বই
মুক্তধারা
ভ্রমনকাহিনীর অবয়বে ইতিহাস চর্চা
কৃশানু ভট্টাচার্য
বইটির উপ শিরোনামে বলা হয়েছে কপিলাবস্তু ও লুম্বিনী ভ্রমণ এবং অনুসন্ধানের বিবরণ। পাঠক যদি ভ্রমণ কাহিনী আস্বাদনের অভিরুচি নিয়ে এই বইটি পড়তে শুরু করেন তাহলে দেখবেন, ভ্রমণ কাহিনীকে নিপুণ মুন্সীয়ানায় একজন লেখক একটি ঐতিহাসিক দলিলের চেহারা দিয়েছেন। শাক্য রাজকুমার সিদ্ধার্থের জীবনকে অবলম্বন করে বইটির এগিয়ে চলা। লেখক নিজে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত স্থান গুলি ভ্রমণ করেছেন। আর ভ্রমণ করতে করতেই তিনি মিলিয়ে দেখেছেন লুম্বিনী কপিলাবস্তুর সন্ধানে ভারতীয় তথা আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষকদের সুপ্রাচীনকাল থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত অনুসন্ধানের ইতিবৃত্ত উঠে এসেছে চিনা পরিব্রাজক এবং বিবরণের কথা। উঠে এসেছে ব্রিটিশ আমলে প্রথম ভারতীয় প্রত্ণতত্ত্ববিদ পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অনুসন্ধানের বিস্তারিত আলোচনা। এর পরবর্তী স্তরে দেবলা মিত্র সহ বহু ভারতীয় গবেষকদের অনুসন্ধান এবং এশিয়া প্যাসিফিক এক্সচেঞ্জ এন্ড কোঅপারেশন এর নেতৃত্বে কিভাবে লুম্বিনীকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে তার কথাও। অথচ বইটি রচিত হয়েছে ভ্রমণ কাহিনীর আদলে।
লেখক নেপালি গিয়েছেন গোরক্ষপুরের পথ ধরে। সেই যাত্রা পথের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি ষোড়শ মহাজনপদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পর্কে পাঠকদের বিস্তারিত আকারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। প্রসঙ্গ অনুসারেই প্রতিটি জনপদের ভৌগোলিক অবস্থানের পাশাপাশি শাসকদের কথা এবং প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র উঠে এসেছে তাঁর আলোচনায়। বইটির শিরোনাম দেখে পাঠক ধারনাই করতে পারবেন না যে বাড়তি পাওনা হিসেবে তিনি কি পেতে চলেছেন।
বইটির শিরোনাম' বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধান্ত ছিলেন'। এই আলোচনা করতে গিয়ে তিনি শুদ্ধোধনকে সাক্ষ্য সরকারের একজন নির্বাচিত প্রধান হিসেবে তুলে ধরেছেন। তুলে ধরেছেন রাজা শুদ্ধোধনের পুত্র সন্তান জন্মের বৃত্তান্ত সাহায্য নিয়েছেন বুদ্ধচরিত থেকে শুরু করে বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রাচীন শাস্ত্র এবং গ্রন্থের। এর পরবর্তী স্তরে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থানের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি সৈনিক পরিব্রাজকদের বিবরণ সম্রাট অশোকের স্তুপ নির্মাণ এবং আধুনিক যুগে ওই স্থান নিয়ে যাবতীয় অনুসন্ধান এবং গবেষণাগুলিকে একত্রিত করেছেন। উন্মোচিত করেছেন কপিলাবস্তু রহস্য। কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ এবং কিভাবে সাক্ষ্য বংশ ধ্বংস হলো তার সম্পর্কেও ইতিহাস গ্রাহ্যবহু নথি এবং প্রমাণ তিনি তুলে ধরেছেন তার এই গ্রন্থে। সঙ্গে রয়েছে প্রচুর প্রামাণ্য ছবি যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদনে প্রকাশিত এবং বেশ কিছু ছবি লেখকের নিজের সংগ্রহ। লুম্বিনী উদ্যান কে কেন্দ্র করে যুগে যুগে যে সমস্ত বিতর্কগুলো উঠে এসেছে সেই সমস্ত বিতর্ক গুলোর উল্লেখ করেছেন লেখক।
বইটির শেষ অংশে রয়েছে পরিশিষ্ট। এই পরিশিষ্ট অংশে অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধার করা হয়েছে। রয়েছে মায়া দেবী মন্দিরের খননে প্রাপ্ত প্রত্ন বস্তু গুলির সারণি এবং 29 জন বুদ্ধের তালিকা । বইটির তথ্যসূত্রের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কি নিবিড় অধ্যায়ন এবং অনুসন্ধানের ফসল আলোচ্য গ্রন্থটি।
বইটির প্রকাশক অত্যন্ত যত্নে সঙ্গে বইটির নির্মাণ করেছেন। সেই দিক থেকেও তারা প্রশংসার দাবি রাখতে পারেন। প্রত্নতত্ত্ব এবং ইতিহাস চর্চার আগ্রহী পাঠক এই বইটি পড়লে বিশেষভাবে ভারতের ইতিহাসের অপেক্ষাকৃতভাবে কম আলোচিত একটি অধ্যায় সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরি করতে পারবেন।
বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধান্ত ছিলেন
দীপান ভট্টাচার্য
জয়ঢাক, কলকাতা
Comments :0