Post Editorial

সরকারি বন্দেমাতরম’র নেপথ্য কাহিনি

সম্পাদকীয় বিভাগ

ভাস্কর দাস
জাতীয় গান হিসাবে বন্দেমাতরম গাওয়ার নতুন সরকারি ফরমান জারি হয়েছে। এতদিনের প্রচলিত কাঠামোয় গানটি ছ’টি স্তবকের হলেও প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হতো, তাও খুব সীমিত ক্ষেত্রে। এখন প্রতিদিন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যে কোনও সরকারি  অনুষ্ঠানে এ গান গাইতে হবে। এবং ছ’টি স্তবকই গাইতে হবে। গাইতে হবে দূরদর্শনে, রেডিওতে, যে কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের আসার আগে ও যাওয়ার পরে ইত্যাদি ইত্যাদি— তালিকাটি দীর্ঘ। এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, যেখানে জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত দুই-ই গাইতে হবে, সেখানে বন্দে মাতরম গাওয়া হবে জন গণ মন -র আগে। 
এই গানটি প্রসঙ্গে কয়েকটি তথ্য খুবই জরুরি। প্রথমত বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিক প্রকাশের জন্য দেওয়া ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিতে এই গান ছিল না। কিন্তু বঙ্গদর্শন কাগজের কার্যাধ্যক্ষশ্রী রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের লক্ষ্য ছিল পত্রিকার পৃষ্ঠা পূরণ করা। এই দাবিতেই বঙ্কিমচন্দ্র গানটি লিখে কাগজের ফাঁকা পৃষ্ঠা ভরাট করলেন। এ কথা আমরা পাচ্ছি ললিতচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের স্মৃতিকথায়। (‘বন্দে মাতরম্’, বঙ্কিম-প্রসঙ্গ, সম্পাঃ সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, ১৯২২)। তবে লেখার পর গানটির অন্তর্নিহিত বিপুল শক্তি ও সম্ভাবনা তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই লিখেছিলেন –‘এ গানের মর্ম্ম তোমরা এখন বুঝিতে পারিবে না; যদি পঁচিশ বছর বাঁচিয়া থাক, তখন দেখিবে, এই গানে বঙ্গদেশ মাতিয়া উঠিবে।’(ঐ) 
গানটির প্রথম সুরারোপ করেন যদুনাথ ভট্টাচার্য, যার উল্লেখ আমরা পাই রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’-তে। আর রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলাদেবী চৌধুরানি-র ‘জীবনের ঝরাপাতা’ বইটি থেকে জানা যায় যে সরলাদেবীও বন্দে মাতরম-এ সুরারোপ করে রবিমামাকে শুনিয়েছিলেন। তিনি গানটি পিয়ানোয় বাজিয়েছিলেন। রবিমামা খুশি হয়েছিলেন এবং গেয়েছিলেন। সম্ভবত এ সুরই অধুনা প্রচলিত বন্দে মাতরম সঙ্গীতের সুর কাঠামো। তবে আরও বিবিধ সুর করেছেন অন্যান্য সুরকারেরা। তেমনি একটি সুর আমরা পেয়েছিলাম তপন সিংহের ছবি ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’-তে। লতা মুঙ্গেশকরের বন্দেমাতরম, বা এ আর রহমানের সুর করা বন্দেমাতরম, সেসব তো সকলেরই জানা।  
গানটির প্রথম দুটি স্তবকে প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করা হচ্ছে। পরবর্তী চারটি স্তবকে নানা হিন্দু দেবদেবীর প্রসঙ্গ আসছে। গানটি প্রচুর সংস্কৃত ও তৎসম শব্দবহুল এবং গান ও উপন্যাস, দুইই মূলত হিন্দু জাগরণের কথা বলে।  
১৯৩৬-এ জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে এই গানটি গান স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তাতে প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হয়। তারপর গানটিকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস জাতীয় গান হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু তাতে কতটা অংশ গাওয়া হবে সেই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মতামত চাইলেন জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বোস এবং গান্ধীজীও। কারণ শেষ চারটি স্তবকে গানটির কথায় হিন্দু দেব-দেবী তথা হিন্দু ধর্মের ইমেজারি বেশ উচ্চস্বরেই বলা আছে। নানাভাষা নানাধর্মের দেশ ভারতে এমন গানকে আংশিকভাবে গ্রহণ করাই শ্রেয়, এটা সাধারণ বোধের কথা। ১৯৩৭ সালে নেহরুকে লেখা চিঠিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাতেই সম্মতি জানিয়ে অত্যন্ত সরাসরি তাঁর মত প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন;  ‘‘বন্দে মাতরম গানটি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের অংশ। সেখানে গানটি যে আঙ্গিকে এবং যে উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, তা হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষ দিকের সঙ্গে জড়িত। যে গানটি দেশের জাতীয় সঙ্গীত হবে, তা এমন হওয়া উচিত যা দেশের সকল ধর্মের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং কোনও দ্বিধা ছাড়াই গাইতে পারে।’’
কেন্দ্রীয় সরকার রবীন্দ্রনাথের চেয়ে কয়েক কদম এগিয়ে। তাই ছ’টা স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করে তারা শুধু রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করলেন তাই নয়, এর মধ্যে দিয়ে Hindu dominance বা আধিপত্যবাদ, (Excellence বা মাহাত্ম্য নয় কিন্তু) তার নিদান দিলেন। 
একই সঙ্গে শুধু মুসলমান নয়, ভারতে বসবাসকারী আরও ৫টি প্রধান ও ৮৩টি অপ্রধান ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংগঠনকে সরকার এই বার্তা দিলেন যে ভারতে থাকতে গেলে নিজ ধর্মাচরণের বাইরে হিন্দুত্বের অভ্যাসের মধ্যেও থাকতে হবে।
রিপাবলিক টিভির অর্ণব গোস্বামী তার চিরাচরিত অশালীন ভঙ্গিতে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, রাহুল গান্ধী ইত্যাদিদের উদ্দেশ্যে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বললেন যে "কান খুলকর শুনলো (শুন লিজিয়ে না)" - এখন থেকে যেখানেই এই গান হবে, সেখানেই তোমাদের সবটা শুনতে হবে, দাঁড়াতে হবে এবং গলা মেলাতে হবে। ।
আমাদেরও অনেকে এতে উল্লসিত হচ্ছেন, নানা সমাজমাধ্যমে তাদের মতামত সেই কথাই বলছে। কিন্তু তারা এই ফাঁকিটাকে ধরতে পারছেন না, যে— রবীন্দ্রনাথ আর তাঁর জাতীয়তাবাদের ধারণা এই সরকার, বা বস্তুত যে কোনও শাসকের পক্ষেই বিপজ্জনক, তাই তাকে ব্রাত্য করা শুরু হচ্ছে। নেশন ও ন্যাশনালিজম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত তো ছিল এই, যে পশ্চিমা "নেশন" ধারণাটি মানুষের মানবিক ও সামাজিক স্বার্থের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, উঠেছে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে। তিনি মনে করতেন নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে চিহ্নিত একটি নেশন হলো একটি সুসংগঠিত স্বার্থপরতা যা শক্তির উপর ভিত্তি করে দুর্বল জাতিসত্তার উপর সবলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বস্তুত বিশ্বযুদ্ধের চার বছরে বিভিন্ন তথাকথিত উন্নত জাতিসত্তার ব্যবহার তাঁকে এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করেছিল। তিনি লিখেছিলেন, "Nation is a cruel epidemic of evil that is sweeping over the human world of the present age, eating into its moral vitality."(Nationalism in the West, Lecture series, 1917)
আজ সারা পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নেশন যখন একে অপরকে ছাপিয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় মত্ত, রাষ্ট্রবাদিতার মোহে আন্তর্জাতিকতা একটি উপহাসের বিষয়, তখন ভারতবর্ষের রাষ্ট্রবাদী সরকারি ফরমানে রবি ঠাকুরের বসুধৈব কুটুম্বকম-এর সর্বজনীন মানবতাকে পেছনের সারিতে সরিয়ে রাখার প্রয়াস যে থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আর এক বাঙালির লেখাকে সুচতুরভাবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের শিকড়ে ধর্মের জলসিঞ্চন করা হচ্ছে। একথা সত্যি যে ধর্ম-নিয়ন্ত্রিত জাতীয়তাবাদের আদি প্রবক্তা বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর হিন্দু রিভাইভ্যালিজম স্বদেশি আন্দোলনের উন্মেষপর্বে তাকে একটা নির্ভরতার খুঁটি সরবরাহের পাশাপাশি তার গণ্ডিকে ধর্মের নিগড়ে বেঁধে দিয়েছিল। তবে এতে করে পশ্চিমের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত যে বঙ্কিমচন্দ্র ভারতের রাজনীতি, ধর্ম বা দর্শনকে ব্যাখ্যা করছেন আন্তর্জাতিক নাগরিকের দৃষ্টিতে, সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে স্থাপন করছেন ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার পটভূমিতে, মীর মোসারফ হোসেনের হাসান হুসেনের উপাখ্যান নিয়ে লেখা উপন্যাস বিষাদসিন্ধুর অকুণ্ঠ প্রশংসা করে তার ভূমিকা লিখে দিচ্ছেন, কিংবা সৃষ্টি করছেন দুর্গেশনন্দিনীর দিলের খান, চন্দ্রশেখরের মোতিবিবি বা রাজসিংহের ঔরংজেব চরিত্রদের – সেই বঙ্কিমকে সযত্নে আড়াল করে তাঁর একটি গানের দুরমুশে সবকিছুকে সমতল করে দেওয়ার ছক কষা হচ্ছে। পাশার দান সফল হলে এখনও ঘোষিতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের পক্ষে তা সুসমাচার বয়ে আনবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। 
মুসলমানদের তোষণ করা আর তাদের স্বার্থ রক্ষা করার মধ্যে একটা বড় ধূসর ক্ষেত্র পড়ে আছে। তাকে চিহ্নিত না করতে পারলে শিষ্ট মানুষের আচরণে অন্যায্য পক্ষপাতের দোষ লেগে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। একথা সত্যি যে এই গান ও বইকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের আচরণে অনেক ক্ষেত্রেই বিরুদ্ধতা প্রকট হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে ১৯০৭ থেকে ১৯২০ অবধি ঢাকা জেলায় মুসলমানেরা বিভিন্ন জায়গায় বন্দেমাতরম আওয়াজ তোলা জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবকদের বারবার আক্রমণ করেছিল। ১৯৩৫-এ বাংলায় প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পরিসরে মুসলিম লিগের সরকার প্রতিষ্ঠা হলে মুসলমানরা কলকাতার বুকে প্রকাশ্য রাজপথে শত শত কপি আনন্দমঠ পোড়ায়, যার সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৭-এর আনন্দবাজারে। আবার সেই বহ্নুৎসবকে নিন্দা করে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যিনি লিখেছিলেন ‘সেদিন বাংলার রাজধানী কলকাতার বুকে লিগপন্থী মুসলমানদের মহতী সভায় বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত অথবা ‘কুখ্যাত পুস্ত’’ আনন্দমঠের মহাসমারোহে বহ্নি উৎসব হইয়া গেল, সভ্য জগৎ স্তম্ভিত চিত্তে দেখিল…এমন একটি অনাচার হইয়া গেল, যাহা বর্বরতায় মধ্যযুগের ধর্মান্ধ জ্ঞানবৈরীদের সমস্ত অত্যাচারকে ম্লান করিয়া দিল।’’- তিনিও একজন মুসলমান, নাম রেজাউল করিম।(বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ/রেজাউল করিম, ১৯৪৪ )
এতো আমাদের দেখা যে বড়ে গোলাম আলি খাঁ হরির ভজন গাইতে পারবেন না বলে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ভারতে চলে আসেন। বিসমিল্লা খানের সানাই বারাণসীর গলির বাতাসে দুর্গামন্ত্রের আবহ তৈরি করে। এইরকম রাষ্ট্রবাদী মুসলমান যেমন বিরল নয়, তেমনি উন্নাওয়ের ধর্ষক হিন্দু বিজেপি বিধায়ক, জামিন নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট যাকে সারা জীবনের জন্যে জেলে ঢোকালেন তার মতো, বা খুব সম্প্রতি লাখো ছাত্র-ছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করা নিটের প্রশ্ন ফাঁসের কারিগর মাস্টারদের মতো রাষ্ট্রবিরোধী, সমাজবিরোধী হিন্দুও পরিমাণে প্রচুর।
তাই একটা ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে ভালো আর মন্দের বিচার করে ফেলার সহজ কাজটা সরকারের নয়, যদি না দেশের জনগণ সেই পলায়ন পথটা অনুমোদন করে।
আমাদের কাজ, ভালো হিন্দু, মন্দ হিন্দু, ভালো মুসলমান, মন্দ মুসলমান, ভালো অন্যান্য আর মন্দ অন্যান্যের মধ্যে বিভাজন করার প্রক্রিয়া চালু রাখতে সরকারকে বাধ্য করা, এবং সেই অনুসারে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন করা। না করতে চাইলে জনগণ কি করতে পারে, তা বাংলার ভোট দেখিয়ে দিয়েছে।
অতএব সতর্ক থাকুন, সামনের স্টেশন ডানদিকে না বাঁদিকে, ওপরে না নিচে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তাই দৃষ্টি সজাগ থাক, আমাদের যাপনের থিম হোক -না গিরেগা, না গিরনে দুঙ্গা। 
                                        
 

Comments :0

Login to leave a comment