West Bengal Election

শত্রু-মিত্র চিনেই ভোট, বললেন মাথাভাঙ্গার পরিযায়ী শ্রমিকেরা

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

জয়ন্ত সাহা: মাথাভাঙা
ভিনরাজ্যে কাজে গিয়ে প্রাণহানি হলে ফিরেও দেখে না রাজ্য কিংবা কেন্দ্রের সরকার! উদাসীন থাকে সাংসদ থেকে বিধায়ক। অথচ ভোটের মুখে সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট পেতে বিজেপি আর তৃণমূলের নেতাদের হরেক ফন্দি-ফিকির চলছে কোচবিহার জেলা জুড়ে! মাত্র চার দিন আগেই সিতাই বিধানসভা কেন্দ্রের ব্রহ্মত্তরচাত্রা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার জাটিগাড়া গ্রামের সুজন বর্মন(৩৫),আর রাকেশ রায়(২৫)’র কফিন বন্দী নিথর দেহ বেঙালুরু থেকে গ্রামে ফিরেছে। পথ দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ওঁরা দুজনেই ছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক। দুর্ঘটনার আগের দিন রাতেও সুজন বর্মন স্ত্রীকে ফোন করে বলেছিল,‘‘ভোট দিতে ঘরে ফিরছি।’’ 
আগামী ২৩ এপ্রিল ভোট গ্রহণ, তার আগেই কোচবিহার জেলার সব বিধানসভা কেন্দ্রের লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক এখন ঘরমুখো। এবারে ভোট না দিলে নাকি ভোটার লিস্ট থেকে নাম কাটা যাবে! সেই আতঙ্কেই এখন কাজ ছেড়ে সবাই ঘরমুখো এই মুহুর্তে। মাথাভাঙার নিজাম উদ্দিন,কুতুব মিয়া সহ ১০ জনের একটা দল বৃহস্পতিবারই কেরালা থেকে বাড়ি ফিরেছেন। নিজাম উদ্দিন বলেন, চারদিকে যা সব গুজব ছড়াচ্ছিল তাই আর কোন রিস্ক নিলাম না। বাড়ি চলেই এলাম। ফিরবো ভোট দিয়েই।
নিউ কোচবিহার স্টেশনে এখন দক্ষিণের রাজ্য গুলি থেকে ফেরার ভীড়ের কথা মানলেন উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের জনসংযোগ আধিকারিক নীলাঞ্জন দেবও। গত ৫ তারিখ থেকে চলছে বেশ কিছু স্পেশাল ট্রেনও। এর মধ্যে আছে কানপুর সেন্ট্রাল- গুয়াহাটি ০৪১২৭, হাওড়া-গুয়াহাটি ০৩০৫৩, সহ ত্রিবান্দম-ডিব্রুগড়, চেন্নাই-ডিব্রুগড়,আমেদাবাদ-ডিব্রুগড়,মালদা-ডিব্রুগড় সহ একাধিক ট্রেন। সব মিলিয়ে চলবে ২০ জোড়া  ট্রেন!
রেল দপ্তর যখন পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে স্পেশাল ট্রেন চালাতে শুরু করেছে তখন জেলা বিজেপি নেতাদের মুখেই শোনা যাচ্ছে দলের পক্ষ থেকে সুরাট ও মুম্বাই থেকে অন্তত ১০ টি ট্রেন ভাড়া করে ভোটারদের রাজ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে। সবটাই নিয়ন্ত্রণ করছে সুরাট ও মুম্বাইয়ের আরএসএসের শাখা। কোচবিহারের আরএসএসের এক সংগঠক বলেন, সুরাটে এ রাজ্যের সব মিলিয়ে দেড় লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক রয়েছে। এদেরকে ১৮ তারিখ থেকে ট্রেনে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আরএসএসের কর্তার কথার সত্যতা মিলেছে জামালদহের বাসিন্দা শিবেন বর্মনের কথায়ও। শিবেন সহ ৮ জনের একটা দল সুরাটেই কাজ করেন। বুধবার ওঁরা গ্রামে ফিরেছেন ভোট দিতে। শিবেনের কথায়,‘‘ওখানকার কিছু লোক আমাদের সাথে ফ্রি ট্রেনে বাড়ি ফেরার জন্য তালিকায় নাম লেখাতে বলেছিল। কিন্তু ভোটের পর ফের সুরাটে ফিরতে হবে নিজেদের টাকাতেই। বুঝতে পারছিলাম ভোট নেওয়ার এটা একটা কায়দা। তাই এড়িয়ে গেছি ওদের।’’
ইতিমধ্যে যারা ভিন রাজ্য্য থেকে ভোটের জন্য ঘরে ফিরেছেন তারা অবশ্য ভোট পেতে বিজেপি- তৃণমূলের লোক দেখানো আদিখ্যেতায় ভুলতে রাজি নন। বিহারের ইঁটভাটার শ্রমিক সুনীতি বর্মন, দিনোবালা রায়দের সাফ কথা,‘‘হামরালার ফির ভোট বেড়াইলে ঘর ছাড়ি বিদেশত(ভিন রাজ্যে) যাওয়ায় নাইগবে। সগাকে চেনা হয়া গেইছে। ভোট কাক দেইম মনোতে আছে হামারলার। হামরালা আগোতে ভালো ছিলং।’’ বুঝতে কষ্ট হয় নি, কি বলতে চাইছেন ভোটের কারণে গ্রামে ফেরা পরিযায়ী শ্রমিকেরা। 
শিতলখুচির সিপিআই(এম) প্রার্থী নমদীপ্তি অধিকারী বলেন, তাঁর বিধানসভা কেন্দ্রের সব মিলিয়ে প্রায় এক লক্ষ ভোটার বাইরের রাজ্যে কাজ করেন। তার মধ্যে ইঁটভাটার শ্রমিকই ৫০ হাজার। ওঁরা ফি বছর অক্টোবর- নভেম্বর মাসে বিহারে যায়। ফেরে সেই বর্ষার আগে। এবারে ভোটের জন্য আগেই ফিরবেন ওরা। ফোনে যোগাযোগ হচ্ছে তাঁদের সঙ্গে। 
লালবাজারের ওসমান গনি সপরিবারে কাজ করেন বিহারের গয়া জেলার এক ইঁটভাটায়। বাড়ি পাহারা দিচ্ছেন তাঁর বৃদ্ধ বাবা আর মা। বৃহস্পতিবার লালবাজারের ওসমান গনির বাড়িতে বসে  বাবার ফোন থেকে কথা হল ওসমানের সাথে। ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন,আপনি কোন দলের? নিজের পরিচয় দিতেই বললেন, ‘‘তৃণমূল আর বিজেপি’র নেতারা বাবার থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে ভোট দিতে যেতে বলেছে বারবার।’’ তারপরেই বললেন,‘‘জানেন যখন কাজ চাইতে ওদের কাছে যেতাম দূরদূর করে তাড়িয়ে দিত। ভোট দিতে তো যাবোই। তবে এবার হিসেব করেই ভোট দেব।’’ ফোনটা কেটে যাওয়ায় আর জানা হয় নি ওসমান গনিদের হিসেবটা ঠিক কি?
নিশিগঞ্জের সুধন্য সরকার আমেদাবাদে কাজ করেন। দুদিন আগেই বাড়ি ফিরেছেন ভোট দিতে। বৃহস্পতিবার সুজন চক্রবর্তীর সভা শুনছিলেন দুরে দাঁড়িয়ে। বললেন, ‘‘যারা গ্রামে কাজের ব্যবস্থা করতে পারবে আমার পরিবারের ভোট তাদের জন্য। আর যাদের জন্য গ্রাম ছেড়ে ভিন রাজ্যে যেতে হয়েছে তারা ভোটের সময়ে যত মিষ্টি কথাই বলুক না কেন তারা আমাদের বন্ধু হতে পারে না।’’ জেলা জুড়েই ভোট কুড়োতে পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি বিজেপি আর তৃণমূলের দরদ উথলে উঠলেও জীবনের অভিজ্ঞতায় শত্রু-মিত্র চিনেই ২৩ এপ্রিল ভোটের লাইনে দাঁড়াবে পরিযায়ী শ্রমিকেরা।
এদিন মাথাভাঙার নিশিগঞ্জে এক সভায় সুজন চক্রবর্তী বলেন, বামফ্রন্ট ফের ক্ষমতায় ফিরে এলে জেলায় নতুন নতুন শিল্প হবে। বাড়বে মজুরি। ফেরানো হবে পরিযায়ী শ্রমিকদের। মায়ের কাছে ফিরবে সন্তান, স্ত্রীর কাছে ফিরবে স্বামী।

Comments :0

Login to leave a comment