জাতীয় শিক্ষানীতির (NEP) অধীনে প্রকাশিত অষ্টম শ্রেণির একটি পাঠ্যবইকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সংঘাত তৈরি হলো দেশের শীর্ষ আদালত এবং এনসিইআরটি’র মধ্যে। বিচারব্যবস্থায় "দুর্নীতি" এবং "মামলার পাহাড়" সংক্রান্ত একটি অধ্যায়কে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট বইটির প্রকাশনা ও বিতরণের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এনসিইআরটি’র অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ের 'সমাজে বিচারবিভাগের ভূমিকা' (The Role of the Judiciary in Our Society) নামক অধ্যায়টিই এই বিতর্কের মূলে। সেখানে বিচারব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, মামলার বিশাল বোঝা এবং বিচারকের অভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি একে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা বলে চিহ্নিত করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে একটি সুয়ো মোটো মামলা দায়ের নির্দেশ দেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার জানিয়েছিল যে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারকদের বিরুদ্ধে প্রায় ৭,৫০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে প্রধান বিচারপতির দপ্তরে।
আদালতের কড়া অবস্থানের পর এনসিইআরটি দ্রুত বইটির সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তারা জানায়, মুদ্রিত ২.২৫ লক্ষ কপির মধ্যে মাত্র ৩৮টি বিক্রি হয়েছে, যা তারা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। সংস্থাটি বিষয়টিকে "অনিচ্ছাকৃত ভুল" বলে ভুল স্বীকার করে অধ্যায়টি নতুন করে লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার আদালত কেন্দ্র ও এনসিইআরটি’র সমালোচনা করে। ডিজিটাল বা হার্ড কপি যেখানেই এই বই রয়েছে, তা জনসমক্ষ থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই বিষয়ে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
আদালত কেবল নিষেধাজ্ঞা জারি করেই থামেনি। ন্যাশনাল সিলেবাস বোর্ডের কোন সদস্যরা এই বিতর্কিত অধ্যায়টি লিখেছেন, তাদের নামের তালিকা চাওয়া হয়েছে।
শিক্ষা দপ্তর এবং এনসিইআরটি’র ডিরেক্টর ড. দিনেশ প্রসাদ সাকলানিকে আদালত অবমাননার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে যে, তারা গঠনমূলক সমালোচনার বিরোধী নয়, কিন্তু এটি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাহানির চেষ্টা।
এনসিইআরটি’র সাফাই মানতে নারাজ শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি কোনও সাধারণ ভুল নয়, বরং বিচারবিভাগের কর্তৃত্ব খর্ব করার জন্য একটি "পরিকল্পিত পদক্ষেপ"।
কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই অধ্যায় তৈরির নেপথ্যে থাকা দুই আধিকারিককে ভবিষ্যতে ইউজিসি (UGC) বা কোন মন্ত্রকের কাজে রাখা হবে না।
আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি ও কপিল সিব্বল এই ঘটনাকে "নির্বাচনী টার্গেট" বলে ইঙ্গিত করেছেন। সিংভি প্রশ্ন তোলেন, দুর্নীতি তো অন্য ক্ষেত্রেও আছে, তবে কেন শুধু বিচারবিভাগকে বেছে নেওয়া হলো?
সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে চার সপ্তাহ পর। আপাতত অষ্টম শ্রেণির ওই নতুন পাঠ্যপুস্তকটির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকছে।
Supreme court NCERT
এনসিইআরটি’র পাঠ্যবই নিষিদ্ধ করল সুপ্রিম কোর্ট
×
Comments :0