অন্যকথা | চলে গেলেন পদ্মবিভূষণ প্রাপ্ত সংগীতশিল্পী তীজন বাই
সৌম্যদীপ জানা
নতুনপাতা | বর্ষ ৪ | ২৯ জুন ২০২৬
ভারতের লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পীর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, যাঁরা কেবল শিল্পচর্চা করেননি, বরং একটি সমগ্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পদ্মবিভূষণপ্রাপ্ত পাণ্ডবাণী শিল্পী ড. তীজন বাই সেই বিরল শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর প্রয়াণ শুধু ছত্তিশগড়ের নয়, সমগ্র ভারতীয় লোকসংস্কৃতির এক অপূরণীয় ক্ষতি।
১৯৫৬ সালের ২৪ এপ্রিল ছত্তিশগড়ের (তৎকালীন মধ্যপ্রদেশ) দুর্গ জেলার গানিয়ারি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তীজন বাই। দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের মধ্যেই কেটেছিল তাঁর শৈশব। কিন্তু সেই অভাবের সংসারেই জন্ম নিয়েছিল এক অসাধারণ শিল্পীসত্তা। তাঁর দাদু ব্রজলাল নিয়মিত মহাভারতের কাহিনি গেয়ে শোনাতেন। ছোট্ট তীজন আড়ালে বসে সেই কাহিনি মন দিয়ে শুনতেন এবং অবলীলায় মুখস্থ করে ফেলতেন। একদিন দাদু তাঁর এই অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও কণ্ঠের জাদু উপলব্ধি করেন। সেদিন থেকেই শুরু হয় পাণ্ডবাণীর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা—যা পরবর্তীকালে তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দেয়।
পাণ্ডবাণী কেবল গান নয়; এটি মহাভারতের আখ্যান, সুর, অভিনয়, আবৃত্তি ও নাট্যাভিনয়ের এক অনন্য সমন্বয়। বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই লোকশিল্পকে তীজন বাই নিজের অসামান্য কণ্ঠ, অভিব্যক্তি ও অভিনয়শক্তির মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর পরিবেশনায় মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্র, অর্জুনের সংশয়, ভীমের শক্তি কিংবা দ্রৌপদীর অপমান যেন জীবন্ত হয়ে উঠত। দর্শক শুধু একটি অনুষ্ঠান দেখতেন না, তাঁরা যেন মহাকাব্যের অন্তরে প্রবেশ করতেন।
তাঁর শিল্পের খ্যাতি খুব দ্রুত দেশের সীমানা অতিক্রম করে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে বিশ্বের বহু রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও শিল্পরসিক তাঁর পরিবেশনার প্রশংসা করেছেন। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক, মরিশাস-সহ সতেরোটিরও বেশি দেশে তিনি ভারতীয় লোকঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর কণ্ঠে ছত্তিশগড়ের মাটির গন্ধ পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৩ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০১৯ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণে ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৯৫ সালে তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৮ সালে জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ফুকুওকা পুরস্কার তাঁর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি বহন করে। বিলাসপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. ডিগ্রিও প্রদান করে।
জীবনের শেষ অধ্যায় অবশ্য ছিল গভীর বেদনার। বড় ছেলের অকালমৃত্যুর আঘাত তাঁকে ভেঙে দেয়। বলা হয়, সেই শোকের পর তিনি নিয়মিত ওষুধ গ্রহণও বন্ধ করে দেন। ২০২৪ সালে তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী অবস্থায় নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করেন। ফুসফুসে জল জমা, নিউমোনিয়া ও নিম্ন রক্তচাপজনিত সমস্যার কারণে তাঁকে রায়পুর এইমসে ভর্তি করা হয়। সেখানেই ২০২৬ সালের ৫ জুলাই, প্রায় সত্তর বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তীজন বাই তাঁর অনন্য পরিবেশনার মাধ্যমে ছত্তিশগড়ের পাণ্ডবাণীকে বিশ্বব্যাপী এক স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছেন এবং তাঁর মৃত্যু শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাইও তাঁকে রাজ্যের গৌরব বলে অভিহিত করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
তীজন বাইয়ের জীবন আমাদের শেখায়, শিল্পের প্রকৃত শক্তি জন্মসূত্রে নয়, সাধনায়। একটি গ্রামের সাধারণ কন্যা তাঁর নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও প্রতিভার জোরে বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় লোকঐতিহ্যের মুখ হয়ে উঠতে পারেন—এই সত্য তাঁর জীবনকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত মহাভারতের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর এবং প্রতিটি আবেগ ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে।
তীজন বাইয়ের প্রয়াণ একটি জীবনের অবসান, কিন্তু একটি ঐতিহ্যের নয়। যতদিন ভারতীয় লোকসংস্কৃতি, মহাভারত এবং পাণ্ডবাণীর ইতিহাস স্মরণ করা হবে, ততদিন তাঁর নাম শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন ভারতীয় লোকশিল্পের এক অনির্বাণ প্রদীপ।
দশম শ্রেণী
কল্যাণনগর বিদ্যাপীঠ
খড়দহ উত্তর ২৪ পরগণা
ডাঙ্গাপাড়া
Comments :0