ভ্রমণ
মুক্তধারা
খেরোর খাতায় ঔরঙ্গাবাদ
অভীক চ্যাটার্জী
৩ জানুয়ারি ২০২৬, বর্ষ ৩
এবার বৃষ্টি বেশ খানিকটা ধরে এসেছে। বিবি কা মকবরা আওরঙ্গবাদ শহরের মধ্যেই অবস্থিত। আমরা তাই এবার ফিরতি পথ ধরেছি। বৃষ্টি সারাদিন ধরে চারিদিককে আরও সতেজ আর সবুজ করে দিয়েছে। আমরা প্রায় ১ ঘণ্টা পর এসে পৌঁছলাম বিবি কা মকবরাতে।
বিবি কা মকবরা, যাকে অনেকে বলে, দাক্ষিণাত্যের তাজমহল হলো মোঘল স্থাপত্যের শেষ বড় নিদর্শন।
বিবি কা মকবরা নির্মিত হয় ১৬৬০–১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে। এটি নির্মাণ করেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র আজম শাহ, তাঁর প্রিয় মাতা দিলরাস বানু বেগম-এর স্মৃতিতে। দিলরাস বানু বেগম ছিলেন আওরঙ্গজেবের প্রধান পত্নী এবং পারস্যের সাফাভিদ বংশোদ্ভূত রাজকুমারী। তাঁর মৃত্যু হয় প্রসবজনিত জটিলতায়, এবং সেই শোক থেকেই এই সমাধিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমরা অনেকেই এই স্থাপত্যটিকে অবহেলা করে যায় নকল তাজমহল বলে, কিন্তু এখানে না এলে বোঝাই যায় না, এই সৌধ নির্মাণও শিল্পের কম বড় নিদর্শন নয়। যদিও এটি নির্মাণে তাজমহলের জাঁকজমক নেই,তবু এর সে সৌন্দর্য কোনো অংশেই কম হয়ে যায়নি। এই সৌধ তাজমহলের চেয়ে আকারে যদিও একটু ছোট, তবে এর পেছনে ব্যয়কৃত অর্থের পরিমাণ তার তুলনায় অনেকটাই কম। আওরঙ্গজেব এর সংযমী শাসননীতি এর পেছনে অনেকটাই দায়ী। তবে তাতে এর সৌন্দর্য কিম্বা রুচিশীলতা কোনো অংশে একচুলও কমে যায়নি। প্রধান গম্বুজটি তৈরি মার্বেল পাথরে, বাকি কাঠামো তৈরি বাসাল্ট পাথরের উপর চুনা পাথরের প্রলেপ চড়িয়ে। চারপাশে চার মিনার এবং সৌধ বেষ্টন করে আছে চার বাগ।
ঠিক তাজমহলের মতোই, এর একটি সুন্দর মূল ফাটক আছে, সেটাও ব্যাসল্ট এর উপর চুনাপাথরের প্রলেপ লাগিয়ে তৈরি। তার ভেতরে ঠিক তাজমহলের মতোই সারিবদ্ধ ফোয়ারা চলে গেছে মূল সৌধ পর্যন্ত চলে গেছে। সেটাকে অতিক্রম করলেই শুরু হয়ে যায় মূল সৌধ সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে হয় সৌধের বাহির দালানে। সেটাও মার্বেলেই তৈরি। তারপর বিরাট দরোজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে পাওয়া যায় সমাধি, যাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন এক মা, এক স্ত্রী, ভারতবর্ষের শেষ সম্রাজ্ঞী, দিলরাস বেগম।
এবার আসি আমাদের উপরি পাওনার কথায়। যেদিন আমরা বিবি কা মকবরা তে গেছিলাম, সেটা ছিল ১৫ই আগষ্ট। আর পুরো সৌধটাকেই সাজানো হয়েছিল তিরাঙ্গাতে । না, পতাকা নয়। আলোর বন্যা বয়ে গেছে সেখানে। গেরুয়া সাদা সবুজ, তিন রং যেনো মিলে মিশে একাকার। অদ্ভুত এক উপলব্ধি গ্রাস করলো যেন আমায়। এই আওরঙ্গজেব কিম্বা তাঁর স্ত্রী, কেউই ভারতীয় নন, যদিও ভারতের জলহাওয়ায় তারা জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন, আর একদিন সেই জলহাওয়াতেই বিলীন হয়েছেন। কিন্তু তারা কেউই ভারতীয় বংশোদ্ভুত নন। কিন্তু সেই মানুষটির সমাধি আজ উদ্ভাসিত স্বাধীনতার রঙে, ত্রিবর্ণরঞ্জিত তাঁর শেষ ঠিকানা। সত্যি! কবি ঠিকই বলেছেন,
হেথায় সবারে হবে মিলিবারে আনতশিরে -
এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।।
Comments :0