গল্প
মুক্তধারা
-----------------------------
সে যখন শুকায়ে যায়
-----------------------------
ময়ূরী মিত্র
পর্ব - দুই
গুরদোয়ারায় বসে অপর্ণার সব মনে পড়ছে ৷ রোহিতের বাবা কাঁদছেন ৷ মা কাঁদছেন ৷ হাউহাউ করে দিদিমা কাঁদছেন ৷ অপর্ণা কেবল ভাবছে --আচ্ছা সবাই তো কেঁদে একসময় শুকিয়ে যাবে ! কিন্তু আমি ? আমি কী করব ? সে তো এখনো আমার কোলে তার নরম পাছা ঠেকিয়ে বসে আছে ! পালং থেকে পনির বেছে খাচ্ছে ৷ লাস্ট ঘিটুকু সাপটে নিচ্ছে ৷ ভাবতে ভাবতে চোখ বুঁজে ফেলেছে অপর্ণা ৷ হঠাৎ কলকল ৷ দেখে একটি বাচ্চা মেয়ে মাথার থেকেও বড় বেণী দুলিয়ে আসছে প্রার্থনা সভায় ৷ পাঞ্জাব প্রদেশের বধূটির মতো ওড়না মাথায় দিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে ঘরময় ৷ কখনো একঠেঙি বকের মতো কিতকিত খেলছে ৷ কখনো হরিণের মতো সাঁ করে দৌড়ে বারান্দায় ৷ ছোটো শরীর --পরেছে বড়োদের কাটিঙের সালোয়ার কামিজ ৷ পায়ে পাঞ্জাবি নুপুর --বেশ ভরাট তার আওয়াজ ৷ নিজের মতোই বেখাপ্পা চুল বাঁধা দেখে ভারী মজা লাগছে অপর্ণার ৷চোখ ফেরাতে পারছে না ৷ ফেরান যাচ্ছে না ৷
মেয়েটাকে পাশটিতে নিয়ে শোকসভার ভোজ খেল অপর্ণা ৷ দুজনে মিলে জল ছেটাছেটি করে এঁটো থালাবাটি ধুল ৷ মেয়েটা অপর্ণারটা আর অপর্ণা ওরটা ৷ আরো খানিক চটকে মটকে অপর্ণা এবার বেরল ৷ রাস্তা পার হতে যাচ্ছে ! ওপাশে সুহাসিনী ৷
উনি এখন কী করতে এসেছেন? আশ্চর্য মানুষ তো !
বাড়ি থেকে বেরবার সময় এত করে বলে এল --মা আমি স্কুল থেকে ডিরেক্ট চলে যাব ৷ একটা বাচ্চার শোকসভায় যেতে তোমার ভালো লাগবে না মা ৷Trust me - তোমার আরো মন খারাপ হবে ৷ আমি বরং রোহিতের বাবা মাকে গিয়ে তোমার কথা বলব ৷ তবু এসেছেন সুহাসিনী ! সবেতে বাড়াবাড়ি এই মহিলার ৷ রোহিতের বাপ মাকে দেখাতে এসেছেন বোধহয় , কত ভালোবাসেন রোহিতকে ! নিশ্চয় সাতকাহন করে এটাও বলবেন ....রোহিতের জন্য স্পেশাল টিফিন উনিই বানিয়ে দিতেন ! অপর্ণা নয় ৷ প্রতিবার বাড়ি থেকে আনা টিফিনগুলো খাওয়ানোর পর রোহিতের মা হাতজোড় করে নমস্কার করে যেত ৷ কতবার বলেওছে --অপর্ণা মাদাম বলুন না....ছানার বড়ার রেসিপি ৷ আমি রোহিতকে বাড়িতে করে দেব ! আপনি রোজ রোজ খাবার বয়ে আনেন ! লজ্জা পাই ৷ প্রতিবারই চওড়া হেসে অপর্ণা বলত--কোনো কষ্ট হয় না ৷ সামান্য কটা ছানার বড়া ! তিলের নাড়ু ! এসবই তো আনি ! বাঙালি ঘরে এসব করতেই হয় ৷
অপর্ণা এই যে ! এসে গেছি আমি ! তুমি দাঁড়াও !
হেঁড়ে গলায় সুহাসিনী চেঁচাচ্ছেন ৷ বাসগুলো এই রাস্তায় স্পিডে দৌড়োয় ৷হাত দেখিয়ে সুহাসিনীকে থামাল অপর্ণা ৷ চলন্ত বাসগুলোর মধ্যে দিয়েই দ্রুত এপারে এল ৷ এখুনি বুড়িটাকে থামাতে হবে ৷ সুহাসিনীর হাত ধরে বাড়ির দিকে টানতে লাগল ৷ শোক কিংবা সদ্য পাওয়া খুশির ভাগ কোনো কিছুই দেবে না সে সুহাসিনীকে ৷ শাশুড়ির হাতে বৌমার পাঁচটা আঙুল চেপে বসেছে ৷
----আহ ! হাতে লাগছে ৷
সমাপ্ত
Comments :0