Ram mandir Trust

চম্পত রায় মহাপুরুষ,নিষ্কলঙ্ক! ট্রাস্টের বৈঠকের পরেই ‘ক্লিন চিট’

জাতীয়

 আরএসএস-ভিএইচপি নেতাদের বাঁচিয়ে সঙ্ঘের নির্ধারিত লাইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত জানালো শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট। সোমবার অযোধ্যায় বহু আলোচিত ট্রাস্টের বৈঠক তিন ঘণ্টা ধরে চলে। বৈঠকের পরে ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ গোবিন্দদেব গিরি দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণমোহনকে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানে গিরি স্পষ্ট করে বলেছেন, চম্পত রায় মহাপুরুষ, নিষ্কলঙ্ক। এছাড়াও গিরি বেশ কয়কেটি সংবাদ সংস্থাকেও সাক্ষাৎকার দেন। সেখানেও তিনি বলেন, চম্পত রায় অপরাধী নন। যাদের উপরে বিশ্বাস করেছিলেন, তারা চুরি করেছে, এটাই ভুল। এরপর তদন্ত কী হবে, সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেছে। বিরোধীরা আগেই বারে বারে বলেছেন, উত্তর প্রদেশ সরকারের গঠিত এসআইটি মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। এদিনের বৈঠকের পরে সেই সন্দেহ আরও দৃঢ় হয়েছে। 
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গিরি এদিন জানিয়েছেন, ট্রাস্টের বৈঠকে চম্পত রায়, অনিল মিশ্রের দুর্নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। ট্রাস্টের আমন্ত্রিত সদস্য গোপাল রাওকে এখন আর বৈঠকে ডাকা হবে না বলে জানিয়েছেন গিরি। প্রশ্নের জবাবে এদিন গিরি যা বলেছেন, তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে এই বিপুল দুর্নীতির ঘটনার দায় নিচু তলার কর্মচারীদের ঘাড়েই চাপানো হবে। পাশাপাশি এসবিআই-কেও কাঠগড়ায় তুলেছেন গিরি। গিরি মেনে নিয়েছেন, রামমন্দিরের দানপাত্র থেকে চুরি হয়েছে। কিন্তু কী পরিমাণ অর্থ চুরি হয়েছে তা বলতে চাননি। অর্থ থেকে জমি কেলেঙ্কারির সমস্ত অভিযোগ সম্পর্কেই তিনি বলেছেন, এই বিষয়ে যা বলার এসআইটি তদন্ত করে জানাবে। বারবার করে এদিন তিনি এসআইটি’র কথাই বলে অস্বস্তিকর প্রশ্নের জবাব এড়িয়েছেন। মিডিয়াও মিথ্যা বলছে বলে অভিযোগ করেছেন গিরি। ২২ জুলাই ফের ট্রাস্টের বৈঠক হবে। ততদিনে এসআইটি’র তদন্ত হয়ে যাবে বলেও গিরি জানিয়েছেন। 
দু’দিন আগে ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ হিসাবে গিরি একটি চিঠি প্রকাশ করে যা বলেছিলেন, তার সার কথা ছিল তিনি নামেই কোষাধ্যক্ষ। ট্রাস্টের স্থানীয় লোকজনই সব হিসাব দেখভাল করেন। চুরির দায় নিতে না চেয়ে ওই চিঠি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু এই চিঠি সামনে আসার পরে আরও বিতর্ক তৈরি হয়। স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ট্রাস্টের অন্য কেউই কিছু নন, সবই নাম-কা ওয়াস্তে। অযোধ্যার সাধুরাই প্রশ্ন তোলেন, কোনও ক্ষমতাই যখন ছিল না, তখন তিনি কোষাধ্যক্ষ পদ আগলে ছিলেন কেন? এদিন এই নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে পড়েন গোবিন্দদেব গিরি। তিনি বলেন, ট্রাস্টের লোকেরা আমার সঙ্গে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। 
এদিন ট্রাস্টের বৈঠকে চম্পত রায়, অনিল মিশ্ররা ছিলেন না। আমন্ত্রিত সদস্য গোপাল রাওকে ডাকা হয়নি। বৈঠকের পরে হিন্দিতে তিন পাতার এক বিবৃতি প্রকাশ করে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দানপাত্র থেকে চুরির ঘটনার নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে চম্পত রায় এবং অনিল মিশ্র ইস্তফা দিয়েছিলেন। ট্রাস্ট এই ‘নৈতিকতার’ ভিত্তিতে দেওয়া ইস্তফা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ লিখিত বিবৃতিতেও চম্পত রায়দের ‘মহান’ প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছে। বৈঠক থেকে চম্পত রায়ের জায়গায় নতুন কারোকে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বদলে ট্রাস্টের বৈঠকে নতুন সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করা পর্যন্ত ট্রাস্টের সদস্য কৃষ্ণমোহনকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি আপাতত দেখভাল করবেন। উল্লেখ্য, ট্রাস্টের সদস্য কামেশ্বর চৌপালের মৃত্যুর পরে ২০২৫ সালে কৃষ্ণমোহনকে ট্রাস্টের সদস্য বানানো হয়। তিনি উত্তর প্রদেশের হরদোই জেলার বাসিন্দা। ইন্ডিয়ান ফরেস্ট সার্ভিস (আইএফএস) মহারাষ্ট্র ক্যাডারে ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি ভারতীয় বন সেবায় যুক্ত হন। নাগপুরে পোস্টিং থাকার সময় থেকেই আরএসএস’র সঙ্গে যুক্ত। ২০১২ সালে অবসরের পরে হরদোই ফেরার পর থেকে পূর্ণ সময়ের জন্যই আরএসএস’র কাজ করেন। আরএসএস’র বহু গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব সামলেছেন। অর্থাৎ চম্পত রায়ের জায়গায় অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য যাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, তিনিও একেবারে আরএসএস’র খাস লোক। 
ট্রাস্টের পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং গোবিন্দ গিরি কৃষ্ণমোহনকে সঙ্গে নিয়ে যে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন, তাতে এর আগে আরএসএস নেতা দত্তাত্রেয় হোসাবালে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন সেই মোতাবেকই কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি, সংস্থা এবং সাংবাদিকদের কাছে রামমন্দির ট্রাস্টের কোনও তথ্য থাকলে প্রকাশ্যে না জানিয়ে এসআইটি-কে জানতে। অর্থাৎ কোনোভাবেই আর দুর্নীতির খবর যাতে সংবাদ মাধ্যম মারফত জনগণের সামনে না আসে, সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছে ট্রাস্ট। পাশাপাশি আরএসএস’র লাইন অনুযায়ীই বলা হয়েছে, কিছু লোক রামলালা মন্দির, শ্রীরাম জন্মভূমি, হিন্দু সমাজ এবং ব্যাপক হিন্দু আস্থাকে দুর্বল করতে চাইছে। ভিত্তিহীন অভিযোগ করে জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের সংখ্যা কম হয়নি। উল্লেখ্য, চুরির খবর সামনে আসার পর থেকে একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল দেখিয়েছে, স্থানীয় দোকানদাররাও বলেছেন রামমন্দিরে চুরির খবর সামনে আসার পর থেকে অযোধ্যায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কম হয়ে গেছে। ট্রাস্ট এদিন আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, সব ঠিক আছে প্রমাণ করে পরিস্থিতি আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার। 
ট্রাস্টের বিবৃতিতে এদিন একটি হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ট্রাস্ট মোট ৩২৬৪ কোটি টাকা মন্দির নির্মাণের জন্য দান ও চাঁদা হিসাবে পেয়েছিল। এরমধ্যে ২৩৭০ কোটি টাকা মন্দির নির্মাণ ও অন্যান্য কাজে খরচ হয়েছে। ট্রাস্ট বলেছে, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দর্শনার্থীরা দান হিসাবে মন্দিরে যে অর্থ দিয়েছেন, তার পরিমাণ ৫৮২ কোটি টাকা। এরমধ্যে নাকি ৩৯১ কোটি টাকা মন্দির পরিচালনা এবং অন্য খাতে খরচ হয়ে গেছে। ট্রাস্টের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দর্শনার্থীরা ২৯৬২ রকমের উপহার দিয়েছেন, তার সব রেজিস্টারে আছে। রামমন্দিরে দেওয়া বহুমূল্য হার, চরণ পাদুকা, সোনায় মোড়া রামচরিতমানস, কাকভূষন্ডির মূর্তি এদিন হাজির করা হয়- যাদের দাতারা এই সব কোথায় গেল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এরপরে যদিও সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এক মাস ধরে এই সব নিয়ে যখন অভিযোগ তোলা হয়েছে, তখন কেন ট্রাস্ট তা নিয়ে জবাব দেয়নি। তাহলে কী এগুলি অন্য কোনও সংগঠনের অফিসে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। এখন এতদিন বাদে সেটা আবার হাজির করা হয়েছে পরিস্থিতির চাপে পড়ে?

Comments :0

Login to leave a comment