Neora Valley-Army Camp

নেওরাভ্যালির গভীর অরণ্যে সেনাছাউনি গড়ার প্রস্তাব, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আশঙ্কা

রাজ্য জেলা

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কালিম্পঙ জেলার নেওরাভ্যালি জাতীয় উদ্যানের গভীর অরণ্যে সেনাছাউনি গড়ার প্রস্তাব ঘিরে পরিবেশ মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারত, ভুটান ও সিকিমের সংযোগ স্থলের কাছে প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় জোরপোখরিয়া এলাকায় তিন হেক্টর জমিতে সেনাছাউনি তৈরির প্রস্তাব সামনে এসেছে। সীমান্ত সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংরক্ষিত অরণ্যের এই সংবেদনশীল এলাকায় নির্মাণকাজ, রাস্তা তৈরি এবং সেনা চলাচল বাড়লে বিরল বন্যপ্রাণের আবাসস্থল বিপন্ন হতে পারে। তাঁদের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অরণ্য সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সেনাছাউনি তৈরির জন্য জমি চেয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখান থেকে প্রস্তাবটি রাজ্য সরকারের কাছে আসে। জানা গিয়েছে গত ২৩ সেপ্টেম্বর কালিম্পং জেলাশাসকের দপ্তরে ইকো সেনসিটিভ জোন মনিটরিং কমিটির প্রথম বৈঠক হলেও সেখানে সেনাছাউনির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়নি। প্রস্তাবিত জমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকা ইকো সেনসিটিভ জোনের নির্ধারিত দুই কিলোমিটার পরিসরের বাইরে থাকায় বিষয়টি বর্তমানে ওই কমিটির এক্তিয়ারভুক্ত নয় বলে জানানো হয়েছে।
রাজ্যের বনমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার যে নির্দেশ দেবে, সেই অনুযায়ী রাজ্য পদক্ষেপ করবে। অন্যদিকে, পর্যটনমন্ত্রী জানিয়েছেন, নেওরাভ্যালিতে তাঁরা কোনও ধরনের পর্যটনের প্রসার চান না। তবে সেনাছাউনি নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগের নিরসনে কী পদক্ষেপ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে নেওরাভ্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেড পান্ডা, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার ও ক্লাউডেড লেপার্ডের মতো বিরল বন্যপ্রাণের বিচরণক্ষেত্র এই অরণ্য। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, সেনাছাউনি তৈরির জন্য রাস্তা নির্মাণ, ভারী যানবাহনের চলাচল, নির্মাণ সামগ্রী পরিবহণ এবং নিয়মিত সেনা যাতায়াতের ফলে অরণ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণের চলাচলের পথ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিবেশকর্মী অভিযান সাহার বক্তব্য, এর প্রভাব নেওরাভ্যালির গণ্ডি ছাড়িয়ে সিকিমের পাংগোলা এবং ভুটানের জাতীয় উদ্যানের বাস্তুতন্ত্রেও পড়তে পারে।
প্রস্তাবিত এলাকার ভূতাত্ত্বিক অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। নবীন অব-হিমালয় পর্বতমালার এই অঞ্চল ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকিপ্রবণ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা পাহাড়ের ঢাল কেটে রাস্তা তৈরি বা বড় নির্মাণকাজ চালানো হলে ভূমিধসের আশঙ্কা বাড়তে পারে। পাশাপাশি, পাহাড়ি ঝরনার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও জলনিকাশের ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে।

জলপাইগুড়ির ভূগোলের অধ্যাপক দেবর্ষি ঘোষের মতে, চীনের আগ্রাসন মোকাবিলায় সেনাছাউনির প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তবে গভীর অরণ্যে নির্মাণকাজের ফলে বন্যপ্রাণের আবাসস্থল বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিবেশকর্মী সুজয় সরকারের বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে সেনাছাউনি অপরিহার্য হলে সংরক্ষিত অরণ্যের উপর তার প্রভাব সর্বনিম্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প স্থান চিহ্নিত করা এবং পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে নির্মাণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে প্রস্তাবিত এলাকার পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা করা হোক। বন দপ্তর ও প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ভিত্তিতে বিকল্প স্থান এবং নির্মাণের সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সীমান্ত সুরক্ষা ও অরণ্য সংরক্ষণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে না দেখে,দুইয়ের প্রয়োজন বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
 

Comments :0

Login to leave a comment