Trump India

আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা সামলাতে মোদী লাগিয়েছিলেন ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ লবি সংস্থাকে

জাতীয়

মোদী নিজে কখনও সরাসরি অস্বীকার করেননি, কিন্তু ট্রাম্প অন্তত বার পনেরো দাবি করেছেন ভারত-পাক সংঘাত থামিয়েছেন তিনিই। এরই মধ্যে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এল। সেই সময় ‘অপারেশন সিঁদুর’ ও বাণিজ্য আলোচনা সামলাতে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ সংস্থাকে নিয়োগ করেছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়, ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সামলাতে বিশ্বগুরুর সরকার দ্বারস্থ হয়েছিল ওই লবি সংস্থার।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ২০২৫ সালে বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনা এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়ে বিভিন্ন বৈঠক আয়োজনের জন্য একটি মার্কিন লবি সংস্থা নিয়োগ করেছিল—এ তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে দাখিল করা ফারা (ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন) নথিতে। ফারা নথি অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস বাণিজ্য আলোচনা, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং ভারত–মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক প্রাক্তন সহকারীর লবি সংস্থা এসএইচডব্লিউ এলএলসি-কে কাজে লাগিয়েছিল। ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে, এই সংস্থাকে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং সিআইএ প্রধান জন র্যাসটক্লিফের মতো শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে ভারতের মন্ত্রী, বিদেশসচিব ও রাষ্ট্রদূতের বৈঠক নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দপ্তরে জমা দেওয়া এসএইচডব্লিউ -এর ফারা নথিতে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর যুদ্ধ বিরতির দিন ১০ মে ভারতীয় দূতাবাস ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের তিন শীর্ষ আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এদের মধ্যে ছিলেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের রিকি গিল। নথি অনুযায়ী, ওই দিন সংঘর্ষ সংক্রান্ত “মিডিয়া কভারেজ” নিয়ে আলোচনা হয়। যদিও কলগুলি যুদ্ধবিরতির আগে না পরে—তা নথিতে স্পষ্ট করা হয়নি, তবে একই দিনে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
এদিকে, পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর চার দিনের ভারত–পাকিস্তান সংঘর্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনও মধ্যস্থতার ভূমিকা নেয়নি, এই দাবি করে আসছে মোদী সরকার। যদিও মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ভিন্ন দাবি করেছেন এবং মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ভূমিকার জন্য রিকি গিলকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে, সংঘর্ষ না থামলে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, ট্রাম্পের এই দাবিও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ঠারেঠুরে অস্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি গ্রিয়ারের সঙ্গে ফোনালাপের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ফারা নথিতে উল্লিখিত তথ্য ও ১০ মে-র নির্দিষ্ট ফোনালাপের সত্যতা যাচাই করতে ‘দ্য হিন্দু’ দিল্লির বিদেশ মন্ত্রক ও ওয়াশিংটনের ভারতীয় দূতাবাসের কাছে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠিয়েছে। কোনও জবাব এলে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এসএইচডব্লিউ এলএলসি’র দাখিল করা নথি দিল্লির কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি করেছে। কারণ, সংস্থাটি দাবি করেছে যে গত এক বছরে তারা বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি, উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পবন কপূর এবং রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রার মতো শীর্ষ ভারতীয় আধিকারিকদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের বৈঠকের ব্যবস্থাও করেছিল।
জুন মাসে কোয়াড বিদেশ মন্ত্রী বৈঠকে যোগ দিতে জয়শঙ্করের ওয়াশিংটন সফরের আগে এই ধরনের ব্যবস্থা নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন বিদেশ মন্ত্রকের বর্তমান ও প্রাক্তন আধিকারিকরা। তাঁদের মতে, স্বাভাবিক দ্বিপাক্ষিক চ্যানেলের বদলে ভারত–মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক ও ‘অপারেশন সিঁদুর’ সংক্রান্ত বহু বৈঠকই ট্রাম্পের প্রাক্তন মুখপাত্র জেসন মিলারের নেতৃত্বাধীন এই লবি সংস্থার মাধ্যমে আয়োজন করা হয়েছে। যদিও ভারতীয় দূতাবাস সাধারণত একসঙ্গে ২–৩টি লবি সংস্থার সঙ্গে পরামর্শ চুক্তিতে থাকে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় শিবিরের সঙ্গেই কাজ করার জন্য। তবে এই প্রথম কোনও লবি সংস্থাকে সরাসরি মার্কিন সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক ও ফোনালাপ নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘সাধারণত এই ধরনের বৈঠকের অনুরোধ দূতাবাস নিজেই করে থাকে।’ সর্বভারতীয় দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’-কে এমনই জানিয়েছেন অন্তত দু’জন সরকারি আধিকারিক। এক প্রাক্তন কূটনীতিকের মতে, ‘এতে মনে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ধরনের সম্পৃক্ততার নিয়ম চালু করেছে, আর ভারত সরকারের সামনে সেই অনুযায়ী চলা ছাড়া তেমন বিকল্প ছিল না।’ আর এক আধিকারিক বলেন, লবি সংস্থাগুলিকে সাধারণত ‘পরামর্শ ও পরিস্থিতি বোঝার জন্য’ নিয়োগ করা হয়, দরজা খোলার ক্ষেত্রে তারা সাহায্য করে, কিন্তু সরাসরি বৈঠক ও ফোনালাপ কূটনীতিকরাই করেন। এক প্রাক্তন কূটনীতিক আরও বলেন, অতীতে ভারতের অবস্থান ছিল পাকিস্তানের মতো দেশগুলির থেকে আলাদা, যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাব বাড়াতে ব্যাপকভাবে লবি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করত।
ফারা নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল ভারতীয় দূতাবাস এসএইচডব্লিউ এলএলসি-কে এক বছরের জন্য নিয়োগ করে। এটি ছিল দূতাবাসের অন্যান্য নিয়মিত লবি সংস্থার পাশাপাশি—যার মধ্যে রয়েছে রিপাবলিকান-ঘনিষ্ঠ বিজিআর, ডেমোক্র্যাট-ঘনিষ্ঠ কর্নারস্টোন গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স এবং আফ্রিকান-আমেরিকান ককাসের সঙ্গে যুক্ত দ্য উইলিয়ামস গ্রুপ। এসএইচডব্লিউ ’র আর কোনও ক্লায়েন্ট ছিল না বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এক বছরের চুক্তিতে সংস্থাটিকে মোট ১৮ লক্ষ ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮.১১ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে, যা দুই দফায় পরিশোধ করা হয়।
২৪ এপ্রিলেই প্রথম নথিভুক্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রদূত বিনয় কোয়াত্রার অনুরোধে প্রতিরক্ষা দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কলবির সঙ্গে বৈঠকের জন্য ফোন করা হয়েছিল। ১০ মে-র ফোনালাপ ছাড়াও, বিরোধী দলনেতা শশী থারুরের নেতৃত্বে সংসদীয় প্রতিনিধিদলের জন্য ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স-সহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ করার বিলও দূতাবাসকে পাঠিয়েছে এসএইচডব্লিউ ।
২৩ জুন, কোয়াড বৈঠকের জন্য জয়শঙ্করের ওয়াশিংটন সফরের কয়েক দিন আগে, এসএইচডব্লিউ  দাবি করে যে তারা বিদেশ মন্ত্রীর সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং সিআইএ প্রধান জন র্যাদটক্লিফের বৈঠকের অনুরোধ জানিয়ে ই-মেল পাঠিয়েছিল। ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর জয়শঙ্কর মোট ছ’বার যুক্তরাষ্ট্র সফর করলেও, এই সফরেই শুধু এই ধরনের অনুরোধের নথি পাওয়া গেছে।
মোট ৬০টি এন্ট্রির মধ্যে ৩০টিই ছিল ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাণিজ্য আধিকারিক ও হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে ফোনালাপের অনুরোধ—যার উদ্দেশ্য ছিল ‘ভারত–মার্কিন বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি’ নিয়ে কথা বলা। যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতের উপর ২৫ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক এবং তেলের আমদানির জন্য আরও ২৫ শতাংশ দণ্ডমূলক শুল্ক আরোপ করে, তখন এই ফোনালাপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
পরবর্তীতে ট্রাম্প ও মোদীর মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তা বিনিময়ের পর উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলে, এসএইচডব্লিউ  হোয়াইট হাউসের আধিকারিকদের ফোন করে প্রধানমন্ত্রী মোদীর একটি সোশাল মিডিয়া পোস্টের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ৬ সেপ্টেম্বর এক্স (সাবেক টুইটার)-এ মোদীর সেই পোস্টের কথা, যেখানে তিনি হোয়াইট হাউস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্পের ভারত–মার্কিন সম্পর্কের প্রশংসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পর, ১৭ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী মোদীকে জন্মদিনে ফোন করেন এবং তারপর থেকে দুই নেতার মধ্যে একাধিকবার কথা হয়েছে।
এই সময়েই জেসন মিলারের ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি সামনে আসে। গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তোলা একটি ছবি পোস্ট করে লেখেন, ওয়াশিংটন সফর তাঁর জন্য বিশেষ হয়ে উঠেছে কারণ তিনি ‘কাজের মধ্যে থাকা আমাদের প্রেসিডেন্টকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন’। যদিও ওই সাক্ষাতে ভারত–মার্কিন সম্পর্ক নিয়ে কোনও আলোচনা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ৯ অক্টোবর আবার এসএইচডব্লিউ  হোয়াইট হাউসের আধিকারিকদের ফোন করে গাজা শান্তি প্রস্তাব নিয়ে ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে মোদীর আরেকটি পোস্টের কথা উল্লেখ করে। সেদিনই ট্রাম্প ও মোদীর মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়।

Comments :0

Login to leave a comment