নামজাদা সরকারি হাসপাতালের ভিতরে দুর্নীতি এবং ঠিকাদার চক্র কতটা গভীরে শিকড় গেঁড়েছে তার প্রমাণ আর জি কর।
পড়ুয়া চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে সামনে আসা আর জি করের আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়েছিল। এবার ইডি’র চার্জশিটে অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ বেআইনিভাবে হাসপাতালের ভিতর বিভিন্ন কাজের বরাত পছন্দের ঠিকাদারদের পাইয়ে দিয়ে পরে সেই টাকা ঘুরপথে তার কাছে চলে আসতো। সেই টাকার পরিমাণ ৬ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকা!
শনিবার বিবৃতি দিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি জানিয়েছে, ঠিকাদারদের বরাত পাইয়ে দেওয়ার বদলে অবৈধভাবে সুবিধা নিয়েছে সন্দীপ। এইভাবে আর জি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ ঠিকাদারদের প্রায় ৬ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকার বরাত পাইয়ে দিয়েছে। যার বিরাট পরিমাণ ঘুরপথে গিয়েছে সন্দীপ ঘোষের কাছেই। সন্দীপ ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী সেই টাকা আবার তাঁদের পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের কাছে ঘুরপথে পাঠাতো। এখনও পর্যন্ত ইডি’র তরফে সন্দীপ ঘোষের ৫২ লক্ষ ৩৮ হাজার ৬৫১ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি চিহ্নিত করে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ইডি’র তরফে দাবি করা হয়েছে, সন্দীপ ঘোষের চিকিৎসক হিসাবে আয়ের সঙ্গে তার ব্যাঙ্কের আর্থিক লেনদেনের কোনও সাযুজ্য নেই। বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে যা তাঁর আয়ের থেকে অনেক বেশি।
২০২৪’র ৮ আগস্ট আর জি করে পড়ুয়া চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তেই সামনে আসে হাসপাতালের ভিতরে দুর্নীতির ভয়াবহ ছবি। যার মূল মাথা ছিল তৎকালীন অধ্যক্ষ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ সন্দীপ ঘোষ। চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা থেকে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ, বিভিন্ন টেন্ডার ডেকে নিজের প্রভাব খাটানো, কোটি টাকার কমিশন নেওয়ার অভিযোগ বার বারে উঠেছিল। আর জি করে নৃশংশভাবে কর্মরত তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের ঘটনায় রাজ্য জুড়ে দাবানলের মতো যখন প্রতিবাদ, ক্ষোভ, আন্দোলন আছড়ে পড়া শুরু হয় সেই সময় খোদ মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার তিন দিনের মাথায় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দিয়েছিল সন্দীপ ঘোষকে। মিডিয়ার সামনে ইস্তফার নাটকে মাত্র চার ঘণ্টার ব্যবধানে ১২ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই তাকে আর জি কর থেকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ পদে বদলি করা হয়েছিল। এমনকি বদলির বিজ্ঞপ্তির মেমো নম্বরেও দেখা যায় ঘটনার দু’দিন পরেই তাঁর প্রাইজ পোস্টিংয়ের নির্দেশনামায় সই পড়ে গিয়েছিল।
সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতাও সুবিদিত। আর জি করের দুর্নীতি মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রথমে বিচার শুরু করা যাচ্ছিল না সরকার অনুমতি না দেওয়ায়। এই আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত থেকেও সন্দীপ ঘোষকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল মমতা ব্যানার্জির পুলিশ প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে আর জি কর হাসপাতলে দুর্নীতি সহ একাধিক অভিযোগ সামনে আসছিল। তা নিয়ে বারে বারে সরব হন সংশ্লিষ্ট সব মহল। অভিযোগ জমা পড়ে স্বাস্থ্য ভবনেও। কিন্তু নবান্নের শীর্ষ মহলের মাথায় হাত থাকায় প্রভাবশালী সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি, সরকারও হাত গুটিয়েই ছিল, স্বাস্থ্য দপ্তরও দর্শক সেজে ছিল। আর জি করে দুর্নীতির তালিকায় কী নেই? চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা থেকে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ, বিভিন্ন টেন্ডার ডেকে নিজের প্রভাব খাটানো, কোটি টাকার কমিশন খাওয়ার অভিযোগ বার বারে উঠেছে। কমিশনের ভিত্তিতে হাসপাতালের যাবতীয় কাজে টেন্ডার দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সরবরাহকারীদের।
শুধু তাই নয়, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গেও অধ্যক্ষের নাম জড়িয়েছে এবার। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্তত ২০ শতাংশ করে কাটমানি বা কমিশন নেওয়ার মারাত্মক অভিযোগ স্বাস্থ্য ভবনে জমা পড়েছে। বছরের পর বছর চুপ ছিল সরকার, প্রশাসন। আর জি কর হাসপাতালে আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দু’টি মামলা দায়ের হয়েছিল। একটি মামলা করেছিলেন হাসপাতালের প্রাক্তন ডেপুটি সুপার আখতার আলি এবং আরেকটি মামলা ছিল আইনজীবী সুস্মিতা সাহা দত্তের। আখতার আলির মামলাটির শুনানিতে বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন।
যদিও পরবর্তীতে সেই আখতার আলির বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলায় সিবিআই চার্জশিট দেয়। আর জি করের দু’টি মামলা, ধর্ষণ খুন ও দুর্নীতি দু’টোতেই এই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়েছে। উঠছে সেটিংয়ের অভিযোগও। সন্দীপ ঘোষের আইনজীবী আদালতে তৎকালীন ডেপুটি সুপার আখতার আলির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছিল, আশ্চর্যজনক ভাবে সিবিআই’র চার্জশিটেও সেই অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এদিন তিনি আলিপুর সিবিআই আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য যান। যদিও তা হয়নি। এদিন আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, যে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটা দাদার চিকিৎসা জন্য ধার নিয়েছিলাম। এখন চক্রান্ত করে ফাঁসানো হচ্ছে। শনিবার আদালত সাড়ে ১২টার মধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই আত্মসমর্পণ না করে ফিরে যান আর জি করের তৎকালীন ডেপুটি সুপার (নন মেডিক্যাল)। সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন তিনি।
rg kar
আর জি করে প্রায় ৭ কোটি টাকার দুর্নীতির হদিশ মিলল, মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ সন্দীপ ঘোষের ৫২ লক্ষের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
×
Comments :0