জিয়াউল আলম
গতিময় জীবনধারায় সময়ের সাথে সব কিছুই তো পালটায়। মানুষের জীবন-জীবিকায় চাহিদার পরিবর্তনের পথে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কাঠামোরও বিবর্তন বা পরিবর্তন ঘটে। এগিয়ে চলার পথে সমাজের চাহিদায় তৈরি করা আইন-কানুন, বিধি-নিয়মেরও সংশোধন, সংযোজন বা পরিবর্তন হয়। স্বাধীন দেশের সরকার ও প্রতিটি নাগরিকের যেমন সংবিধানিক দায়, কর্তব্য এবং অধিকারের সুনির্দিষ্ট ধাঁচা আছে, তেমনই সবখানেই না সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্ব ও অধিকার থাকে। এতো সবের দেখাশোনা করার জন্যই তো যুক্তরাষ্ট্রীয় আইনসভা মন্ত্রীসভা থেকে শুরু করে কত না দপ্তর বিভাগ, প্রশাসন পুলিশ, বিচারালয়, জেল জরিমানা, অন্যায়, অবিচার, অত্যাচারের দমন ও সবার জন্য সম অধিকার, সামাজিক ন্যায় বিচার, ভালো খারাপের বিচারে পুরস্কার বা তিরস্কার।
বিদ্যাবুদ্ধি, দর্শন, জ্ঞান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি প্রকৌশলের অগ্রগতি ও মানব সভ্যতার চলতি পথে নীতি নৈতিকতার মাপকাঠি , পারস্পরিক দায়িত্ব এবং প্রাপ্যের সংজ্ঞা ও নিয়ম কানুনেরও জগৎ জুড়ে পরিবর্তনের পথে সর্বত্র আইনের সংশোধন সংযোজন জরুরি হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সাপেক্ষে পালটে ফেলতেও হয়।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো সমাজের মূল চালিকাশক্তি যে উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা তার নিত্যনৈমিত্তিক পরিবর্তনের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের পারস্পরিক সম্পর্ক, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিধি নিয়মের পরিবর্তন পরিবর্ধন হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তা বলে উৎপাদনী ব্যবস্থার প্রাণভোমরা পুঁজি ও শ্রমের যে গতিময় জুটি সেখানে পুঁজি ও মুনাফার জয়ডঙ্কা বাজিয়ে শ্রমের সামাজিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং তার স্বীকৃতি, মর্যাদা ও অধিকার প্রাপ্তির চলতি নিয়মকানুন, বিধি ব্যবস্থাকে সপাটে উপড়ে নির্মূল করে দেওয়া যায় কি!! আর সেটা যখন শ্রমসম্পদের ব্যবহারের উপর পুঁজিপতি বা কর্পোরেটদের মরজি মাফিক একছত্র আধিপত্য কায়েমের লক্ষ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়। শ্রমকোড বলবৎ করে কেন্দ্রের বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর সেবায় যারপরনাই নিবেদিত প্রাণ সরকার কার্যত এটা করতেই তেড়েফুঁড়ে লেগেছে। দেশের আপামর প্রকৃত উৎপাদককুল যে বিপুল শ্রমজীবী বাহিনী, বিনা প্রতিবাদ প্রতিরোধ ও যুদ্ধে সে কেন ছেড়ে দেবে জীবিকার নিশ্চয়তায় তার অর্জিত আইনি ও ন্যায়সম্মত অধিকার ও মর্যাদা এবং সামাজিক স্বীকৃতি। তাই রাত পোয়ালে দেশব্যাপী প্রতিরোধের ধর্মঘট।
আরও আরও অধিক হারে মুনাফার তাগিদে হন্যে হয়ে ফেরা দিশাহীন মুনাফাবাজের দল পুঁজিপতি শ্রেণির হয়ে উলঙ্গ দালালিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক পরিচালিত মোদী-শাহর সরকার শেষমেশ বেছে নিল মুনাফার স্রষ্টা শ্রমিক শ্রেণির স্বীকৃতি, অধিকার, মর্যাদাকে পদদলিত করতে। বাহ্, সাহস বলিহারি। সরকারি কি বেসরকারি সবেতে কাজ নেবে শ্রমিকের স্বীকৃতির কাগজ দেবে না, শ্রমিকের মেহনত দক্ষতা নেবে দাম দেবে না, আকর্ষণীয় পণ্য ও পরিষেবা তৈরি করিয়ে মুনাফা কামাবে লাভের ভাগ দেবে না, অস্থায়ী ক্যাজুয়াল কন্ট্রাকচুয়াল গিগ কেয়ার গিভার কত না রঙবাহারি নাম দেবে জীবিকার নিশ্চয়তা দেবে না। মালিকরা দল বাঁধবে গোষ্টী পাকাবে আর শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হতে পারবে না। কাজের জায়গায় যথেচ্ছ বোঝা চাপাবে, জুলুম অত্যাচার করবে, বিনা বিচারে ছাঁটাই করবে, যখন খুশি লক আউট লে-অফ করবে, মরজিমাফিক কারখানা সংস্থা খুলবে বন্ধ করবে, কর্মস্থলে শ্রমিকের নিরাপত্তা জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, তাও আবার আজকের যুগে, একবিংশ শতাব্দীতে। বিরোধীদের সংসদের বাইরে বের করে দিয়ে যা খুশি আইন বানাবে! তাই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ১২ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘট।
খেত খামারে, কল-কারখানায়, অফিস আদালতে, বন্দর বাজারে, পথে ঘাটে সর্বব্যাপী দেশভর সাধারণ ধর্মঘট। বোর্ড পরীক্ষার্থীদের স্বার্থে গনপরিবহণের সকল অংশকে সযত্নে ধর্মঘটের আওতার বাইরে রেখে, আমাদের রাজ্যে জোরদার শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের ধর্মঘট।
শ্রমিক ছাড়া যে পুঁজি মূল্যহীন, শ্রমিক খাটিয়ে যার দিনগুজরান, যাকে শোষণ নিষ্পেশন করে তার এই মুনাফা ও ঢাউস সম্পদের পাহাড় তাকে অস্বীকার, তার অস্তিত্বের স্বীকৃতি ছিনিয়ে নেওয়া, অধিকার ও মর্যাদা প্রাপ্তি এবং সংঘবদ্ধ হওয়ার আইনি কাঠামোকে ধ্বংস করে দেওয়া, অন্যায় জুলুমের শিকার হয়েও প্রতিবাদ প্রতিরোধে নিষেধাজ্ঞা, জেল জরিমানা, যখন খুশি ঘাড় ধাক্কা। এতো শত বিধি নিষেধের বেড়া জালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে আজকের শাসককূলের বড়সড় সব কর্পোরেট শাহী গোষ্ঠী চায় সব অংশের খেটে-খাওয়া মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে। অতই সহজ বুঝি! মালিক সংস্থা ও কর্তৃপক্ষের হাতে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ সংখ্যক স্ট্রাইক নোটিস জমা হতেই না এখানে ওখানে ডাক পড়ছে সংস্থার শ্রমিক কর্মচারীদের। বলছে এসব লড়াই ঝগড়া ধর্মঘটে জড়াবো আমাদের কিসের স্বার্থে, আমরা তো আর শ্রমকোড লাগু করবো না। আমরা যেভাবে শ্রমিক মালিক পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থে আলাপ আলোচনা করে এতবড় হয়েছি, সেভাবেই না চলবো। এটাই তো মোদ্দা কথা।
প্রচলিত শ্রমসম্পর্ক আইনের মোদ্দা কথাও তাই। পুঁজি ও শ্রমের টানাপোড়েন এবং দ্বন্দ্বের ঘুরপাকে আমাদের দেশের চাষ আবাদ, শিল্প উৎপাদন, পরিষেবা ক্ষেত্র কি ধ্বংসের পথে জাহান্নামে চলে গেছে নাকি! অনেক চড়াই উতরাই পার করে স্বাধীনতা পরবর্তী পর্বে তো খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য পরিষেবার উৎপাদনের পরিকাঠামো বেশ পোক্ত হয়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী হয়েছে। হালে কি সরকার ও খেটে-খাওয়া মানুষ দৈনন্দিন চলার পথে বেশ ঘাটতি ও দেনাগ্রস্ত। তা বলে বেসরকারি মালিক বিশেষত বড় বড় সব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মালিকানাধীন কর্পোরেটদের সম্পদের ঢাউস পাহাড় তো আর জনচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে থাকছে না। বাজারে কোম্পানির দর বাড়ানোর তালে আর্থিক বছর ঘুরলেই ঢক্কানিনাদে প্রচার হচ্ছে, সমুচ্চ পরিমাণ টার্নওভার ও মুনাফা। আবার এযাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণের তীব্র যন্ত্রণাদায়ক বেকারি ও তীক্ষ্ণ সামাজিক বৈষম্যে আধুনিক ভারতের জনজীবন দীর্ণবিদীর্ণ হচ্ছে। পদে পদে। শতচেষ্টা সত্ত্বেও সেটাকে আর লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। দাপটে এগিয়ে চলেছে বৃহৎ সব কর্পোরেট পুঁজিগোষ্ঠী।
দেশের মান সম্মান, সার্বভৌমত্ব, স্বনির্ভরতা, ভারতবর্ষের গরিমাময় অতীত জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি কোনও কিছুর মর্যাদাহানিতে তাদের কি কিছু যায় আসে! দেশ বিদেশ ব্যাপী আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির কাঁধে ভর করে তার দাপাদাপি। ভারতের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শত অপমানজনক ঘোষণা ও শাস্তিমূলক শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণার পরেও তারা দলবেঁধে মোদী-শাহকে সাথে করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পায়ে মাথা ঠুকে সবশর্ত মেনে মার্কিন ভারত বাণিজ্য চুক্তিতে দস্তখত করল। ভারতের কৃষি পণ্য ও বাজারের সকল জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে জাতীয় সম্মানহানিতে দেশের শাসক-শোষক শ্রেণির কিছু এসে না গেলেও জাতীয়স্বার্থ ও সম্মান রক্ষায় আপামর কৃষক সমাজ ও শ্রমিক শ্রেণীর চোখের সামনে এটা চরম অপমানকর ও প্রতিবাদ প্রতিরোধের বিষয়। তাই শ্রমিক কৃষকের যূথবদ্ধ জোটের সাথে আপামর জনগণের এই ধর্মঘট।
Comments :0