নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ অমর্ত্য সেন মনে করেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কেরালার বিস্ময়কর সাফল্যে তাদের সুদূরপ্রসারী উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির সুফল। বিশ্ব বরেণ্য ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের বিশ্বাস শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতির পথপ্রদর্শক হিসাবে দেশে এগিয়ে থাকবে কেরালা। আর প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মণিশঙ্কর আয়ারের মতে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন সুশাসনের ক্ষেত্রে কেরালা আজ জাতীয় মডেল।
কেরালা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মেরু থেকে আসা এই মূল্যায়নগুলি সন্দেহাতীতভাবে আরএসএস-বিজেপি’র গাত্রদাহ বাড়াবে এবং নিশ্চিতভাবে বাড়বে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেরালার ইউডিএফ জোটের অস্বস্তি। কিন্তু কিছু করার বা বলার নেই। বাস্তব যা সেটাই উঠে এসেছে বিশিষ্টদের মূল্যায়নে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেরালার মানুষ এই মূল্যায়নগুলি বিচার বিবেচনা করবেন এবং তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে যাচাই করবেন। তারপর ভোটে যে রায় দেবেন সেটা মণিশঙ্কর আয়ারের বিশ্বাস রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পিনারাই বিজয়নই বহাল থাকবেন। সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবীও এই প্রশ্নে দ্বিধাহীনভাবে প্রত্যয়ী যে কেরালায় টানা তৃতীয়বার এলডিএফ সরকার তৈরি হবে।
আসলে সম্প্রতি কেরালায় স্থানীয় নির্বাচনে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন এলডিএফ কিছুটা খারাপ ফল করায় এবং জেতা আসন সংখ্যা কমে যাওয়ায় সংবাদমাধ্যমে একটা জিগির তোলার চেষ্টা হচ্ছে যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আরএফডিএফ ফিরবে না। ইউডিএফ ভাবছে এবার বুঝি তাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে। বিজেপি-ও আদা জল খেয়ে মাঠে নেমেছে জয়ের আশায়। কিন্তু বাস্তব যে ভিন্ন সেটা বলাই বাহুল্য।
কেরালায় দীর্ঘকাল ধরে দেখা যাচ্ছে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর রাজ্যে সরকার বদল হয়ে যায়। একবার এলডিএফ সরকার হয় তো পরের ভোটে মানুষ সরকার বদলে দিয়ে ইউডিএফ-কে ক্ষমতায় আনে। ২০১৬ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক ধারা বদলে গেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ-কে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার। ২০২১ সালে পুরানো ট্র্যাডিশন ভেঙে মানুষ পুনর্নির্বাচিত করেন এলডিএফ-কেই। নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন ঘটনা। এবার ২০২৬ সালে ফের ক্ষমতায় ফিরতে চলেছে এলডিএফ-ই।
১৯৫৭ সালের প্রথম নির্বাচনে জয়ী হয় বামপন্থীরা। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ প্রথম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন। সেই সময়কার অত্যন্ত দরিদ্র রাজ্য মার্কসবাদী আদর্শে উন্নয়নের বিকল্প দিশা দেখিয়েছিল সেই দিশাই আজ কেরালাকে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও দেশের এক নম্বরে। কেরালাই দেশে একমাত্র রাজ্য যেখানে চরম দারিদ্র নির্মূল হয়ে গেছে। নারীর স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রশ্নে কেরালার স্বীকৃতি অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত। অমর্ত্য সেন যথার্থই বলেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে স্বাগত জানিয়ে কেরালা ভারতের প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ কেরালার নিজস্ব পরিচয়ের অঙ্গ। বামপন্থার জয় এই জায়গাতেই।
Editorial
বাম ছায়ায় সেরার সেরা
×
Comments :0