Ram Mandir ' Daanchori'

সঙ্ঘ নেতাকে ঘিরে বিমানে ‘দান চোর’ স্লোগান

জাতীয়

যেন সরকার বদলের পর পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের মতো অবস্থা। লক্ষ্ণৌ থেকে বেঙ্গালুরুগামী বিমানে আরএসএস নেতা, রামমন্দিরে দানের টাকা চুরির অন্যতম অভিযুক্ত গোপাল রাওকে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিলেন যাত্রীরা। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার সকালে। শনিবার যাত্রীদের থেকে ঘটনার বিবরণ জেনে একটি হিন্দি দৈনিক সংবাদটি প্রকাশ করেছে। জানা গেছে, ওইদিন সকাল সাতটা পাঁচের ইন্ডিগোর বিমানে লক্ষ্ণৌ থেকে বেঙ্গালুরু যাচ্ছিলেন গোপাল রাও। বিমানে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওই নেতাকে দেখেই যাত্রীরা ‘দান চোর’, ‘চাঁদা চোর’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আসেন বিমান ক্রু-রা। তাঁরা ওই যাত্রীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করেন। এদিকে শঙ্করাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দ শনিবার আরএসএস-ভিএইচপি নেতাদের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে বলেছেন, ভগবানের ঘরে এত বড় চুরি করে শুধু ইস্তফা দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। এটা কী নাটক চলছে! সরকার যদি এই অভিযুক্তদের জেলে না পাঠায় তাহলে জনতা এদের মারবে। 
এরমধ্যেই শনিবার আরএসএস-বিজেপি’র সমস্যা আরও বাড়িয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব লক্ষ্মীনারায়ণ বলেছেন, তিনি সোনায় মোড়া রামচরিতমানস দিয়েছিলেন রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের হাতে। সেটি গায়েব হয়ে গেছে। এই নিয়ে জানতে চাইলে তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি এদিন বলেছেন, ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল এক কিলো আড়াইশো গ্রাম ওজনের রামচরিতমানস আমার মা মন্দির ট্রাস্টকে দান করে। রামচরিতমানসের ওই সংস্করণটি অনেক পুরনো এবং দুর্লভ বলে তিনি জানিয়েছেন। ১ হাজার পাতার ওই রামচরিতমানসে প্রতিটি পাতায় ২৪ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দিয়ে রামমন্দির ট্রাস্টকে দান করা হয়। যার মূল্য কম করে ৫ কোটি টাকা। কথা ছিল, বইটি মন্দিরে রাখা থাকবে। একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে প্রাক্তন এই আইএএস বলেছেন, তিন-চার মাস বাদে আমি অযোধ্যায় চম্পত রায়ের কাছে যখন যাই, আমাকে ৯ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। আমি হাত জোড় করে বলি, স্যার এটা আমার গোটা জীবনের পুঁজি। রামচরিতমানসটি মন্দিরে রেখে দিন। তখন চম্পত রায় বলেন, আমার কাছে বহু লোক অলঙ্কার দিয়ে যায়, এখন কী শুধু এইসবেরই প্রদর্শন করব? এখানেই শেষ নয়, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় এই স্বরাষ্ট্র সচিব বলেছেন, এরপর আমি মন্দির নির্মাণ সমিতির সভাপতি নৃপেন্দ্র মিশ্র এবং ট্রাস্টের সদস্য গোপাল রাওয়ের সঙ্গেও সাক্ষাত করি। কিন্তু কিছু হয়নি। তারপর আমি আবার অযোধ্যা যাই। চার ঘন্টা বসিয়ে রাখার পরে চম্পত রায় দেখা করেন। তিনি স্পষ্ট বলে দেন, আমার কিছু করার নেই। আপনার যেখানে যাওয়ার যান। স্বাভাবিকভাবেই এত বড় পদে থাকা এক ব্যক্তির অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ কিছুই জানতেন না, এটা হতে পারে? উঠছে প্রশ্ন। 
রামমন্দিরের দানের টাকা চুরি নিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মধ্যেও অশান্তি চরমে উঠেছে। মিডিয়ার নজরদারি, এসআইটি তদন্ত ইত্যাদির জেরে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমিতির বৈঠক অযোধ্যা থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ভিএইচপি। দিল্লিতে সংগঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করা হবে বলে স্থির হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের জাতীয় মুখপাত্র বিনোদ বনসল জানিয়েছেন, এসআইটি তদন্তের জন্যই বৈঠক অযোধ্যা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। শুধু বৈঠকের স্থান বদল নয়, আগে স্থির ছিল ৩৫০ জনের বৈঠক হবে। এখন বৈঠকে যোগ দিতে পারা দেশের নানা প্রান্তের পদাধিকারীদের কমিয়ে ১৫০ করে দেওয়া হয়েছে। জুনের ২৫ থেকে ২৯ পাঁচ দিন ধরে এই বৈঠক করার কথা ছিল অযোধ্যায়। এখন ঠিক করা হয়েছে সেই বৈঠক হবে ১৮-১৯ জুলাই দিল্লিতে। অর্থাৎ পাঁচ দিনের বৈঠক এখন দুই দিনেই সারা হবে। বছরে দুই বার এই বৈঠক বা অধিবেশন বসে ভিএইচপি’র। এটাকে নীতি নির্ধারণ বৈঠক ধরা হয়। রামমন্দির ট্রাস্ট চম্পত রায়কে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার উপরও বৈঠকের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
বৈঠকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সর্বভারতীয় সভাপতি আলোক কুমার, জাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মিলিন্দ পরাণ্ডে এবং কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বজরঙ লাল বাগড়াও উপস্থিত থাকবেন। তবে সর্বভারতীয় সহসভাপতি চম্পত রায় থাকবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বৈঠকে চম্পত রায়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও সিদ্ধান্ত হতে পারে। রামমন্দির ট্রাস্ট থেকে চম্পত রায়কে সরানো হলে কী দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যেই সংগঠনের মধ্যে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে চম্পত রায়ে অযোধ্যার মন্দিরের দানের অর্থ ও সম্পত্তি নিয়ে যা যা করেছেন, তার সবটাই সংগঠনের স্বার্থে এবং এই বিষয়ে সবাই অবগত আছেন। এখন তাকেই বলির পাঁঠা করা হচ্ছে কেন? অযোধ্যাতেও শনিবার চম্পত রায় পন্থী ভিএইচপি’র সাধুরা নেমে পড়েছে তাঁর পক্ষে। এখানের হাজারা মন্দিরে বৈঠক করে এদিন তাঁরা দাবি তুলেছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চম্পত রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। অযোধ্যার বেশ কয়েকটি বড় মন্দিরের মহন্তরা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে মহন্ত রাঘবেশ দাস বেদান্তি বলেছেন, ট্রাস্টের বৈঠকে যেন চম্পত রায়ের ইস্তফা মঞ্জুর করা না হয়। অন্যদিকে, আরএসএস এবং কেন্দ্র-রাজ্যের বিজেপি সরকার রামমন্দিরের দানের অর্থ অলঙ্কর সহ বহুমূল্য সামগ্রীর লুট নিয়ে যেভাবে বেকায়দায় পড়েছে, তাতে জনসমক্ষে বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরানোর চেষ্টায় কিছু পদক্ষেপ করতেই হবে সংগঠনকে। সব মিলিয়ে উভয় সঙ্কটে সঙ্ঘ-ভিএইচপি।
এরমধ্যেই সোমবার শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের বৈঠক হতে চলেছে। সেই বৈঠকের আলোচ্যসূচি এদিন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে বৈঠকে চম্পত রায়, অনিল মিশ্রর ইস্তফা, এসআইটি তদন্ত এবং আয়ব্যয়ের হিসেব নিয়ে আলোচনা হবে।

Comments :0

Login to leave a comment