প্রবন্ধ | ঠাকুর পরিবারে বিজ্ঞান চর্চা
তপন কুমার বৈরাগ্য
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৫ জুন ২০২৬
বাঙালির বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির দান কখনো ভুলবার নয়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকরদাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সমাজসংস্কারের পাশাপাশি বিজ্ঞান প্রসারের উদ্যগ নিয়েছিলেন।চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির জন্য তিনি বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে অকাতরে অর্থ দান করে গেছেন।
তিনি শবব্যবচ্ছেদ প্রবর্তনেও বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন।তার পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।রবীন্দ্রনাথের বয়েস যখন মাত্র বারো বছর তখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ডালহৌসি পাহারে যান।সেখানে রবীন্দ্রনাথকে গ্রহনক্ষত্র সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেন।দেবেন্দ্রনাথ
ঠাকুর ছিলেন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী পুরুষ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীও ছিলেন বিজ্ঞানচেতনা প্রসারে একজন উল্লেখযোগ্য নারী।তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতী পত্রিকা সম্পাদনা করে গেছেন।এই পত্রিকায় তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করে ভারতীয় নারীদের আলোর
পথে নিয়ে এসেছিলেন।তার স্মরণীয় কীর্তি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ পৃথিবী।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।তার বিজ্ঞানে ,গণিতে মৌলিক অবদান আছে।তিনি বাংলা শর্টহ্যান্ড বা সাংকেতিক লিপির প্রবর্তক।এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা খুব তাড়াতাড়ি লেখা সম্ভব হয়।তিনি পৃথিবী বিখ্যাত গণিতবিদ ইউক্লিডের জ্যামাতি নিয়ে
চিন্তাভাবনা করেন। হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র। তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যায়ন করেন।তিনি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের স্থূলমর্ম নামক মূল্যবান বইটা লেখেন।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলার বিজ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।তিনি ফ্রেনোলজি বা শিরোমিতিবিদ্যার চর্চা করতেন।ফ্রেনোলজি হলো প্রকৃতিতে উদ্ভিদ এবং প্রাণীর জীবনচক্রের পর্যায়ক্রমিক ঘটনাগুলোর সময়কাল এবং ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক
অধ্যয়ন।যাকে সহজ কথায় বলা হয় প্রকৃতির ক্যালেন্ডার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একমাত্র বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থটার নাম বিশ্বপরিচয়।১৯৩৭খ্রিস্টাব্দে এই গ্রন্থটা প্রকাশিত হয়। তার বিজ্ঞানবিষয়ক রচনাগুলোর নাম গ্রহগণ, জীবের আবাসভূমি, সামুদ্রিক জীব,কীটাণু,শূন্য,জগৎপীড়া,বৈজ্ঞানিক সংবাদ,মাকড়সা সমাজে স্ত্রীজাতির গৌরব,ডেক্রে পিঁপড়ের মন্তব্য,উটপক্ষীর লাথি,
মানবশরীর ইত্যাদি।তার বিজ্ঞানবিষয়ক রচনাগুলো তত্ত্ববোধিনী, বালক,ভারতী,সাধনা,বঙ্গদর্শন ,প্রবাসী প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাই বলা যায় বাঙালির বিজ্ঞান ভাবনায় ও বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অবদান কোনো অংশে কম নয়।
Comments :0