প্রতীম দে
কেন্দ্রীয় সরকার বার বার দাবি করে ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। সত্যি কি তাই? এটা কোনও কাল্পনকি প্রশ্ন না, স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও আমাদের দেশের সব মানুষ কি পেট ভরে খেতে পায়?
এ তথ্য আন্তর্জাতিক স্তরেই স্বীকৃত যে ভারতে বিশ্বের সবথেকে বেশি ক্ষুধার্ত মানুষের বাস।
সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য একটাই, বাজার দখল করা। এখন বন্ধু মোদীর সাহায্য ভারতের বাজার দখল করার পরিকল্পনা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অবাধে মার্কিন পণ্য ভারতে প্রবেশ করবে, বাজার দখল করবে। কিন্তু তাতে দেশের কৃষকের কি লাভ?
তথ্য কী বলছে
পরিসংখ্যান বলছে ১২৭ টি দেশের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সূচকের তালিকায় ভারতের স্থান ১০৫ তম। ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৩.৭ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। ৩৫.৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। ২.৯ শতাংশ শিশুর জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যে মারা যায়। ২৭.৪ শতাংশ শিশু জন্মায় কম ওজন নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশি শিশু অপুষ্টির শিকার। Wasting (১৮.৭%) ও Stunting (৩১.৭%)-এর শিকার। Wasting হলো বয়সের তুলনায় ওজন কম হওয়া এবং Stunting হলো বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়া।
১৫-৪৯ বয়সসীমার মহিলাদের ৫৩ শতাংশ রক্তাল্পতার শিকার। ২০২৪ এর রিপোর্টে বিশ্বজুড়েই সঙ্কটের দিকে নজর টানা হয়েছে। বলা হয়েছে বিশ্বে প্রতি ১১ জনের একজন ক্ষুধার সঙ্কটে আক্রান্ত। ভারতে ২৭.৪% শিশুর জন্ম হয় কম ওজন নিয়ে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এটি মূলত মাতৃ পুষ্টিহীনতার প্রতিফলন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশি নারী (৫৩%) অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতায় ভুগছেন। ৫৪.২% শিশুর মধ্যে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা যায়।
পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী এরাজ্যে ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১,০০০ শিশুর মধ্যে ১৮ জনের জন্মের সময় মৃত্যু হয়েছে ।
আসল সমস্যা হলো শর্করা, প্রোটিন, স্নেহজাতীয় দ্রব্যের যে সুষম খাদ্যতালিকা দরকার, তা থাকছে না। ভিটামিন প্রয়োজন অনুযায়ী মিলছে না।
অথচ ভারতে খাদ্য সুরক্ষা আইন রয়েছে। রেশন ব্যবস্থা, অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিল প্রকল্প চালু রাখা হয়েছে যার প্রধান উদ্দেশ্য ন্যূনতম পুষ্টি নিশ্চিত করা। বাজেটে তো ছাঁটকাট আছেই, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের নামেও চলছে বাদ দেওয়া বা এক্সক্লুশন। পশ্চিমবঙ্গেই, বিশেষত, প্রান্তিক অংশর মধ্যে কোনও সহায়তা না পেয়ে খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা যাচ্ছে।
যে দেশে জ্ঞান আর দর্শনের আলোয় বিশ্বকে পথ দেখানোর কথা ছিল, সেই দেশেই স্বাধীনতার পরে প্রায় আট দশক পেরিয়ে আজও ক্ষুধার কালো ছায়া। একবিংশ শতাব্দীর চৌকাঠে দাঁড়িয়েও যখন আমাদের শিশুদের ভুখা পেট অপুষ্টিতে ফুলে ওঠে, আর যুবক-যুবতীদের চোখে খাদ্যের বদলে কেবল অন্ধকার, তখন প্রশ্ন জাগে— কেন এই পরিস্থিতি!
দাম আর কত বাড়বে?
কেবল দেশের বিষয় নয়, রাজ্যেও চড়া চালের দাম। কৃষক নামমাত্র দামে বিক্রি করলেও বাজারে ক্রেতাকে কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। আড়তদার আর ফড়েদের দাপটে প্রান্তসীমায় কৃষক এবং ক্রেতা। চড়া দামের জন্য শাকসবজিও মানুষের নাগালের বাইরে। ভাতের পাতে মাছমাংস এখন নিম্নবিত্ত গরিব মানুষের কাছে স্বপ্ন। ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে মোদীর আমলে প্রায় দ্বিগুণ। এই সময়েই বড় ব্যাপারী হয়ে দাঁড়িয়ে আদানি গোষ্ঠী। আর মোদী উপদেশ দিচ্ছেন স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে কম তেল খাওয়া ভালো! লক্ষণীয়, ভারতে মূল্যবৃদ্ধির বছরের বড় সময় জুড়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির হার প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে খাদ্যদ্রব্যের চড়া দামের কারণে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্য সুষম খাদ্য কিনতে পারছে কতজন?
বাংলায় ১৯৪৩’র দুর্ভিক্ষ উৎপাদন কম হওয়ার জন্য হয়নি। আসলে ব্রিটিশ শাসন ভেঙে দিয়েছিল খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা। ভারতে ব্রিটিশ মুদ্রানীতির প্রধান তখন ছিলেন অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইন্স। তাঁর পরামর্শেই মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যে মূল্যবৃদ্ধির নীতি নেয় ব্রিটিশ সরকার। নোট ছাপিয়ে যুদ্ধের খরচ তোলার নামে ভারতের বাজারে দাম বাড়িয়ে সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় খাদ্যদ্রব্য। আরেকদিকে বাড়তে থাকে মজুতদারিও।
অর্থনীতিবিদ উৎসা পট্টনায়েক প্রশ্ন তুলছেন, একদিকে বিশ্বব্যাঙ্ক এবং দেশের সরকার খতিয়ান দিচ্ছে উদার অর্থনীতির তিন দশকে কত কোটি মানুষকে দারিদ্রের বাইরে টেনে বের করা হয়েছে। অথচ পুষ্টি গ্রহণের তথ্য বিচার করলে দেখা যাচ্ছে শহরে এবং গ্রামে ক্ষুধার মাত্রা বেড়েছে মারাত্মকভাবে। এটা প্রশ্ন নয় যে দারিদ্র কমলে ক্ষুধা বাড়ছে কী করে। বরং উলটো, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে যে সময়ে তখনই দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার হিসাব দেওয়া হচ্ছে কী ক’রে!
এরাজ্যে চলছে আন্দোলন
২০ এপ্রিল ব্রিগেডের সমাবেশ থেকে এই সঙ্কটের কিছুটা আভাস পাওয়া গিয়েছিল সারা ভারত কৃষক সভার রাজ্য নেতৃত্বের কথায়। সেদিন কৃষকসভার রাজ্য সম্পাদক অমল হালদার তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২৭ বছর আগে তেভাগার বর্ষপূরণ উপলক্ষে কৃষক সমাবেশ হয়েছিল। ওই তেভাগা আন্দোলনের কারণেই দাঙ্গা আটকে ছিল, আজকে যে অবস্থা চলছে তাতে রাজ্যের কৃষক সমাজ সঙ্কটের মুখে। কৃষকেরা ফসলের দাম পাচ্ছে না। তাদের অবস্থা কঠিন। মাইক্রো ফাইন্যান্সের কবলে পড়েছেন তাঁরা। একদিকে ফসলের দাম পাচ্ছে না অন্যদিকে পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়ছে, এবার বলছে স্মার্ট মিটার বসানো হবে। ফলে আরও সর্বনাশ হবে কৃষকদের। অতীতে জোতদারদের থেকে কেড়ে নেওয়া জমি আবার জোতদারদের কাছে চলে যাচ্ছে তৃণমূলের আমলে।’
এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে একশো দিনের কাজের জব কার্ড পাওয়ার লড়াই। চলছে ব্লক দপ্তরে ডেপুটেশন। এমনকি ডেপুটেশনও নিতে নারাজ প্রশাসনের ব্লক স্তরের কর্তারা। আগস্টে একশো দিনের কাজ চালুর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। অথচ তা শুরু হয়নি। কেন্দ্র এবং রাজ্য মিলেমিশে আটকে রেখেছে এই প্রকল্প যার সঙ্গে জড়িয়ে গ্রামের মানুষের মজুরি, কেনার ক্ষমতার প্রশ্ন। একই সঙ্গে চলছে বর্গাদারদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জমি পুনর্দখলের লড়াই।
সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই খাদ্য সুরক্ষার জন্যও
দুগ্ধজাত পণ্য, মুরগি, ভুট্টা, সয়াবিন, চাল, গম, ইথানল, সাইট্রাস ফল, বাদাম, আপেল, আঙ্গুর, টিনজাত পীচ, চকলেট, কুকিজ এবং হিমায়িত ফ্রেঞ্চ ফ্রাই সহ বিস্তৃত পরিসরের আমেরিকান পণ্যের জন্য ভারতকে তার বাজার উন্মুক্ত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে। ভারত মার্কিন শুকনো ফল এবং আপেলের ক্ষেত্রে ছাড় দিতে ইচ্ছুক হলেও, ভুট্টা, সয়াবিন, গম এবং দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজি নয়। কারণ এই সব ভারতের মাটিতেই হয়। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজার খুলে দিলে এই সব ক্ষেত্রে চাষিদের সঙ্কট বাড়বে। তার কারণ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে ফসল ফলাতে পারবে তা প্রযুক্তির অভাবে ভারতের কৃষক পারবে না। তার সাথে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিতে বিপুল ভর্তুকি। ফলে কম দামে তারা কৃষিজাত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারে। এর ফলে কৃষকদের সঙ্কট আরও বাড়বে। গরিব মানুষের মধ্যে অপুষ্টি আরও বাড়বে।
এখানেই শেষ নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে তাদের থেকে ইথানল কেনার জন্য। মার্কিন প্রশাসন চাইছে তাদের থেকে ইথানল কিনে তা পেট্রোল ডিজেলের সাথে মিশিয়ে জ্বালানির কাজে ব্যবহার করুক ভারত। গত বছর আমেরিকা থেকে ভারত ৪২০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ইথানল রপ্তানি করেছে, যা মূলত ওষুধ এবং অন্যান্য শিল্প ব্যবহার করা হতো। আমেরিকা চায় ভারত জ্বালানি ব্যবহারের জন্যও ইথানল আমদানি করুক। অপরদিকে ভারতে জ্বালানির ইথানল তৈরির জন্য খাদ্যশস্যের চাষ কমছে। সরকারি মদতে বাড়ানো হচ্ছে এই প্রক্রিয়া। খাদ্য বনাম জ্বালানি বিতর্ক জোরালো হচ্ছে দেশে।
মার্কিন কৃষকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল জিএম ভুট্টা এবং সয়াবিন চাষ করে। ভারত বর্তমানে জিএম ভুট্টা এবং সয়াবিন থেকে উৎপাদিত নন-ফুয়েল ইথানল এবং তেল আমদানির অনুমতি দেয়, তবে শস্য এবং তৈলবীজ আমদানির অনুমতি দেয় না। কিন্তু এই নীতি কার্যকর করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন প্রবল চাপ তৈরি করছে। তাই ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর মান অনুযায়ী, ভারতে এবং অন্যান্য দেশে শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক খাদ্য প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির বেশিরভাগ খাদ্য পণ্যই অস্বাস্থ্যকর। এই ধরনের আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড (অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার) বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ।
আজও দেশে রাজ্যে চলছে খাদ্যের জন্য লড়াই। খাদ্য পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই। একারণেই ফিরে দেখা প্রয়োজন ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন এবং স্মরণে রাখা দরকার খাদ্য আন্দোলনের সেই অমর শহীদদের।
Comments :0