Editorial

হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারাজ

সম্পাদকীয় বিভাগ

৫৬ ইঞ্চির ছাতিওয়ালা বিশ্বগুরু যখন ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে উন্নত অর্থনীতির ভারতের স্বপ্ন উড়ানের সওয়ারি হচ্ছেন তখন তাঁরই ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যগুলিতে বিশেষ করে সাধুবাবা যোগীর রামরাজ্য উত্তর প্রদেশে হিন্দত্ববাদী গুন্ডারাজ জাঁকিয়ে বসছে। আরএসএস’র বৃহত্তর ছাতার আশ্রয়ে কখনও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, কখনও বজরঙ দলের আবার কখনও গোরক্ষকবাহিনীর হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা সদর্পে, সগর্বে ও সদম্ভে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গোটা উত্তর প্রদেশ জুড়ে। এই গুন্ডারা নিজেরাই নিজেদের পুলিশ, সরকার, আইন, আদালত বলে মনে করে। অর্থাৎ তারা যখন যা খুশি মনে করবে তাই-ই করতে পারবে। নৈরাজ্য তাদের স্বঘোষিত অধিকার। কারও অনুমতি নেবার বা কারও কৈফিয়ত দেবার দায় তাদের নেই। ঘৃণা ও বিদ্বেষ মিশ্রিত অন্ধ ধর্মীয় আবেগকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে এই গুন্ডারা তাদের হিংস্রতা বর্বরতা ও নৈরাজ্য চালিয়ে যায় নিয়মিত। তাদের আক্রমণের প্রথম টার্গেট হয় মুসলিম ও খ্রিস্টানরা। দ্বিতীয় টার্গেট দলিত, আদিবাসী গরিব প্রান্তিক মানুষরা। ঘৃণার আবহে এই বর্বরতা ছাড় দেয় না উদার ও মানবিক চেতনায় সমৃদ্ধ হিন্দুদেরও।
এহেন গুন্ডামির জন্য তাদের পরিচিত অজুহাত হলো গোমাংস, গোহত্যা, গোপাচার, লাভ জিহাদ, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি পাকিস্তানি, চীনা। আবার কখনও ধর্মান্তরকরণ বা ধর্মীয় আবেগে আঘাত বা অবমাননা। এগুলি নিছকই অজুহাত মাত্র। বাস্তবে এসব অজুহাতের বিন্দু বিসর্গ সত্যতাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সচেতনভাবে পরিকল্পনা করেই সময় সুযোগ ও জায়গা বুঝে তারা অজুহাতগুলি হাজির করে। আসল উদ্দেশ্য আক্রমণ, পেটানো, গণধোলাই, এমনকি খুন করা।
এইভাবে তথাকথিত অহিন্দুদের মধ্যে প্রবল ভীতি ও আতঙ্ক তৈরি করতে চায়। তাদের অনুগত ভৃত্যে পরিণত করতে চায়। বিপরীতে বেশি সন্তান, বে‍শি বিয়ে, ধর্মান্তরকরণ, অনুপ্রবেশ ইত্যাদি ভিত্তিহীন, তথ্য-প্রমাণহীন অবাস্তব গুজব ছড়িয়ে হিন্দুদের মধ্যে সংখ্যালঘু হয়ে যাবার আতঙ্ক ছড়ায়। ৫০০ বছরের মুসলিম শাসনে এবং ২০০ বছরের খ্রিস্টান শাসনে যে দেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়নি বরং সংখ্যাগষ্ঠিতা বেড়েছে সেদেশে নাকি এখন হিন্দুত্ববাদীদের শাসনে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। গাঁজা খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকা মাতালরাও এমন আজগুবি দাবি বিশ্বাস করবে না। মোদী জমানায় হিন্দুত্ববাদীরা এটাই জোর করে বিশ্বাস করাতে চায়। আসলে এই আজগুবি দাবিকে গোয়েবলসীয় কায়দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারলে একাংশ হিন্দুদের মনে ভীতি ও আতঙ্ক দানা বাঁধবে। তারাও নির্বোধের মতো ভাবতে শুরু করবেন এই বুঝি তারা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছেন। তখনই তাদের মধ্যে ভিন্ন ধর্মের বিরুদ্ধে বি‍‌শেষ করে মুসলিমদের ঘৃণা ও বিদ্বেষের মনোভাব গড়ে উঠবে।
ঠিক এই কারণেই হিন্দুত্ববাদী গুন্ডাদের গুন্ডামিকে শুধু প্রশ্রয় নয়, রীতিমত বৈধতাও দিয়ে চলেছে আরএসএস-বিজেপি সরকারগুলি। এই প্রশ্নে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা অবশ্যই পাবেন যোগী আদিত্যনাথ। তার দৌলতে উত্তর প্রদেশে হিন্দুত্ববাদী গুন্ডাবাহিনী আর পুলিশবাহিনী কার্যত মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। তাই ভিএইচপি-বজরঙ গুন্ডারা যত গুন্ডামিই করুক মোদী-শাহ-রা কিছুই শুনতে পান না, কিছুই দেখতে পান না।

Comments :0

Login to leave a comment