JOURNEY — SUMAN CHATARJEE — BEDESHAR / TEN SHAHARER ITIKATHA — MUKTADHARA — 2026 MAY 2, 3rd YEAR

ভ্রমণ — সুমন চ্যাটার্জী — বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা — মুক্তধারা — ২০২৬ মে ২, বর্ষ ৩

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  SUMAN CHATARJEE  BEDESHAR  TEN SHAHARER ITIKATHA  MUKTADHARA  2026 MAY 2 3rd YEAR

ভ্রমণ

মুক্তধারা

বিদেশের / তিন শহরের ইতিকথা
 

সুমন চ্যাটার্জী 

২০২৬ মে ২, বর্ষ ৩

 

প্রাগ: সবকিছুই দেখাযায়, শুধু ইতিহাসটা ছাড়া

শহরের ভিতরটা একটু গভীরভাবে দেখলেই খুব স্পষ্টভাবেবোঝা যায়, এই স্থাপত্যগুলি নিছক অতীতের অবশেষ মাত্র নয়, এগুলি বরং বলতে চায় এক না বলতে চাওয়া ইতিহাস। প্রাগ কংগ্রেস সেন্টার, কোতভা ডিপার্টমেন্ট স্টোর-সবকিছুই আজ এক নতুন কাজে লাগছে, কিন্তু তাঁদের শরীরে লেগে আছে সেই সময়ের ভাষা। হোটেল পিরামিডা বা স্রাহভ টানেলের কন্ট্রোল বিল্ডিং, এগুলি আজ শহরের স্বাভাবিক অংশ, অথচ তাঁদের জন্ম হয়েছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকে।

শহরের প্রান্তে গেলে সেই অনুভূতিটাআরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিঝনি মেস্তোর প্যানেলাকের সারি, একই রকম জানালা, একই উচ্চতা, একই রকম সবকিছু—এক ধরণের 'সমতার' স্থাপত্যিকরূপ। কিন্তু সেই সমতার ভেতরে যে জীবন চলত তার চিহ্ন এখন আর আলাদা করে চোখে পড়ে না। লোকজন থাকে, বাসস্টপে দাঁড়ায়, ট্রামে ওঠে, সবকিছুই চলছে। কিন্তু এই দৈনন্দিনতারভিতরে ইতিহাস নিজেকে আলাদা করে জানান দেয় না।

বরং এই শহরকে পড়তে গেলে খেয়াল করতে হয় সেইসব জায়গা, যেখানে কোন ব্যাখ্যা নেই। সেখানে কিছুই লেখা নেই, বলার জন্য কেউ দাঁড়িয়েও নেই কিন্তু এই নীরবতাই আসলে একটি সুনির্দিষ্টসময়কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। যার ছত্রে ছত্রে সময়ের সোচ্চার নিদর্শন। এই উপস্থিতি এবং নিদর্শন আরও স্পষ্ট হয় যখন শহরের সেই জায়গাগুলোতেযাওয়া হয়, যেগুলো একসময় এক নিতান্তই ভিন্ন অর্থ বহন করত। লেতনা পার্কে দাঁড়িয়ে থাকা মেট্রোনম—একসময় যেখানে স্ট্যালিনেরবিশাল মূর্তি ছিল, আজ সেখানে কেবল সময়ের মাপজোক। মূর্তি নেই কিন্তু তাঁর ভিত্তিটা, চৌকোণা পাথরটা এখনও রয়ে গেছে এবং সেই শূন্যতাই যেন বেশি কথা বলে।

হোটেল ইয়াল্টার নিচের পারমাণবিক বাঙ্কার, একসময় যা ছিল নিরাপত্তাও আশঙ্কার প্রতীক, আজ তা এক টুরিস্ট স্পট। গাইডের ব্যাখ্যা, আলো, প্রদর্শনী—সব মিলিয়ে এক পরিপূর্ণ শো। একইভাবে আণ্ডেল মেট্রো স্টেশনের দেওয়ালের শিল্পকর্মগুলি আজও ইতিহাসের দ্যোতনা বহন করে চলেছে। এগুলি মুছে ফেলা হয়নি, আবার আগের মতন রেখে দেওয়াও হয়নি, বরং এমনভাবে বদলানো হয়েছে যাতে তাঁরা সরাসরি কিছু না বলে শুধু ইঙ্গিত করে। এই ইঙ্গিতের ভিতরেই পুরনো সময় টিকে থাকে, কিন্তু ভাবপ্রকাশের পদ্ধতি বদলে যায়।

এই ভাষা বদলের বিষয়টা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেইসকল জায়গাগুলোয়, যেখানে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে। কমিউনিজম মিউজিয়ামেরভিতরে ঢুকলে এক ধরণের সাজানো বর্ণনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। পোস্টার, ক্লাসরুমেরছবি, নজরদারির গল্প—সবকিছুই রয়েছে কিন্তু এক সুনির্দিষ্টফ্রেমে, জটিলতা কমিয়ে একটি নির্দিষ্ট আখ্যানকে তুলে ধরা হয়েছে। ন্যারোদনিস্ট্রিটের ভেলভেট বিপ্লবের স্মারক বা জান পালাখের মেমোরিয়াল—এগুলো নিঃসন্দেহেগুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকেআলাদা করে তুলে ধরে। কিন্তু সেই টাইম স্ট্যাম্পেরআগে ও পরে যে দীর্ঘ সময়, যে আপোষ ও বাস্তব—সেগুলো একেবারেই দৃশ্যমান নয়। ইতিহাস এখানে অনুপস্থিত নয়, কিন্তু অতি অবশ্যই সম্পূর্ণওনয়।

এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, স্মৃতি কেবলমাত্র সংরক্ষিত হয় না, তাঁকে বেছে নেওয়া হয়, গড়ে তোলা হয় এবং কখনও তাকে নতুনভাবে সাজানো হয়। শহর নিজেই ঠিক করে দেয় চোখের সামনে কী থাকবে আর কোনগুলি নেপথ্যে সরে যাবে। বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিশহরের পার্কগুলোতেবসে থাকলে বা ট্রামলাইনধরে চলতে-চলতে আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কোথাও কোন ফলক নেই, ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু তবুও যেন জায়গাগুলো ফাঁকা নয়। অনুপস্থিতিওএকপ্রকার উপস্থিতি।কিছু ছিল, কিছু মরে গিয়েছে বা সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু তার খালি জায়গাটা যেন আরও বেশি সোচ্চারে সেই অদৃশ্য উপস্থিতি ঘোষণা করে চলেছে।

দিনের শেষে ফিরে তাকালে মনে হয়, প্রাগ আসলে কিছুই লুকোয় না আবার সবকিছু দেখায়ও না। সে তার অতীতকে মুছে ফেলেনি আবার সেগুলিকে ধুলো ঝেড়ে চকচকে করেও রাখেনি। বরং সারা শরীর জুড়ে সেগুলিকে এমনভাবে ছড়িয়ে রেখেছে, যাতে একটু চোখ-কান খোলা রেখে খুঁজে পেতে হয়।

এই শহর মনে রাখে, কিন্তু নিজের মতন করে। ঠিক যতটুকু দেখাতে চায়, ঠিক ততটুকুই; আর বাকিটা রয়ে যায় চোখের সামনে থেকেও, অদৃশ্য হয়ে।

 

চলবে

Comments :0

Login to leave a comment