গার্গী চ্যাটার্জি
শ্রমঘন শিল্পের নিরিখে আজকের পশ্চিমবঙ্গে যখন একের পর এক শিল্পক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং বেকারত্ব ক্রমশ বাড়ছে, তখনও পাটশিল্প লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই শিল্প আজও বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের কাছে দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের রসদ জোগায়। অথচ এই শিল্পটাই আজ সবচেয়ে গভীর সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সঙ্কট কোনও আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল নয়, কোনও অনিবার্য অর্থনৈতিক নিয়তির ফলও নয়—এটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পিত অবহেলা এবং কর্পোরেট স্বার্থের কাছে রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণেরই পরিণতি।
পাটশিল্প বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসে শুধু একটি উৎপাদন ক্ষেত্র নয়, এটি ছিল বাংলার শিল্পায়নের মেরুদণ্ড। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলা যে কয়টি শিল্প নিয়ে গর্ব করতে পারত, তার মধ্যে চটশিল্প ছিল প্রধান। একসময় এই শিল্পে বাংলার মোট শিল্পশ্রমের প্রায় অর্ধেক নিয়োজিত ছিল এবং পাটজাত দ্রব্যের রপ্তানি বাংলার মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জোগান দিত। হুগলী নদীর অববাহিকা ঘিরে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চল শুধু শিল্প উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল না, ছিল এক বিশাল শ্রমজীবী সমাজের আবাসভূমি—যাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বাংলার আধুনিক শ্রমিক আন্দোলন।
কিন্তু দেশভাগের পর থেকে এই শিল্প কাঠামোগত সঙ্কটে পড়ে। কাঁচা পাট উৎপাদনের বৃহৎ অংশ চলে যায় পূর্ব পাকিস্তানে, আর মিলগুলি থেকে যায় পশ্চিমবঙ্গে। স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ পুঁজির জায়গায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এলেও শিল্প পরিচালনার চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বরং স্বল্পমেয়াদি মুনাফার লক্ষ্যে শ্রমিক শোষণের নতুন নতুন রূপ চালু হয়—অস্থায়ীকরণ, বিভাজন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের লড়াইয়ে কিছু শ্রমিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত হলেও গত এক দশকে সেই সমস্ত অর্জনগুলিকে ধারাবাহিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
আজ পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্পে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় তিন লক্ষ মিল শ্রমিক এবং পরোক্ষভাবে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। একের পর এক মিল বন্ধ হচ্ছে, কোথাও শিফট কমানো হচ্ছে, কোথাও দিনের পর দিন কাজ বন্ধ রেখে শ্রমিকদের কার্যত বেকার করে রাখা হচ্ছে। শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলের গেটে ঢোকেন এই আশঙ্কা নিয়ে—আজ বুঝি সাসপেনশন অব ওয়ার্ক-এর নোটিস ঝুলবে।
এই সঙ্কটের একটি বড় দিক হলো শ্রম আইন ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রকাশ্য লঙ্ঘন। ১৯৮৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী পাটশিল্পে ৯০ শতাংশ স্থায়ী শ্রমিক ও ২০ শতাংশ স্থায়ী বদলি শ্রমিক থাকার কথা ছিল। আজ বাস্তবে সেই অনুপাত উলটে গেছে। অধিকাংশ শ্রমিকই ঠিকা, এজেন্সি বা ক্যাশ ভাউচারভিত্তিক ‘ডেইলিপেইড’ কর্মী—যাদের নাম মিলের রেজিস্টারেই নেই। এটি শুধু শোষণ নয়, এটি শ্রমিকের আইনগত অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার প্রক্রিয়া।
মজুরি কাঠামোর দিকে তাকালেই শোষণের গভীরতা স্পষ্ট হয়। ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, যত নতুন শ্রমিক নিয়োগ হয়েছে, ততই দৈনিক মজুরি কমেছে—অথচ কাজের বোঝা বেড়েছে। এটি কোনও স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়া নয়, এটি পরিকল্পিতভাবে শ্রমের মূল্য কমিয়ে আনার কৌশল।
শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার অবস্থাও ভয়াবহ। বহু মিলে ইএসআই ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে না। অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা পিএফ ও পেনশন পাচ্ছেন না, গ্র্যাচুইটি তো কার্যত অলীক কল্পনা। এটি শুধু আর্থিক সঙ্কট নয়, এটি শ্রমিক জীবনের মর্যাদার উপর সরাসরি আঘাত।
২০২৪ সালে শ্রমিক–মালিক–সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি পাটশিল্পে ন্যূনতম স্থিতি ও ন্যায্যতার একটি কাঠামো তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই চুক্তির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ধারাই কার্যকর করা হয়নি। গ্রেড ও স্কেল নির্ধারণের প্রশ্নে চুক্তির সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও আজও পাটকল শ্রমিকরা তার কোনও বাস্তব সুফল পাননি। পার্মানেন্ট ও স্পেশাল বদলি সংক্রান্ত বিধান কাগজে থাকলেও মিলে মিলে তা উপেক্ষিত, ফলে হাজার হাজার শ্রমিক আইনগত স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। আরও গুরুতর বিষয় হলো—যে শ্রমিকরা চুক্তি অনুযায়ী সুযোগপ্রাপ্ত, তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির বিপুল অঙ্কের টাকা আজও বকেয়া পড়ে আছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ত্রিপক্ষীয় চুক্তির একটি শর্তও কোনও কোনও মিলে কার্যকর হয়নি, যা শুধু শ্রমিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়—চুক্তির মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
এই চুক্তি-লঙ্ঘনের পাশাপাশি ‘আধুনিকীকরণ’-এর নামে শ্রমিকদের উপর অতিরিক্ত উৎপাদনের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী ম্যান–মেশিন অনুপাত নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল স্টেট প্রোডাক্টিভিটি কাউন্সিলের (SPC) উপর, যাতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু রাজ্য সরকারের উদাসীনতার সুযোগ নিয়েমালিকপক্ষ উৎপাদনের গতি বাড়ানোর স্বার্থে SPC-এর রিপোর্টকে খণ্ডিত ও একতরফাভাবে ব্যবহার করছে— যেখানে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। এর সরাসরি ফল হিসাবে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ হারানোর ভয় তীব্র হচ্ছে, কাজের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে এবং মিলের ভেতরে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাকথিত আধুনিকীকরণ আজ শ্রমিকের জীবিকা ও নিরাপত্তার জন্য এক নতুন বিপদের নাম হয়ে উঠেছে।
এই সবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচা পাটের তীব্র সঙ্কট— যার ফলে বর্তমানে প্রায় ১৭টি মিল পুরোপুরি বন্ধ এবং আনুমানিক ৫০–৬০ হাজার শ্রমিক বেকারত্বের মুখে। কিন্তু এই সঙ্কট কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। সরকার নিজেই স্বীকার করেছে—পাটজাত পণ্যের চাহিদা রয়েছে, অর্ডার রয়েছে, কিন্তু জোগান নেই। অর্থাৎ সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। জুট কমিশনারের সাম্প্রতিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট মজুত উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে ব্যাপক কালোবাজারি ও মজুতদারিই এই সঙ্কটের মূল কারণ।
এই পরিস্থিতিতে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (JCI)-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। JCI যদি বড় পরিসরে সরাসরি কাঁচা পাট কেনে, তাহলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবে, মজুতদারির রাস্তা বন্ধ হবে এবং মিলগুলিতে কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। JCI নিষ্ক্রিয় থাকলে এই সঙ্কট কাটবে না।
সঙ্কটকে আরও গভীর করেছে কেন্দ্র সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। RMS ২০২৬–২৭-এ খাদ্যশস্য সংগ্রহে ৯.২২ লক্ষ বেল HDPE/PP প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারের অনুমোদন পাটশিল্পের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। একদিকে সরকার পরিবেশ রক্ষার কথা বলে, অন্যদিকে নবায়ন যোগ্য ও জৈব অবক্ষয়যোগ্য পাটকে সরিয়ে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক প্লাস্টিককে উৎসাহ দেয়—এটি নিছক দ্বিচারিতা নয়, এটি কর্পোরেট স্বার্থরক্ষার নীতি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্যে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। বাংলাদেশের পণ্য ভারতে ঢুকছে, কিন্তু ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে পূর্ব ভারতের বন্দর কার্যত বন্ধ রেখে কয়েকটি নির্দিষ্ট বন্দরে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে পূর্ব ভারতের মিলগুলো কাঁচা পাট ও বাজার—দু’দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি কোনও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্যনীতি নয়, এটি পরিকল্পিত ডাইভার্সন।
এই সামগ্রিক সঙ্কট একসঙ্গে আঘাত করেছে পাটচাষি ও পাটশ্রমিক—দু’জনকেই। কৃষককে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছে, এখন চাহিদাই তুলে নেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের ক্ষেত্রে—মিল বন্ধ, কাজ নেই, মজুরি অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে কৃষক–শ্রমিক বিভাজনের চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত এই শিল্পকে ধ্বংস করবে। এর বিরুদ্ধে একমাত্র পথ হলো যৌথ সংগ্রাম।
পাটশিল্পকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত ও দৃঢ় উদ্যোগ প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সক্রিয় ভূমিকায় মালিকপক্ষ ও ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের নিয়ে কেন্দ্রীয় বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রকের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করতে হবে। কাঁচা পাটের জোগান নিশ্চিত করা, কালোবাজারি ও মজুতদারি রুখে দেওয়া, ত্রিপক্ষীয় চুক্তির প্রতিটি ধারা কার্যকর করা, ক্যাটাগরাইজেশন ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা ফেরানো— এই পদক্ষেপগুলিই পারে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।
এই প্রেক্ষাপটেই ১২ জানুয়ারির চটকল ধর্মঘটের আহ্বান ছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়নি, সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে—এটি শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক সুস্পষ্ট কৌশলগত সিদ্ধান্ত। শ্রমিকরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই কোনও একদিনের ক্ষোভ প্রকাশ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংগঠিত সংগ্রামের সূচনা। নীরবে সব মেনে নেওয়ার যে সংস্কৃতি মালিকপক্ষ ও প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, শ্রমিকরা তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সাময়িক স্থগিতের অর্থ পিছু হটা নয়; বরং আন্দোলনকে আরও সংহত করা, আরও শক্তিশালী প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া মিলগুলির শ্রমিকদের জন্য ২১ দিনের মধ্যে লে-অফ ঘোষণা করার দাবি তাই অত্যন্ত যৌক্তিক ও জরুরি। একই সঙ্গে, যেসব মিল নামমাত্র চালু থেকেও শ্রমিকদের নিয়মিত কাজ দিচ্ছে না, সেখানে আইন অনুযায়ী লে-অফের বিধান কার্যকর করার দাবি উঠেছে—যাতে অন্তত শ্রমিকরা ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা পান। এই দাবিগুলি আসলে শ্রমিকদের বাঁচার অধিকার রক্ষার লড়াই। আজ পাটকল শ্রমিকরা ক্রমশ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও বড় ও সুদৃঢ় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো—চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা এবং সরকারের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হস্তক্ষেপ। অন্যথায়, এই সঙ্কট আরও গভীর হয়ে শিল্প ও শ্রমিক—উভয়ের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
পাটশিল্পের সঙ্কট কেবল একটি শিল্পের সঙ্কট নয়। এটি শ্রমের মর্যাদা, কর্মসংস্থানের অধিকার এবং বাংলার শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বৃহত্তর লড়াই। এই লড়াই দীর্ঘ, কঠিন—কিন্তু অনিবার্য। আর এই লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই সঙ্কট থেকে উত্তরণের দিশা দেখাবে।
পাটশিল্পের বর্তমান সঙ্কট মূলত একটি নীতিগত সঙ্কট—যার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত রাষ্ট্রের কর্পোরেটমুখী অর্থনৈতিক দর্শনে। কিন্তু এই সঙ্কটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে উত্তরণের বাস্তব সম্ভাবনা। যদি এই নীতিগত সঙ্কটকে শ্রমিক ও কৃষক—উভয়ের যৌথ চেতনার বিকাশের প্রশ্নে রূপান্তর করা যায়, তবে পাটশিল্পের সঙ্কট থেকে মুক্তি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। আজ পাটচাষি ও পাটশ্রমিককে আলাদা করে দেখানোর যে চেষ্টা চলছে, তা মূলত একই শোষণ ব্যবস্থার দুই ভিন্ন প্রান্ত। কৃষক যখন ন্যায্য দামে পাট বিক্রি করতে পারেন না, তখন মিল পায় না কাঁচামাল; আবার শ্রমিকের কাজ ও মজুরি অনিশ্চিত হলে শিল্প উৎপাদন ভেঙে পড়ে। এই দ্বন্দ্ব কৃত্রিম—বাস্তবে কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। এই সত্য যত বেশি স্পষ্ট হবে, ততই পাটশিল্পের সঙ্কট রাজনৈতিক চেতনায় রূপ নেবে, কেবল অর্থনৈতিক অসুবিধা হিসাবে নয়। তখন লড়াই হবে শুধু বেশি মজুরি বা ভালো দামের জন্য নয়, হবে নীতির পরিবর্তনের জন্য—কাঁচা পাটের জোগান নিশ্চিত করা, জুট প্যাকেজিং অ্যাক্ট কার্যকর করা, প্লাস্টিকের আগ্রাসন রুখে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এই যৌথ চেতনার বিকাশই পারে পাটশিল্পকে সঙ্কট থেকে মুক্ত করার শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন শ্রমিক ও কৃষক আলাদা থাকে, তখন শাসক ও কর্পোরেট স্বার্থ জয়ী হয়; আর যখন তারা একত্রিত হয়, তখনই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
Comments :0