দেড় দশকের তৃণমূল জমানায় মমতা ব্যানার্জির সরকার এটা একরকম নিশ্চিত করে দিয়েছে যে, যেকোনও অপরাধের ঘটনায় অপরাধী যদি তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে তাহলে সেই অপরাধীর সাজা পাবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অপরাধটি যদি অরাজনৈতিক এবং গুরুতর মাত্রার হয় তাহলে কিঞ্চিত সাজা হতে পারে। দু’একটি ক্ষেত্রে অতি তৎপরতার সঙ্গে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চালিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে কড়া সাজার ব্যবস্থা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয় যাতে সেই ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে কুমিরের ছানার মতো বারবার দেখানো। মাঝখান থেকে শত দুষ্কর্ম-অপরাধকে আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয় সেই ‘দৃষ্টান্তমূলক’ সাজার জোরালো প্রচারের ছায়ায়।
অপরাধের সঙ্গে যদি সরাসরি তৃণমূলের রাজনীতির যোগ থাকে অথবা অপরাধী-দুষ্কৃতীরা যদি শাসক দলের প্রভাবশালী বা দাপুটে নেতা হয় তাহলে কিন্তু পুলিশের ভূমিকা পুরোপুরি বদলে যাবে। পুলিশ তখন তাতে গুরুত্বই দেবে না। প্রথমত অভিযোগ নিতেই অস্বীকার করবে। পরিস্থিতির চাপে অভিযোগ লিপিবদ্ধ হলেও হবে অনেক বিলম্বে। অতঃপর যে এফআইআর হবে তাতে ঘটনার বিবরণে রাখা হবে বিস্তর ফাঁক-ফোকর যাতে অপরাধকে লঘু করে দেখানো যায় বা তদন্ত প্রক্রিয়া জটিল অধরা হয়ে যায়। তেমনি এমন এমন ধারা দেওয়া হবে যাতে ধরা পড়লেও সহজে জামিন মিলবে এবং শেষ পর্যন্ত সাজা হবে একেবারেই লঘু। তদন্তে অযথা ঢিলেমি হবে। তথ্য প্রমাণ নষ্টের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হবে। সাক্ষীদের হুমকি দিয়ে, ভয় দেখিয়ে দূরে সরানোর ব্যবস্থা হবে। সর্বোপরি শাসক দলের নেতাদের ইচ্ছে করে গ্রেপ্তার না করে পলাতক বলে দেখানো হবে। যদিও সেই পলাতকরা এলাকাতেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে এবং শাসক দলের কাজে সক্রিয় থাকবে। এইভাবে বিচারের নামে প্রহসন চলতে থাকবে অনন্তকাল। তৃণমূল জমানায় রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং অপরাধ দমনে এমন ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত হয়েছে। এরাজ্যে পুলিশ এখন পুরোপুরি শাসকের দলদাস। শাসক দলের নেতাদের হুকুম তামিল করা এবং তাদের মরজি মতো কাজ করাই পুলিশের একমাত্র করণীয়। যে কোনও অপরাধের ঘটনায় পুলিশ আগে খবর নেয় অভিযুক্ত বা অভিযুক্তরা শাসক দলের কোন স্তরের নেতা, কতটা প্রভাবশালী এবং কার অনুগামী। সবটা বুঝে নিয়েই পুলিশ তাদের করণীয় ঠিক করে।
এহেন পুলিশি বন্দোবস্তের মধ্যেই বিচারের প্রত্যাশায় সময় গুনতে গুনতে অসহায় তামান্নার মা চলে যান জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায়। পলাশীর মোলান্দী গ্রামের দশ বছরের ফুটফুটে মেয়ে তমান্নাকে নিজের বাড়ির উঠোনেই বোমার আঘাতে খুন হতে হয় তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের হাতে। বিজয় মিছিল থেকে জয়ের আনন্দে বোমা ছুঁড়ে তমান্নাকে খুন করে পৈশাচিক উল্লাসে নাচে মমতা ব্যানার্জির ভক্ত তৃণমূল নেতাকর্মীরা। খুনি যেহেতু শাসকদলের নেতাকর্মী তাই স্বাভাবিক নিয়মেই নিষ্ক্রিয় পুলিশ। খুনিদের কয়েকজনকে ধরা হলেও বাকি খুনিরা দিব্যি এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি ক্রমাগত হুমকি এমনকি খুনের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে তমান্নার মাকে। পুলিশ যথারীতি নির্বিকার। ঘুমের ওষুধ খেয়ে তমান্নার মা যখন হাসপাতালে তখন প্রচার আটকাতে তৃণমূল নেতাদের চাপে পুলিশ ডাক্তারদের দিয়ে জোর করে সুস্থ লিখিয়ে মাকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। শাসকের পদলেহনকারী এমন অমানবিক পুলিশ মমতা ব্যানার্জির রাজ্যের অলঙ্কার। যাকে জোর করে সরকারি হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে তাকে ফের ভর্তি করতে হয়েছে বেসরকারি হাসপাতালে। কারণ সরকারি হাসপাতালে তৃণমূল ও পুলিশের হাতে তামান্নার মায়ের জীবন নিরাপদ নয়।
Plight of Justice
বিচারের বাণী
×
Comments :0