Gig Workers

গিগকর্মীদের ইউনিয়নে সংগঠিত হওয়া জরুরি

সম্পাদকীয় বিভাগ

সদ্য সমাপ্ত বছরের (২০২৫) শেষ লগ্নে অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ও জরুরি কিছু দাবিকে সামনে রেখে গিগ শ্রমিকদের সর্বভারতীয় ধর্মঘট আধুনিক অর্থনীতির আধুনিকতম ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী সতর্ক বার্তা হাজির করে দিয়েছে। আজকের অসংগঠিত বা অসঙ্ঘবদ্ধ গিগ শ্রমিকরা আগামী দিনে যদি ধাপে ধাপে জোটবদ্ধ ও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ইউনিয়নের বিধিবদ্ধ কাঠামোয় যুক্ত হতে পারে তাহলে শ্রমিক আন্দোলনে এক অপ্রতিরোদ্ধ শক্তির আবির্ভার ঘটতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতির যে ক্ষেত্রটিতে সবচেয়ে দ্রুত হারে, এবং ঝড়ের গতিতে কর্মী সংখ্যা বাড়ছে সেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক ঘরে ঘরে পণ্যসামগ্রী খাদ্য সরবরাহ, যাত্রীপরিবহণ ক্ষেত্র। বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাম নথিভুক্ত করে গিগ শ্রমিকরা অন লাইনে অর্ডার দেওয়া পণ্য, ওষুধ, খাবার, মুদি পণ্য, শাকসবজি, মাছ-মাংস ইত্যাদি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয় গিগকর্মীরা। যে প্ল্যাটফর্ম যত কম সময়ে পণ্য পৌঁছে দেবে প্রতিযোগিতার বাজারে তারা এগিয়ে থাকবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে সংস্থাগুলি গিগকর্মীদের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। সম্প্রতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছে কুইক কমার্স সংস্থা। এরা ১০ মিনিটের মধ্যে পণ্য ঘরে পৌঁছে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে গিগ কর্মীদের। এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক সংস্থাগুলির মধ্যে সুইগি, জোমাটো, জিও মার্ট, ব্লিঙ্কিট, আমাজন, ফ্লিপকার্ট ইত্যাদি। বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়ছে কুইক কমার্সের দশ মিনিটে ডেলিভারি ব্যবসা। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গিগকর্মী। এই সংস্থাগুলি এতকাল দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, কলকাতার মতো মহানগরগুলোতে ব্যবসা করত। এখন তারা প্রসারিত হচ্ছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরগুলিতেও। ফলে দ্রুতগতিতে বাড়ছে গিগকর্মীর সংখ্যা।
নীতি আয়োগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২০-২১ সালে গিগকর্মীর সংখ্যা ছিল ৭৭ লক্ষ। ২০২৯-৩০ সালে সেটা বেড়ে ২ কোটি ২৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। কর্মসংস্থানে খরার এই পরিমণ্ডলে কর্মহীন বেকাররা গিগকর্মী হিসেবেই রোজগারের বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রটির চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হবার ফলে শ্রমিক-মালিকের সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। কেউ স্থায়ী কর্মী নয়। পণ্য ডেলিভারি করে কমিশনের মতো কিছু অর্থ পায়। এদের নির্দিষ্ট বা স্থায়ী কাজ থাকে না। নিয়োগপত্র থাকে না। কাজের সময় নির্দিষ্ট থাকে না। নির্দিষ্ট মজুরি, ভাতা, সুবিধাও থাকে না। নেই কোনও সামাজিক সুরক্ষা। দুর্ঘটনার দায় নিজেদের। অথচ দশ মিনিটে পৌঁছাতে তারা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে বিপজ্জনকভাবে বাইক চালাতে বাধ্য হয়। তাদের আয়, সুযোগ-সুবিধা সবটাই প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষের মরজির উপর নির্ভরশীল। কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম বা বিধি মেনে হয় না। এর বিরুদ্ধেই দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ সাম্প্রতিক ধর্মঘট। এটা ঠিক বে‍‌শিরভাগ গিগকর্মীরা ধর্মঘট করেনি। তবে একটা বড় অংশ করেছে। তাতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে হলেও কিছু দাবি মানতে। তবে লড়াইয়ের বার্তা পৌঁছেছে সব কর্মীদের কাছে এবং দাবি পূরণের স্বপ্নও উজ্জ্বল হয়েছে। এখন জরুরি গিগকর্মীদের ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত হওয়া। যত সংগঠিত হবে ততই তাদের শক্তি বাড়বে এবং দাবি আদায়ের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হবে।

Comments :0

Login to leave a comment