Bangladesh Border Hakimpur

‘কালু মিঞ’র মাটির চিন্তায় রাম-সীতার মন্দির, ফসল আর দেশের সুরক্ষা

রাজ্য জেলা

নদী-সীমান্ত থেকে দূরে গ্রামবাসীদের পরীক্ষা চালাচ্ছে বিএসএফ। ছবি: শ্যামল মজুমদার।

চন্দন দাস : হাকিমপুর 
 হাকিমপুরের জোয়ান আগে নৈহাটির চটকলে যেত। এখন পুনে, বাঙ্গালোর, চেন্নাই যায়। রুহুল গাজি বললেন, ‘‘যাই তো উপার্জনের জন্য। আমাদের কাজের কথা ভাবার আগে কিভাবে আমরা আরও বিপদে পড়বো, সেই চিন্তাই ওদের হলো?’’
নৈহাটি থেকে এই হাকিমপুর গিয়েছিলেন কমরেড হেমন্ত ঘোষাল। নৈহাটির চটকলে স্বরূপনগরের হাকিমপুরের গ্রামের ছেলেরা ‘লেবার’ ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে হাকিমপুরে যান হেমন্ত ঘোষাল। তখনও দেশ পরাধীন। হাকিমপুরেই ‘কালু মিঞা’ নাম হয়েছিল তাঁর। সেখানে আবদুর রেজ্জাক খাঁর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসাবে কৃষকদের সংগঠিত করার কাজ করেন হেমন্ত ঘোষাল। সেই সময়ে আরও দু’টি কাজ তিনি করতেন। যা হাকিমপুরের মাটির চরিত্র বলে দিতে পারে। 
হাকিমপুরে নিজেদের জমিদারির জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া আবদুর রেজ্জাক খাঁ সূর্য সেনের যুব বিদ্রোহীদের অস্ত্র পাঠিয়ে সহযোগিতা করতেন। কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা সেই জমিদার বংশের সন্তান রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন। দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্টের সময় হাসনাবাদ থেকে বিধায়ক হয়েছিলেন। হয়েছিলেন রাজ্যের ত্রাণ মন্ত্রীও। সেই রেজ্জাক খাঁ’র বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া ‘কালু মিঞা’ স্বাধীনতার আগে হাকিমপুরে মুসলমান মেয়েদের লাঠিখেলা শেখাতেন। আর? হাকিমপুরের মসজিদে ইমামের সহযোগীর দায়িত্বও পালন করেছেন হেমন্ত ঘোষাল। তখন কাঁটাতার ছিল না। তখন সোনাই নদী চওড়া ছিল। তখন সোনাইয়ের দু’পারের জনপদ ছিল একই ভূখণ্ডের অংশ। 
সেসব বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই নেই এখন। সোনাই এখন সীমান্ত দু’টি আলাদা দেশের। ভারত আর বাংলাদেশের। সেই সোনাই নদীর পার ছেড়ে আরও প্রায় ১২০০ গজ দূরে এসে কাঁটাতার দিতে চাইছে বিএসএফ। রাজ্যের বিজেপি সরকার সেই জমি ছেড়ে দিচ্ছে বিএসএফ’কে। আবদুর রেজ্জাক খাঁদের সেই একদা-পারিবারিক মসজিদ, হেমন্ত ঘোষালের ‘কালু মিঞা’ হয়ে ওঠার সেই মসজিদ চলে যাবে কাঁটাতারের ওপারে। রফিকুল বিশ্বাস বললেন, ‘‘এত প্রাচীন মসজিদ। স্কুল, ডাকঘর, জেলা পরিষদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো তাও হয়ে পড়বে অরক্ষিত। কেন্দ্র, রাজ্যের সরকারের মসজিদ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। বুঝলাম। কিন্তু রাম-সীতা নিয়ে এত কথা বলে ওরা। তার কি হবে?’’ 


রাম-সীতা? হাকিমপুরে? 
‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’র সিদ্ধান্তে বিএসএফ জমি পাচ্ছে। বিএসএফ যে এলাকা পিছনে ফেলে এসে কাঁটাতার দিচ্ছে, সেই এলাকার মধ্যে বিথারী হাকিমপুরের ৯টি বুথ পড়ছে। তার মধ্যে তারালির তিনটি বুথ পড়ছে ১০৫, ১০৬, ১০৯। প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস ওই তিনটি মৌজায়। সেই তারালিতে রয়েছে একটি মন্দির। রাম-সীতার মন্দির। মাঘের শীতে ভীম একাদশীর দিন সেই মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় মেলা। প্রায় দু’সপ্তাহ মেলা চলে। সেই মেলায় পসরা সাজিয়ে যাঁরা বসেন, যাঁরা সেই মেলায় যান, তাঁরা শুধু কোনও একটি ধর্মের মানুষ নন। সোনাই নদীর পারে সেই রাম-সীতার মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। বিএসএফ নদী-সীমান্ত থেকে ১২০০ গজ দূরে কাঁটাতার দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এর ফলে রাম-সীতার মন্দিরও পড়ে যাবে সেই কাঁটাতারের পিছনের জমিতে।
ভ্যানচালক সুজিত দাসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল হাকিমপুরে। বিএসএফ’র চৌকি পেরিয়ে তিনি তাঁর ভ্যান নিয়ে একটু জিরোচ্ছিলেন। পুনেয় কাজে যাওয়ার টিকিটের অপেক্ষা করছেন ইসমাইল গাজি। তিনি ঠিকাদারের অধীনে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করেন। মোবাইলে পুনের বহুতলে কি ধরনের পোশাক পড়ে, কিভাবে দড়িতে ঝুলে ঝুলে কাজ করেন, তা মোবাইলে তুলে রাখা ছবিতে দেখাচ্ছিলেন ইসমাইল গাজি। উৎসাহে সেই ছবির কয়েকটি পাঠিয়েও দিলেন প্রতিবেদককে। ইতিমধ্যে সুজিত দাসকে দেখে ইসমাইল বলে উঠলেন, ‘‘সুজিতদা একটা বিড়ি দাও। রাম-সীতা মন্দিরের মেলা যেন কবে হয় গো। শীতে নয়?’’ সুজিত মেলা, মন্দির বিষয়ে আলোচনা করতে করতেই চলে গেলেন জমির প্রশ্নে। বললেন, ‘‘আরে মন্দির যাবে। মসজিদ যাবে। ডাকঘর যাবে। স্কুল যাবে অতগুলো। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটাও যাবে। কিন্তু তোমরা কেউ বলছো না যে জমিও যাবে অনেকটা।’’ 
‘জমি’ মানে খেত। হাকিমপুর, তারালি, দহারকন্দা, আরশিকারী-পদ্মবিলের মতো গ্রামে ধান হয় একবার। মূলত বর্ষার চাষ। এখন মাঠময় মানুষ সমান পাট। আর তিল। মাঝের তারালির এক গ্রামবাসীর কথায়, ‘‘এই জমি কি আমাকে বিএসএফ দেবে? দিতে পারবে না। ক্ষতিপূরণ কত দেবে, তাও বলছে না। এত পুরুষের ঘর। তার দাম কি? বলছে না। তার চেয়েও বড় কথা আমাদের যাওয়ার, অত দূরে গিয়ে কাঁটাতার দেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। বিএসএফ যা বলে আমরা শুনি। ওরা কেন সোনাই নদীর পারে গিয়ে পাহারা দেবে না। কাঁটাতার দিতে হয় নদীর পার ছেড়ে দিক। সেখানে তো পিলার আছে। এত দূরে কেন দিচ্ছে।’’



ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সোনাই নদী। 

কি অসুবিধা দিলে?
হাকিমপুর বাজারে মুদির দোকান চালান যিনি, সেই যুবকের কথায়, ‘‘বিএসএফ ক্যাডবেরি আনতে দেয় না। বাচ্চাদের গুঁড়ো দুধ আনতে দেয় না। এমন আরও অনেক কিছুই তারা আনতে দেয় না। সে সব নাকি বাংলাদেশে পাচার করে দেবো আমরা। ১৫ দিন অন্তর ৫০০০ টাকার বেশি মাল আমি দোকানের জন্য আনতে পারবো না। আমরা আনি না। আমরা ওদের সব কথা শুনি। ওরা যখন যেমন সার্চ করে মাল, গাড়ি। আমরা বাধা দিই না। কিন্তু এই যে ওরা নদীর পার থেকে সরে যাচ্ছে, এরপর তো এই এলাকায় বাংলাদেশের চোর, ডাকাতরা যখন খুশি আসবে। ফসল কেটে নিয়ে যাবে। তাতে দেশের ক্ষতি হবে না? আমাদের যদি খুন করে রেখে যায় কি হবে?’’
রুখে দাঁড়াচ্ছে গ্রাম। হিন্দু-মুসলমানে ভেদ নেই ‘কালু মিঞা’র মাটিতে। পাশে শুধু লালঝান্ডা। 
সিপিআই(এম) নেতা হামালউদ্দিন শেখের প্রশ্ন, ‘‘নদী সীমান্ত আগেও ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার অনেকবার জানিয়েছে সে কথা। নদীর পারে জায়গা আছে। স্থানীয় মানুষ বিএসএফ’র সঙ্গে সহযোগিতা করে। তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার বিএসএফ’কে নদীর পার থেকে সরিয়ে আনছে কেন? মানুষের বিপদ বাড়বে। দেশের সম্পদ নষ্ট হওয়ার ভয় থাকছে। তাহলে কিসের এরা দেশপ্রেমিক বলে নিজেদের এত প্রচার করে?’’
এই প্রশ্ন হাকিমপুর থেকে পদ্মবিল—  সর্বত্র।

Comments :0

Login to leave a comment