দীপক নাগ
সভ্য সমাজের সমস্ত ন্যায়নীতিকে পদদলিত করে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে গিয়ে নিউ ইয়র্কের কুখ্যাত কারাগারে বন্দি করেছেন। একাজে সিআইএ বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছে। সিআইএ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনেক কুকীর্তির হোতা। মার্কিন স্বার্থ রক্ষার নামে সারা দুনিয়ায় তার অপছন্দের সরকারের ওপর বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং বিভিন্ন দেশে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট পার্টি ও তার সদস্যদের দিকে নজর রাখার জন্য ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যানের উদ্যোগে এই কুখ্যাত প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের সন্মানার্থে বাড়িটির নাম রাখা হয় জর্জ বুশ সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্স। কারণ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ ছিলেন সিআইএ’র প্রাক্তন ডিরেকটর।
চরম গোপন সংগঠন
চরম গোপনীয়তা বজায় রেখে বিভিন্ন দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করাই সিআইএ’র প্রধান কাজ। সিআইএ’র মূল উদ্দেশ্য হলো: ক) গোপন খবর সংগ্রহ এবং সে সম্বন্ধে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে পরামর্শ দেওয়া, খ) মার্কিন প্রশাসনের অন্যান্য গুপ্তচর বিভাগের সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে সুপারিশ করা, গ) বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যসমূহ একত্রিত করে তা বিশ্লেষণ করা, ঘ) জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্দেশ মতো "অতিরিক্ত কাজ”, “অন্যান্য কর্তব্য", পালন করা। তাই সিআইএ’র কর্মী সংখ্যা কত তা কখনও প্রকাশ করা হয় না। তবে নানা সূত্র থেকে বলা হয়ে থাকে মোটামুটি ভাবে ২২ হাজার কর্মী সিআইএ’র কাজে স্থায়ীভাবে যুক্ত আছেন। সংক্ষেপে সিআইএ’র প্রধান ডাইরেক্টরেট বা বিভাগ আছে পাঁচটি অপারেশন, অ্যানালাইসিস, সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলোজি, ডিজিটাল ইনোভেশন ও ডাইরেক্টরেট অব সাপোর্ট। কর্মীরা সবাই ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। কে কী কাজ করেন তা প্রায় কেউই জানেন না। বিভিন্ন দেশের ওপর নজরদারি করার জন্য সিআইএ’র নিজস্ব গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আমেরিকার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কেও সিআইএ তার উদ্দেশ্য সাধনের কাজে লাগায়। অপছন্দের সরকারের বিরুদ্ধে মনস্তাত্বিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম গণআন্দোলন গড়ে তুলে নাগরিকদের মগজ দখল করার মাধ্যমে সেই দেশের সরকারের পতন ঘটিয়ে পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠা করাই মূল উদ্দেশ্য।
সারা পৃথিবীতেই সিআইএ মাকড়শার মতো জাল বিস্তার করে রেখেছে। সিআইএ নিজে খুন করে না-অন্যকে দিয়ে খুন করায়। বিভিন্ন দেশের গোপন খবর সংগ্রহ করার জন্য সেই দেশের মানুষদেরকেই বেছে নেওয়া হয়। তাঁদের মাধ্যমেই সেই দেশের সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সম্বন্ধে কী নীতি অনুসরণ করছে তা সংগ্রহ করে। বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীসভাতেও সিআইএ’র লোক থাকে। বিশাল তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার জন্য এই সংস্থা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এনজিও বা নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে টাকাপয়সা ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে। সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, ইত্যাদি নানা ছদ্মবেশে এই সংস্থাটি কাজ করে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, উগ্র হিন্দুত্ববাদ, মুসলিম ও খ্রিস্টান মৌলবাদকেও সিআইএ লালন-পালন করে। সিআইএ বিভিন্ন দেশে বেনামে খবরের কাগজ, টিভি ইত্যাদি সংবাদমাধ্যম চালু করে এবং সেই দেশের সরকার বা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর পরিবেশন করে নিজের পছন্দসই জনমত তৈরি করে। অতি বাম বা অতি দক্ষিণ-দুই গোষ্ঠীকেই প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে নকল সংগঠনের মাধ্যমে বিক্ষোভ তৈরি করে সরকারের পতন ঘটায়। বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস এবং তথ্যকেন্দ্রগুলো সিআইএ’র ঘাঁটি। গবেষণার নামে শিক্ষাবিদদের ফুলব্রাইট, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, এশিয়া ফাউন্ডেশন ইত্যাদি বৃত্তি দিয়ে পরোক্ষভাবে তাঁদের ব্যবহার করে। ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক রবার্ট ম্যাকনামারা 'তৃণমূল' ('গ্রাসরুট') স্তরে গণতন্ত্র পৌঁছে দেবার নাম করে ১৯৭৩ সালে নাইরোবিতে বিশ্বব্যাঙ্কের পরিচালন সমিতির সভায় সাম্রাজ্যবাদের প্রয়োজনে সারা পৃথিবীতেই এনজিও-র মাধ্যমে টাকা খরচ করার প্রস্তাব দেন। এনজিওগুলো সিআইএ’র একটা প্রধান অস্ত্র। ম্যাকনামারা 'পরিবর্তন', 'জনগণের আন্দোলন', 'জনগণের চেতনা', 'জনগণের সংগঠন' এইসব শব্দ ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন। গত শতকের আশির দশকে সিআইএ এইসব শব্দ ব্যবহার করে রঙিন বিপ্লবের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশের সরকারের পতন ঘটায়। সিআইএ তার অপছন্দের সরকার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা গুজব বা মিথ্যা খবর ছড়িয়ে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে দিয়ে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প স্বীকার করেন গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক চালচিত্র প্রসারিত করার জন্য আমেরিকা ২২৯ কোটি ডলার খরচ করেছে। সে দেশের বর্তমান মূখ্য উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে আমেরিকার প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টনের সম্পর্ক ১৯৮৬ সাল থেকেই। ইউনুস তাঁর আত্মজীবনীতে (১৯৯৭) একাধিকবার আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থপ্রাপ্তির কথা স্বীকার করেছেন।
সিআইএ’র কলঙ্কিত ইতিহাস
আমেরিকার ইতিহাস যুদ্ধ ও পররাষ্ট্র আক্রমণের ইতিহাস। ১৭৭৬ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে জন্ম নেবার পর থেকে ২০২৬ পর্যন্ত আমেরিকা অন্তত ৪০০ বার অন্য দেশের ওপর প্রকাশ্যে বা গোপনে হস্তক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে শ’তিনেক ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯৪৭ সালের পর অন্য দেশের নির্বাচনে সিআইএ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শতাধিক বার হস্তক্ষেপ করেছে।
সিআইএ যে সমস্ত দেশের ওপর হস্তক্ষেপ করেছে তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পানামা (১৯৪৯,১৯৮৯), ইরান (১৯৫৩), গুয়েতেমালা (১৯৫৬), কঙ্গো (১৯৬০), লাওস (১৯৬০), কিউবা (১৯৬১), বলিভিয়া (১৯৬০-৭৩), ডোমিনিকান রিপাবলিক (১৯৬১), দক্ষিণ ভিয়েতনাম (১৯৬৩), ব্রাজিল (১৯৬৪), ঘানা (১৯৬৬), ইন্দোনেশিয়া (১৯৫৭-৫৯, ১৯৬৫-৬৬), চিলি (১৯৭৩), অস্ট্রেলিয়া (১৯৭৫), আফগানিস্তান (২০০১), ইরাক (১৯৯১-২০০৩), হাইতি (২০০৪), লিবিয়া (২০১১), সিরিয়া (২০১১-১৭) ইত্যাদি।
সিআইএ পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনেতাকেও খুন করেছে। এই সংস্থার মদতে যেসব রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শ্রীলঙ্কার (সিলোন) প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েক (১৯৫৮), কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুলুম্বা (১৯৬১), চিলির রাষ্ট্রপতি সালভাডোর আলেন্দে (১৯৭৩), কঙ্গোর রাষ্ট্রপতি ম্যারিয়েন নগুয়াবি (১৯৭৭), গ্রেনাডার প্রধানমন্ত্রী মরিস বিশপ (১৯৮২) আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ্ (১৯৯৬), ইরাকের রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হুসেইন (২০০৬), লিবিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান মুয়াম্মার গদ্দাফি (২০১১) প্রমুখ।
সংগ্রামী ভেনেজুয়েলা
ভেনেজুয়েলার ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। ৩ কোটি ১৮ লক্ষ মানুষের দেশ ভেনেজুয়েলার আয়তন ৯,১২,০৫০ বর্গ কিলোমিটার। ১৪৯৮-৯৯ সালে ইতালির খ্রিস্টোফার কলম্বাস ও আমেরিগো ভেসপুচি ভেনেজুয়েলায় আসার পর থেকে এই অঞ্চলে ইউরোপীয়দের যাতায়াত ও বসবাস শুরু হয়। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর 'ছোট্ট ভেনিস' নামে খ্যাত এই দেশটি প্রায় তিনশ বছর স্পেনের শাসনে ছিল। স্প্যানিস ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা প্রেমিক নাগরিকদের আন্দোলনের ফলে দেশটি ১৮১১ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ভেনেজুয়েলার তেলের খনি আমেরিকার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলার সরকার তেলখনির ওপর নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। ১৯৯২ সালে হুগো সাভেজের নেতৃত্বে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। কিন্তু দীর্ঘ গণআন্দোলনের পর ১৯৯৮ সালে সাভেজ নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশের স্বার্থে তিনি সংবিধান সংশোধন করে তেলখনি জাতীয়করণ করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের জাতীয়করণ নীতি গ্রহণের ফলে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর স্বার্থে আঘাত লাগে। গভীর চক্রান্তের মাধ্যমে সিআইএ অভ্যুত্থানের নামে সাভেজকে বন্দি করে রাজধানী কারাকাস থেকে অনেক দূরে লা আর্চিলা দ্বীপে নিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপক গণআন্দোলনের চাপে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। সাভেজ হয়ে ওঠেন গোটা লাতিন আমেরিকার মুক্তিআন্দোলনের প্রতীক। ২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যু হলে নিকোলাস মাদুরো রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন। সাভেজের পথ ধরেই তিনি বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে তেলখনিগুলোর ওপর দখলদারি নিতে বাধা দেন। যথারীতি সিআইএ ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে গোলমাল বাধানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তারপর সিআইএ’র পরিকল্পনায় গত ৩ জানুয়ারি মাত্র মিনিট কুড়ির অপারেশনের পর স্বাধীন সার্বভৌম ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়। দুনিয়াজুড়ে শুরু হয়েছে বিক্ষোভের ঝড়।
ভারতে সিআইএ’র কার্যকলাপ
১৮ ডিসেম্বর, ১৯৮৯ কলকাতার আমেরিকার তথ্যকেন্দ্র থেকে এক ঘোষণায় জানানো হয় যে, আতঙ্কবাদ সম্বন্ধে খবর সংগ্রহের কর্মসূচি অনুযায়ী আমেরিকার সরকার ২০ লক্ষ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের কোনও দেশে আমেরিকার নাগরিক বা এই দেশের সম্পত্তির বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কার্যকলাপ সম্বন্ধে কোনও খবর পেলে তা ওয়াশিংটন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অথবা নিকটতম তথ্যকেন্দ্রে খবর দেওয়ার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে। খবরটি ইংরেজি স্টেটসম্যান পত্রিকায় ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৮৯ প্রকাশিত হয়। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই ইত্যাদি শহরে যেসব 'ইউসিস' বা মার্কিন তথ্যকেন্দ্রগুলো রয়েছে তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকেই সিআইএ-র সঙ্গে যুক্ত। ভারতে মোট কতগুলো এনজিও আছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রীর কাছ থেকে পার্লামেন্টে তার সঠিক উত্তর পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা যায় এই সংখ্যা ৩৩ লক্ষের বেশি। 'কাশ্মীর প্রিন্সেস' দুর্ঘটনা (১৯৫৫), নন্দাদেবী পর্বতে ষড়যন্ত্র (১৯৬৭), মার্কিন রাষ্ট্রপতি রেগানের ব্যক্তিগত বন্ধু এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মিসেস কার্ক প্যাট্রিকের 'বলকানাইজেশন' বা ভারতকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র (১৯৮৩) ইত্যাদি সহ সিআইএ’র ষড়যন্ত্রের বহু ঘটনা আছে। পরিসরের স্বল্পতার জন্য ভারতের নির্বাচনে সিআইএ’র হস্তক্ষেপের মাত্র কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হচ্ছে। আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিক ময়নিহানের বই 'এ ডেঞ্জারাস প্লেস' (১৯৭৮) থেকে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের ওপর সিআইএ-র নজরদারি চলছে। তাঁর কথায়, আমরা দু’বার, মাত্র দু’বার, ভারতের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছি। এজন্য আমরা একটা রাজনৈতিক দলকে টাকা দিয়েছিলাম। দু’বারই রাজ্য (বিধানসভা) নির্বাচনের আগে কমিউনিস্টদের সম্ভাব্য বিজয় রুখতেই আমরা এটা করেছিলাম। আমরা টাকা দিয়েছিলাম একবার কেরালা আরেকবার পশ্চিমবঙ্গে যেখানে কলকাতা অবস্থিত” (পৃ:৪১)। বামপন্থীদের ঠেকাতে টাকা দেওয়া হয়েছিল ১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে যথাক্রমে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে। রুস্তেম গ্যালুইলিন-এর লেখা 'সিআইএ ইন এশিয়া' (১৯৮৮) থেকে জানা যায়, আমেরিকার কূটনীতিবিদ জর্জ শেরম্যান ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে একজন ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে কলকাতা এসে বাম ও কংগ্রেস বিরোধী একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করার জন্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারাল এস কে সিং-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব দেন (পৃ: ১০১)। ২০০৯ সালের ২০ অক্টোবর কেবল নম্বর ২৩০৩৫৩ মারফত আমেরিকার কনসাল জেনারাল বেথ এ পেইন মার্কিন প্রশাসনকে জানান - “মার্কিন সরকারের উচিত মমতা ব্যানার্জিকে পশ্চিমবঙ্গের "ভাবী মুখ্যমন্ত্রী” হিসাবে মদত দেওয়ার কাজটি চালিয়ে যাওয়া"। ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় ৭ মে ২০১২ আমেরিকার পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন রাইটার্সে এসে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করার পর। আমেরিকার পররাষ্ট্র সচিব কোনও দেশের একটা অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁরই অফিসে বসে একান্তে দীর্ঘ সময়ের সাক্ষাৎ করাটা সে দেশের ২৫০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। আন্তর্জাতিক মহলে হিলারি-মমতার বৈঠকের যে তিনটি দিক তুলে ধরা হয়েছে তা হলো: ক) বাংলাদেশ সীমান্ত, খ) নর্থ-ইস্ট করিডোর এবং গ) বঙ্গোপসাগরের প্রবেশ মুখ। সরকারি টাকায় দীঘায় মন্দির নির্মাণ করে তার দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ওপর যে সিআইএ’র প্রবল প্রভাব রয়েছে - তা সবারই জানা। দীঘার ওপারেই অ্যান্টারটিকা। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান যে, ভারতের নির্বাচনের জন্য তিনি "বন্ধু মোদীকে” ২১০ কোটি ডলার দান করেছেন। তাই কেউ যদি বলেন, ভারতের নির্বাচনে এখনও সিআইএ’র টাকা খাটছে— তাহলে সেটা কি খুব অন্যায় হবে?
CIA
সিআইএ’র কালো হাত
×
Comments :0