nipah virus

বাদুড়, শুয়োর থেকে ছড়িয়ে পড়ে নিপা

জাতীয়

নিপা ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস। এটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়। ঠিক যেমনটি বার্ড ফ্লু’তে দেখা যায়। এশিয়ার কিছু অংশে, বিশেষত ভারত, বাংলাদেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মাঝেমধ্যেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বাদুড় সাধারণ এই ভাইরাস ছড়ায়। তবে এই ভাইরাস মানুষের আসার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী পোষক (হোস্ট) শূকর। 
১৯৯৯ সালে এই ভাইরাসটি প্রথম উদ্বেগজনক চেহারা নেয়। মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে নিপা ভাইরাসের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে ১২০ জনের প্রাণ গেছে। নিপা ভাইরাসের প্রকোপ কমাতে হত্যা করতে হয়েছে অন্তত ১২ লক্ষ শূকরকে। কেরালায় কয়েকজন ইদানীং নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম নিপা ভাইরাসের সংক্রমণের খবর মিলল।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণে কিছু মানুষ একেবারেই কোনও উপসর্গ অনুভব (অ্যাসিম্পটোমেটিক) করেন না। অন্যরা হালকা শ্বাসকষ্ট থেকে থেকে মারাত্মক মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) পর্যন্ত হতে পারে। অন্যান্য ভাইরাসের মতোই এটির অতি প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর। তবে নিপা সংক্রমণে তাপমাত্রা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে শুরু হয় তীব্র মাথা ব্যথা। মাথা ব্যথার সঙ্গে পরে শুরু হয় পেশি ব্যথা। আর এই সব লক্ষণই সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগ ধরতে বেশি সময় লেগে যায়।
ঠিক সময়ে ভাইরাসকে শনাক্ত না করতে পারলে দেখা দেয় সব গুরুতর উপসর্গ। মস্তিষ্কের গুরুতর প্রদাহের জেরে রোগী অনেকক্ষেত্রে কোমায় চলে যান। মারাত্মক মস্তিষ্ক প্রদাহ বা এনসেফালাইটিসের জন্যই এই রোগের মৃত্যুহার অনেকটা বেশি। রোগীর উপসর্গভেদে ৪০% থেকে  ৭৫% রোগীই মৃত্যু ঘটতে দেখা যায়। তবে সময় মতো চিকিৎসকের কাছে এলে রক্ত পরীক্ষা করে ভাইরাসকে শনাক্ত করা যায়। রোগী অনেকক্ষেত্রেই খিঁচুনি আর মানসিক বিভ্রান্তি নিয়ে আসেন। সেই সঙ্গে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা শ্বাসকষ্ট, অনেকের কাশি। সাধারণত রিয়েল-টাইম পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (আরটি-পিসিআর) টেস্ট দিয়ে শনাক্ত করা হয় ভাইরাসকে। শরীরের তরলে ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হলেই আইসিইউ’তে রেখে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। 
নিপা ভাইরাস সাধারণ বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পশু থেকে মানুষে, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটতে থাকে। ভারতে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস ছিল সংক্রামিত ফল বা ফলের রস। বাদুড়ের প্রস্রাব বা লালা সংক্রমিত ফল বা ফলের পণ্য থেকেই নিপা সংক্রমণ হয়। গ্রাম বাংলায় কাঁচা খেজুরের রস নিপা ভাইরাসের একটা সহজ উৎস। বাদুড়ের সংক্রমিত লালারস সেখানে মিশলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। 
সাধারণত নিপা ভাইরাস কিছু রসালো ফল যেমন আমের মধ্যে ৩ দিন পর্যন্ত এবং ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা খেজুরের রসে কমপক্ষে ৭ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। ফলের মধ্যে বাদুড়ের প্রস্রাবে ভাইরাসের অর্ধেক জীবন ১৮ ঘণ্টা থাকে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ করে পরিবারের সদস্য ও রোগীর পরিচর্যাকারীদের আক্রান্ত হতে দেখা যায়। সাধারণ সংক্রামিত ব্যক্তির দেহ রস এবং মলত্যাগের সাথে সংক্রমণ ঘটে।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা এখনও পর্যন্ত নিপা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই। রোগীকে উপসর্গকালীন চিকিৎসা করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে ভেন্টিলেটরে রেখেই রোগীকে চিকিৎসা করা বিধি। কেন না, স্নায়বিয় জটিলতার জেরে শ্বাসের সমস্যা রোগীতে তীব্র হয়ে দাঁড়ায়।
নিপা ভাইরাস ভয়াবহ হলেও এর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রথমেই নিপা ভাইরাস সংক্রামিত প্রাণী বা মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বন্ধ করা জরুরি। বাদুড়কে বিশেষভাবে এড়িয়ে চলা জরুরি। বাদুড় ধরা, মারা বা এমনকি বাদুড় যেখানে ঘোরাফেরা করছে, সেখান থেকে দূরে থাকাটা শ্রেয়। পরিচ্ছন্নতাকে বাড়াতে হবে। ঘন ঘন হাত সাবান-জলে ধোয়া দরকার। বিশেষ করে যে কোনও পশু পরিচর্যা কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির যত্ন নেওয়ার পরে। 
রোগজীবাণু নির্মূলের দিকে তাকিয়ে যে কোনও মাংস বা প্রাণীজ পণ্য ভালো করে সেদ্ধ করে খাওয়া উচিত। যাঁরা রোগীর পরিচর্যা করেন তাঁদের সবাইকে ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহার ফের শুরু করতে হবে। গ্লাভস, মাস্ক এবং গাউন সহ উপযুক্ত পিপিই না পরে রোগীর সামনে যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি প্রাদুর্ভাবে, ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে আক্রান্ত ব্যক্তির নিভৃতাবাস (কোয়ারেন্টাইন) একান্তই জরুরি।

Comments :0

Login to leave a comment