প্রবন্ধ
মুক্তধারা
বই ও সত্যজিৎ
ঋষিরাজ দাস
২০২৬ এপ্রিল ২৩
-------------------------------------
"বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় না।"
----সৈয়দ মুজতবা আলী
সত্যিই হয়তো কেউ কোনোদিন বই কিনে দেউলিয়া হয় না । কারণ তার ভিতরে জ্ঞানের ভান্ডার যে ভরে ওঠে। শ্রেষ্ঠ শিক্ষা হলো আত্মশিখন আর বই হলো সেই আত্মশিখনের সহায়ক। বিনোদন থেকে শিক্ষা, অবসর যাপন থেকে নিঃসঙ্গতা দূর--------- সবেতেই বই ই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন হতে পারে । বই অনেকটা আমাদের কাছে মায়ের মতন। মা যেমন কখনো শাসন করে, কখনো বা ভালোবাসা দিয়ে আমাদের সঠিক জীবনধারায় গড়ে তোলে, ঠিক তেমনি বই আমাদেরকে কোনো ভ্রান্ত ধারণা থেকে সঠিক ধারণার জন্য এক অজ্ঞাত আলোর দিশা হিসেবে কাজ করে। পাঠকের কাছে বিশ্ব ভ্রমণ হয়তো সব সময় সাধ্যের মধ্যে নাও হতে পারে।কিন্তু ২০ সেমি.×১৪ সেমি. মাপের বইয়ের পাতা পাঠককে হাত ধরে নিয়ে যায় বিদেশের শেক্সপিয়ারের কাছে, আরব্য রজনীর আরব দেশের কাছে, মিশরের রহস্য জানতে মিশরে, চার্লস ডিকেন্সের ইনভিজিবল ম্যানের ক্ষমতা জানতে। জীবনে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম কারণ বই জ্ঞান অর্জন, মানসিক বিকাশ এবং জীবনযাত্রার ধরন বদলে দিতে সাহায্য করে। বই আমাদের জীবনে চলার সঙ্গী যা দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করে এবং সফলতার পথ দেখায়। একদিকে যেমন পাওলো কোয়েলহোর 'ডি অ্যালকেমিস্ট' , 'ইকিগাই' বা আত্মউন্নয়নমূলক বই জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে,আবার অন্যদিকে মানুষের নিত্যদিনের প্রতিমুহূর্তের সুখ , দুঃখ, হাসি , কান্না, আবেগ অনুভূতির সাথে নিজেকে আত্মস্থ করতে শিখিয়েছে রবি ঠাকুর , বিভূতিভূষণ কিংবা শরৎ সাহিত্য । কেবল জীবনের গভীর অনুভূতিতেই নয়, কল্পনার জগতের কল্পবিলাস হতে শিখিয়েছে এই বই-ই।
বই এবং বইয়ের পাঠক উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা ছায়া ও কায়ার মতন। কেউ কারুর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বই পাঠক ছাড়া অপূর্ণ, পাঠক বই ছাড়া অপূর্ণ। দিনটি ২৩ এপ্রিল। বিশ্ব বই দিবস। দিনটি পাঠকের কাছে যেরকম মুক্ত জ্ঞানের দিন তেমনি এই দিনটি এক বিশেষ পাঠকের জীবন বেলার শেষ মুহূর্তের দিন। ১৯৯৩ সালের এই দিন আমাদের জানা বাকি রয়ে গিয়েছিল "আদিত্য বর্ধনের আবিষ্কার " এর বাকি পার্ট । সাথে আরও বাকি থেকে গিয়েছিল "ড্রেক্সেল আইল্যান্ডের ঘটনা" এর বাকি পাঠ । হ্যাঁ আমি সত্যজিৎ রায়ের কথা বলছি যার হাতে সৃষ্টি হয়েছিল বাঙ্গালীদের অবিস্মরণীয় গ্রন্থ চরিত্র ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু, কিংবা রহস্য রোমাঞ্চকর বিজ্ঞানী প্রোফেসর শঙ্কু বা গল্পকার তারিণীখুড়োর। 'অ্যাবস্ট্রাকশন' নামে একটি ইংরেজি গল্প দিয়ে লেখার জগতে সত্যজিতের প্রথম আত্মপ্রকাশ হয় ১৯৪১ এ। ১৯৬১ তে সন্দেশ পত্রিকার পুনঃপ্রকাশ উপলক্ষে সত্যজিৎ রায় প্রথম শুরু করেন বাংলা সাহিত্য রচনা। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সন্দেশ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হলো ফেলুদা কাহিনি , 'ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি"। পরের দুমাস ধারাবাহিকভাবে চলার পরেই অজস্র চিঠি ফোন কল ইত্যাদি আসতে শুরু করল।
বইয়ের জগতে সৃষ্টি হল এক নতুন মাইলস্টোন। আবার প্রফেসর শঙ্কু কে নিয়ে প্রথম কাহিনী বেরোলো
"ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি"নামে। সাথে তৈরি হল গল্প বলিয়ে তারিণী খুড়ো। লিখলেন আত্মজীবনী " যখন ছোট ছিলাম "।তার লেখা হয়তো কিশোর-তরুণদের জন্য কিন্তু সেই লেখা মন কেড়ে নিয়েছিল আবালবৃদ্ধবনিতার। অনুবাদের জগতেও সত্যজিতের অবাধ বিচরণ। লুইস ক্যারলের এর লেখা গল্প "জবরখাকি" তিনি যেমন অনুবাদ করেছেন, ঠিক তেমনি অনুবাদ করেছেন কোনান ডয়েলের লেখা "ব্রেজিলের কালো বাঘ" কিংবা রে ব্র্যাডবেরি র "মঙ্গলই স্বর্গ"। ঠিক সেই সাথেই মধ্যপ্রাচ্যের মূল্য নাসির উদ্দিনের মজাদার গল্পগুলি অনুবাদের পিছনে হয়তো প্রধান নাম সত্যজিৎ রায়।আবার লিমেরিক এর অনুবাদ "তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম" নামক কাব্যগ্রন্থটি পাঠকের কাছে এক অনবদ্য উপহার হয়ে দেখা দিল। আগেই বলেছি বই মানুষের চিন্তাভাবনার দিকদর্শন যেমন খুলে দেয় তেমনি
পাঠক ও বই পড়তে পড়তে নিজের ভেতরের স্রষ্টা সত্তাকে খুঁজে পায়। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা যে অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা পেয়েছে তার পিছনে সত্যজিৎ রায়ের নিজের ম্যানারিজমগুলোই ফেলুদায় এসেছে। খাওয়া-দাওয়ার ধরন-ধারন, সত্যজিতের পছন্দই ফেলুদার পছন্দ, সত্যজিতের অপছন্দ ফেলুদার অপছন্দ ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায় ও ফেলুদা একটা ইন্টিগ্রিটি। বই যেমন নিজের ফুলের ফলের সৌন্দর্যে পরিপুষ্ট করেছে পাঠককে , তেমন পাঠকও বইয়ের অবদানে পুষ্ট হয়ে তার নিজের সৃষ্টি "দার্জিলিং জমজমাট"," জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা", "সোনার কেল্লা", "ছিন্নমস্তার অভিশাপ", "সুজন হরবোলা", "সাবাস প্রোফেসর শঙ্কু" ,"শঙ্কু একাই ১০০", "সেলাম প্রোফেসর শঙ্কু", "স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু" ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্ব বই ভান্ডারকে দুহাত ভরে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। বইয়ের এক বিশেষ পাঠক সত্যজিৎ রায় কেবল তার লেখা বই দিয়েই অন্যান্য পাঠককে যেমন বইয়ের স্বাদ দিয়েছেন, তেমন তার চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিভার মধ্য দিয়েও তিনি আমজনতার মধ্যে ছবির মাধ্যমে পুস্তকের গল্পকে জীবন্ত বইয়ের মতন অবলীলায় তুলে ধরেছেন। পাঠক বই না পড়েও সিনেমার মাধ্যমে যে বই পড়তে পারে তা সত্যজিৎ রায় ই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তাই বিশ্ব বই দিবসে বই ও পাঠক আবার লেখক সবই একে অপরের পরিপূরক হয়ে গেছে। তাই হয়তো বিধাতার নিয়মে ২৩শে এপ্রিল দিনটি যেমন বিশ্ব বই দিবস, ঠিক তেমনই প্রকৃতি যেন ওই দিনই তার বিশেষ প্রিয় পাঠককে স্মরণীয় মৃত্যু দিনের মধ্যে দিয়ে একাত্ম করে নিয়েছে।
নবম শ্রেণী কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ,
উত্তর ২৪ পরগনা
মজুমদার ভিলা, কল্যাণনগর খড়দহ
Comments :0