ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর ১২ দিন অতিক্রান্ত হলেও যুদ্ধ বিরতির কোনও আশু সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। শুরুতে ট্রাম্প হেলায় ইরান জয়ের স্বপ্ন দেখালেও যত দিন যাচ্ছে ততই সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এই সময়কালে ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে ইরানের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়লেও তাঁর সেই মন্তব্যগুলি এতটাই পরস্পরবিরোধী ছিল যে অনেকেই তাতে বিভ্রান্ত। কখনও বলেছেন যুদ্ধ হবে স্বল্প মেয়াদি। দ্রুত ইরানের শাসক বদল করে তাঁর পছন্দের কারও হাতে ইরানের ভার তুলে দিয়ে পেছন থেকে চালাবেন তিনি। যেমনটা তিনি করেছেন ভেনেজুয়েলায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যেভাবে বোমারু বিমান ও মিশাইল নিয়ে ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েল ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাতে ট্রাম্প মনে করেছিলেন যেকোনও সময় ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। চোখে চোখ রেখে ইরান পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক আমেরিকা-ইজরায়েলের দুর্ধর্ষ আকাশ যুদ্ধের ক্ষমতার কাছে ইরান শিশু। কিন্তু পালটা হামলাকে তারা যে স্তরে নিয়ে গেছে তাতে ট্রাম্পের মাথাব্যথা যথেষ্ট বেড়ে গেছে।
এই যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েল আক্রমণকারী। ইরান আক্রান্ত ও আত্মরক্ষাকারী। তাই ইরান মনে করছে এই অনৈতিক যুদ্ধে তারা নৈতিক অবস্থানে আছে। আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা চলতে চলতেই আচমকা যুদ্ধে নেমে পড়ে আমেরিকা। পরবর্তীকালে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় ট্রাম্প আলোচনায় কোনও সমাধান চাননি। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের জমানা বদল। আমেরিকার শত্রু থেকে ইরানকে অনুগত দেশ বানানো। আলোচনা ছিল লোক দেখানো অজুহাত মাত্র।
আমেরিকা-ইজরায়েলের লক্ষ্য ইরান। কিন্তু ইরান পালটা আক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে। এমনকি পৌঁছে গেছে সাইপ্রাস-তুরঙ্কেও। এখানেও তাদের নৈতিক অবস্থা স্পষ্ট। আমেরিকা হাজার হাজার মাইল দূরে। সেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন পৌঁছাবে না। তবে পশ্চিম এশিয়া এবং তার আশেপাশে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং যেসব ঘাঁটি ব্যবহার করে আমেরিকা ইরানে হামলা চালাচ্ছে সেই সব দেশের সেই সব ঘাঁটিকে ইরান তাদের হামলার অন্যতম লক্ষ্য করেছে। এমনকি মার্কিন দূতাবাস সহ মার্কিন সংস্থাও তাদের টার্গেট হয়েছে। ফলে চোখে সরষে ফুল দেখতে শুরু করে পেন্টাগন। ফলত বেশ কিছু মার্কিন ঘাঁটি ও দূতাবাস বন্ধ করে সেখান থেকে মার্কিন সেনা ও নাগরিকদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজও। ফলে রণতরীগুলিকে দূরে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
ইরানের হামলায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের রেডার ব্যবস্থা, মিসাইল-ড্রেন প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। ফলে ইরানের পক্ষে হামলা আগের থেকে সহজ হয়েছে। ইরানের সুবিধাজনক দিক হলো তাদের কামিকোজি ড্রোন। অতি কম খরচে তৈরি এই ড্রোন শত্রুর নজরদারি এড়াতে সক্ষম। আবার এই ড্রোন ঠেকাতে আমেরিকা-ইজরায়েল যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে তার দাম কয়েক গুণ বেশি। ফলে আমেরিকার যুদ্ধব্যয় হুহু করে বাড়ছে। ইতিমধ্যে মধ্য এশিয়ায় মজুত অস্ত্র প্রায় শেষ। নতুন করে অস্ত্র আনতে হচ্ছে অন্য অঞ্চল থেকে।
ইরান মোক্ষম চাল চেলেছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে। বিশ্বে এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয় এই পথ দিয়ে। তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া হুহু করে বাড়ছে তেলের দাম। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ-আতঙ্ক বাড়ছে। ফলে ট্রাম্পের উপর বাড়ছে আন্তর্জাতিক চাপ। নিজের দেশেও তিনি প্রবল বিরোধিতার মুখে। এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে বিপদ বাড়াবেন না যুদ্ধ বিরতির পথে হাঁটবেন সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে। তবে আমেরিকার মানুষ বুঝে গেছেন এ যুদ্ধে তাদের কোনও লাভ নেই। উলটে যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়ের বোঝা বইতে হবে তাদের। মার্কিন অর্থনীতি নতুন সঙ্কটের জন্য অপেক্ষা করছে।
Editorial
হেলায় জেতা যাবে না
×
Comments :0