IPAC ED

আইপ্যাক তল্লাশিকে ঘিরে সম্মুখ সমরে পুলিশ-ইডি

রাজ্য

আইপ্যাক তল্লাশিকাণ্ডে এবার ফের সম্মুখ সমরে কলকাতা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। 
কলকাতা পুলিশ ইডি’র আধিকারিকদের তলবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পালটা কৌশল নিচ্ছে ইডি-ও। আদালতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি কয়লা পাচারকাণ্ডে প্রতীক জৈনকে তলবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইডি’ও। যদিও এর আগে এমন একাধিক ঘটনার মতো এবারে ঘটনাপ্রবাহের ফলাফল নিয়েও যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন সামনে। তার আগে ভোট ময়দানের উত্তাপ বাড়ানোর কৌশলকেই স্রেফ সীমাবদ্ধ থাকতে চলেছে কী আইপ্যাক তল্লাশি ও তার পরবর্তী উত্তেজনা? তা নিয়েও সংশয়, প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে।  
গত বৃহস্পতিবার তল্লাশির সময় স্থানীয় থানার পুলিশকে বাধা দিয়েছিলেন ইডি’র আধিকারিকরা। তাদের না জানিয়ে আইপ্যাক’র অফিসে গিয়েছিল ইডি, এমনকি পুলিশকর্মীদের ধাক্কা মারা হয়। ভোর ৬টা ১০ মিনিটে আইপ্যাক’র কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে গেলেও সকাল ১১-২০ মিনিটে পুলিশকে তা জানানো হয়,এমন একাধিক অভিযোগে কলকাতা পুলিশ এখন ইডি’র আধিকারিকদের সমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে!
শাসক তৃণমূলের হয়ে টাকার বিনিময়ে ভাড়ায় কাজ করা একটা বেসরকারি সংস্থার অফিস এবং কর্ণধারের বাড়িতে তল্লাশির ঘটনায় লালবাজার এত সক্রিয় হয়ে উঠল কেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যদিও কোনও বিস্ময় নেই। সেদিন লাউডন স্ট্রিটে এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে গোদরেজ ওয়াটার সাইডে আইপ্যাক’র অফিসে  মুখ্যমন্ত্রীর কাণ্ডকারখানাতেই কলকাতা পুলিশের ভূমিকা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই কলকাতা পুলিশ ইতোমধ্যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইডি’র বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে। মামলা করেছেন মমতা ব্যানার্জিও। সেই মামলাগুলিকে হাতিয়ার করেই এবার ইডি’র বিরুদ্ধে তদন্তে নেমে পড়েছে গোটা লালবাজার। 
এর আগে চিট ফান্ডকাণ্ড থেকে রাজীব কুমারের বাড়িতে তল্লাশির ঘটনায় কলকাতা পুলিশ বনাম কেন্দ্রীয় এজেন্সির টানাপোড়েন সামনে এসেছিল। জল গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। এবারও ঘটনা সেই দিকেই গড়াচ্ছে।
ইতিমধ্যেই কলকাতা পুলিশের তরফে ৭ নম্বর লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সল্টলেকে আইপ্যাক’র অফিস চত্বরে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কখন ঢুকেছিলেন ইডি’র আধিকারিকরা, কখন বেরিয়েছেন, কতজন ছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনী কোথায় মোতায়েন করা হয়েছিল, পুলিশ কর্মীদের ঢুকতে কীভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল ইত্যাদি বিষয় খতিয়ে দেখতে চাইছে পুলিশ। লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি’র অফিসে এবং সিআইএসএফ’র কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে সেদিন কারা কারা ছিল এই অভিযানে। ইডি’র কোন কোন আধিকারিক ছিলেন, সিআইএসফ’র কতজন ছিল, তাঁদের নাম, তাঁদের পদমর্যাদা এবং বাড়ির ঠিকানা পর্যন্ত জানতে চাওয়া হয়েছে। উত্তর মেলার পরে তাঁদের সমন করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে।
এদিকে, দিল্লিতে ইডি’র সদর দপ্তর থেকে গোটা ঘটনাপ্রবাহের ওপরে নজর রাখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ইডি’র কাছ থেকে রিপোর্ট চেয়েছে। আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, তদন্ত এবং তল্লাশি চলাকালীন কীভাবে তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নন এমন ব্যক্তিরা সেখানে প্রবেশ করলো, কীভাবে নথি নিয়ে গেল তাও জানতে চেয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে। তদন্তকারী সংস্থার একটি সূত্রের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর দাবি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। আমরা কোনও পার্টি অফিসে তল্লাশি চালায়নি। কয়লা পাচারে মানি লন্ডারিংয়ের তদন্তে হাওয়ালা কারবারের ছবি সামনে এসেছে। যে সংস্থার বিরুদ্ধে হাওয়ালার মাধ্যমে কয়লার বেআইনি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে সেই আইপ্যাক’র অফিসে আমরা তল্লাশি চালিয়েছি।
কলকাতার পুলিশের অতি তৎপরতা নিয়ে প্রশ তুলে ইডি’র একটি সূত্রের পালটা দাবি, পিএমএল অ্যাক্টর ১৭ ধারায় তল্লাশির ক্ষেত্রে কোর্টের অনুমতি লাগে না। ডেপুটি ডিরক্টর পদমর্যাদার আধিকারিকের নির্দেশে সার্চ ওয়ারেন্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে তল্লাশি করাই যেতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশকে বা স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করে বা তল্লাশির আগাম খবর জানিয়েই অভিযান করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে প্রশ্ন থাকলে তখন জানানো যেতে পারে, সেই মোতাবেকই আমরা বেলার দিকে জানিয়েছিলাম। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সেদিন পুলিশ তল্লাশি চলাকালীন ঢুকতে চেয়েছিল যার অনুমতি দেওয়া হয়নি প্রথমে। পুলিশ পালটা ইডি’র আধিকারিকদের পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিল, তা দেখানও হয়েছিল। চিফ মিনিস্টার ঢোকার সময় কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। তিনি যেভাবে সিজার লিস্টে থাকতে পারে এমন সব নথি, হার্ড ডিস্ক নিয়ে গেছেন সেটা সম্পূর্ণ ভাবে তদন্তে বাধা দেওয়ারই শামিল’।
সেদিন তল্লাশি পর্বের প্রথম থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপোর ঘনিষ্ঠ প্রতীক জৈন অসহযোগীতা শুরু করেন বলে জানা যায়। তল্লাশির প্রথম পর্বের মুখ্যমন্ত্রী ও অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগও করেন প্রতীক জৈন। কিছুক্ষণের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী খবর পাওয়ার পরেই কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছুটে আসেন প্রতীক জৈনের বাড়িতে। দফায় দফায় এরপর কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কলকাতা পুলিশের বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হয়। সাড়ে এগারোটা নাগাদ ছুটে আসেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনার নাটকীয় মোড় নেয় এরপর থেকেই। কয়লা তদন্তের পাশাপাশি আইপ্যাক’র অফিস থেকে কার্যত লুট করে নিয়ে যাওয়া নথিপত্রের মধ্যেই সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে সরকারি লোগো সম্বলিত ফাইল। ইডি’র দাবি একাধিক সরকারি প্রকল্প, ক্যাবিনেট মিটিংয়ের বিস্তারিত নোটও মিলেছে আইপ্যাক’র অফিসে, প্রতীক জৈনের বাড়িতে।
আইপ্যাক’র অফিসে তল্লাশির ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর আচরণ এবং গোটা শাসক দলের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, এই বাংলায় ভোট এখন কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে। বেসরকারি সংস্থা চালাচ্ছে আস্ত সরকার! তাই কী খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে হয়, ‘যা করেছি, বেশ করেছি। দলই যদি না থাকে তবে দল করব কী করে?’

Comments :0

Login to leave a comment