রামশঙ্কর চক্রবর্ত্তী: তমলুক
কাঁচা ইটের গাঁথুনি আর ত্রিপল চাপানো ঘরের সামনে রেশনের চাল রোদে দিচ্ছিলেন আরজুনা বিবি। ‘‘চালে পোকা থাকে রোদে দিয়ে খেতে হয়। তবে সবসময় নয়। কোনও সময় পোকা চাল আসে। দাদা চলুন যেতে যেতে কথা হবে। ইটভাটায় যেতে হবে। তাড়া আছে।’’ চললাম আরজুনা বিবি সহ কয়েকজনের সঙ্গে। কে আরজুনা বিবি? মনে থাকার কথা। ২০২২ সালে ডিসেম্বরের শেষ যার লড়াই দেখেছিল রাজ্যবাসী। নিজের জন্য? না। গরীব মানুষদের ঘরের দাবি নিয়ে ডেপুটেশন দিতে গিয়েছিলেন নন্দকুমার বিডিও’র কাছে। কয়েকশ মানুষের নাছোড় অবস্থানে টানা কয়েকঘন্টা অবরুদ্ধ হয়ে থাকে বিডিও অফিস চত্বর। কোনও প্ররোচনা ছাড়াই পুলিশ অতর্কিতে আক্রমণ করে ডেপুটেশন দিতে আসা মানুষজনদের উপর। এলোপাথারি লাঠিচার্জ চলে। সেদিন সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ পুলিশের এমন নির্মম অত্যাচারের সাক্ষী হয়ে এখনও আছে বিডিও অফিসের সামনে থাকা বিভিন্ন মনীষীদের মুর্তিগুলি আর স্থানীয় দোকানদাররা। সেদিন আরজুনা বিবিকে প্রায় বিবস্ত্র করে মারা হয়েছিল। অত্যাচার করা হয়েছিল পুলিশ হেফাজতেও। অন্তত তেমনটাই জানিয়েছিল আরজুনা বিবি। না এমন আরজুনা বিবিরা ঘর পায়নি আজও। ‘‘দাদা সেদিনের ঘটনা মনে করতে চাইনা আর। আমাদের হক দাবি করেছিলাম। কিন্তু পাইনি। তবে ওদের দলে ভিড়িনি। এই লাল পার্টিতেই আছি।’’ কথাগুলি বলতে বলতে একটা চাপা কষ্ট ছিল। অন্তত মুখের অভিব্যক্তিতে তা স্পষ্ট। আরজুনা আরও জানালেন ‘‘খাটি খাই। চুরি করিনা তো। আর ওদের কাছ থেকে কোনও সাহায্য নিইনা। আমরা গরীব মানুষ আমাদের দুবেলা খাবার জোটাতে খাটতে হবে।’’
আবাস যোজনা নিয়ে অভিযোগ অনেক। দুর্নীতি, বেনামে দেওয়া এসবতো আছেই। নন্দকুমারেরই একটি গ্রামে একই পরিবার তিনবার আবাস যোজনার টাকা পেয়েছে। পরিবর্তে তৃণমূলকে দিতে হয়েছে একবারের টাকা।
প্রচারে নন্দকুমারের সিপিআই(এম) প্রার্থী চন্দন মাইতি।
নন্দকুমার বিধানসভা মূলত নন্দকুমার ব্লকের সবকটি গ্রাম পঞ্চায়েত ও তমলুক ব্লকের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে। বিধানসভার ভৌগলিক অবস্থানগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিন দিক নদী বেস্টিত। ফলে নদী পাড় ভাঙনের সমস্যা তীব্রতর। প্রতি বর্ষায় মহিষাদল ও নন্দকুমার ব্লকের সংযোগস্থল এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। পাশাপাশি নিকাশির সমস্যা থাকায় একদিকে জমা জল বেরোতে পারেনা। অন্যদিকে চাষের সময় প্রয়োজনীয় জল মেলেনা নিকাশি খাল গুলি সংস্কার না করার ফলে। এই বিধানসভা মূলত কৃষিপ্রধান হলেও এখন প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতে চাষ বন্ধ। সেচের অভাবে চাষ বন্ধ হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে ভেড়ি কারবারিরা। মানুষজনও নিরুপায় হয়েই মাছ চাষের ভেড়ি করার জন্য জমি দিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি কাজের তীব্র সংকটে হাজার হাজার যুবক পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে ভিন রাজ্যে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার প্রায় কেন্দ্র স্থলে এই নন্দকুমার বিধানসভা। এখানকার সমস্যা গুলি বিভিন্ন রকমের। নদীভাঙন, ইঁটভাটার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, তীব্র কাজের সংকট, নিকাশি, পানীয় জলের সমস্যা, রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, মজে যাওয়া খাল সহ একাধিক। ব্যাবর্তারহাট থেকে ভায়া খঞ্চি হয়ে ঠেকুয়াচক পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা, নন্দকুমার বাজার থেকে হাইরোড পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তা, টালিভাটা থেকে কড়ক হয়ে হরিখালি পর্যন্ত প্রায় ৬কিমি রাস্তা, পুয়াদা বাস স্ট্যান্ড থেকে কেশবপুর হয়ে দনিপুর পর্যন্ত প্রায় ৬ কিমি রাস্তার অবস্থা একেবারেই বেহাল। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি এই রাস্তাগুলি। অথচ উল্লেখ করা রাস্তার প্রত্যেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ২০২১ সালের প্রতিশ্রুতিই মাত্র। বাড়ি বাড়ি পানীয় জলের কাজ এগোয়নি। শুধুমাত্র কয়েকটি মৌজায় পাইপলাইনের কাজ হলেও বিধানসভা এলাকার প্রতিটি গ্রামে পাইপলাইন করার কাজই সম্পুর্ন হয়নি। সমস্যা অনেক। এই বিধানসভায় ২০১১ সাল থেকে একটানা তিনবার তৃণমূল জয়ী হয়েছে। বিধায়কের উন্নয়ন তহবিল থেকে কাজ কি হয়েছে তার হিসাব এবার নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই বিধানসভায় এবার সিপিআই(এম) প্রার্থী চন্দন মাইতি। নিবিড় প্রচারে জোর দিয়েছেন তিনি। প্রতিটি বুথে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সকাল থেকেই বেরিয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষের কথা শুনছেন সিপিআই(এম) এর ইশতাহার পৌঁছে দিচ্ছেন বাড়ি বাড়ি।
Comments :0