষের গলায় মালা বা তসবি পড়িয়ে দিলে সে হিন্দু বা মুসলমান হয়ে যায় না। যখন করে মানুষ জন্ম এবং কোন মানুষের মৃত্যু তখন তো তা যাদের কোন চিহ্ন থাকে না। তাহলে এই ছোট্ট জীবন দশায় এত জাত পাতে ভেদাভেদ কিসের?
উৎসবের তাৎপর্য -
পবিত্র ঈদে যখন হিন্দু বাড়ির ছেলে বা মেয়েটি তার মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রিত হিসেবে যায় বা সরস্বতী পুজোতে যখন মুসলিম বাড়ির ছেলে বা মেয়েটি হিন্দু বন্ধুর সাথে দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করে তাতে কি তাদের জাত চলে যায় বা কোন ক্ষতি হয়? আসলে বিভেদ তো ঈশ্বর বা আল্লাহ করেননি। করেছে সাধারণ মানুষ তার নিচ মানসিকতার প্রমাণ দিতে। উৎসব হল মানুষে-মানুষে মিলন ঘটানোর একটা পন্থা তা সে যেই ধর্মেরই উৎসব হোক না কেন। উৎসব মানেই জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে গিয়ে একত্রিত হয়ে আনন্দের মেতে ওঠা।
উপসংহার-
পরিশেষে বলা যায়, “ সর্বধর্ম সমন্বয় ” কোন তর্কের বিষয় নয় মানুষের সকলের সাথে বেঁচে থাকার উপায় মাত্র। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন, “ কুকুর বা নদী একটা কিন্তু তার ঘাট অনেক ”। আমরা যতই ধর্ম নিয়ে বিভেদ করি সবশেষে একটা বিন্দুতে গিয়েই সবাইকে মিলতে হবে। যেখানে সবার পরিচয় হবে কেবল মানুষ এবং সেই মানুষের গায়ে কোন ধর্মের দাগ নেই।
দশম শ্রেণী কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগনা কল্যাণনগর খড়দহ
Comments :0