Post Editorial

এসআইআর: উদ্দেশ্যমূলক তালিকায় টেকনোলজির খেলা

উত্তর সম্পাদকীয়​

দেবেশ দাস


এসআইআর’র চূড়ান্ত তালিকা বেরোনোর পর নানা উত্তেজনা চারিদিকে। তালিকায় কিছু নামের পাশে আছে ‘ডিলিটেড’ (deleted), মানে বাদ। কিছু নামের পাশে লেখা আছে ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’ (under adudication), মানে বিচারাধীন। বিচারপতিরা দেখে সিদ্ধান্ত নেবে, এই ‘আন্ডার আডজুডিকেশন-এ কোনও নাম থাকবে, কোনও নাম থাকবে না। ডিলিটেড বা  ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’ বাদ দিয়ে যারা আছেন তাঁরা বৈধ ভোটার।
প্রথম থেকেই ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে এরাজ্যের নাগরিকদের একধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন। আরএসএস-বিজেপি’র সাজানো প্রকল্পকে এসআইআর’র নামে নির্বাচন কমিশন রূপায়ণ করছে তৃণমূলের দলদাস প্রশাসনের অফিসারদের দিয়ে। সেই জন্যই বাছাই করা এলাকায় বাছাই করে সংখ্যালঘু এবং গরিব প্রান্তিক অংশের মানুষদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত হচ্ছে। নির্বাচনের আগে এটাই ওদের রাজনীতি। ভোটার তালিকা থেকে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা  কোনোভাবেই মেনে নেবেন না এরাজ্যের মানুষ। যে ডিএম, এসডিও, বিডিও’রা বছরের পর বছর তৃণমূল সরকারের ধামাধরা, তৃণমূলের হয়ে ভোট লুট সংগঠিত করেছে, যারা এতদিন কয়লা, গোরু, বালি পাচার আর শিক্ষক নিয়োগের নামে দুর্নীতি চক্রের দালালি করেছে, তারাই এসআইআর’র নামে ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নাম বাদ দিতে বিজেপি’র পরিকল্পনাকে কার্যকর করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপি’র হাতের পুতুল নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যকে সফল করতে কাজ করেছে তৃণমূলের প্রশাসন ।
অনেকেই যারা ২০২৪ সালে নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন, এমন অনেকেই তাদের নাম বৈধ তালিকায় না দেখে চমকে যাচ্ছেন। এমনকি তার আগের কিছু নির্বাচনেও তাঁরা ভোট দিয়েছেন। তাঁদের ডেকেও ছিল কমিশনের লোকেরা। একটি তালিকা ধরে ডাকা হয়েছিল, সেই ডাকে সশরীরে হাজির হয়েও নাম আন্ডার আডজুডিকেশন বা ডিলিটেড। এই তালিকার নাম অসামঞ্জস্য (discrepancy) তালিকা। এই তালিকা তৈরি করেছে রাজ্যের বিএলও-রা নয়, রাজ্যের নির্বাচন অফিসারেরা নয়, বা রাজ্য নির্বাচন কমিশনও নয়। তালিকা তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কম্পিউটারে প্রোগ্রাম চালিয়ে।
প্রথমে বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি ঘুরে যে সব নাম বাদ দিয়েছিলেন তার বাইরে অসামঞ্জস্য তালিকা।  বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি ঘুরে যে নাম বাদ দিল, তার বাইরে অসামঞ্জস্য মানে কী? শোনা গেল, কারও নাম হয়তো আছে, কিন্তু তার বাবা-মার বয়স ভোটার তালিকায় দেখা গেল তার বয়সের তুলনায় ১৮ বছরের কম, এটা অসামঞ্জস্য। আবার বলা হলো, ভোটার তালিকায় কারও হয়তো দেখা গেল ৫/৬ টা ছেলেমেয়ে, এটা অসামঞ্জস্য, ইত্যাদি নানা কথা। অসামঞ্জস্য থাকলে সেগুলি নিশ্চয়ই দূর করা যেতে পারে, কিন্তু যে মানুষটা জলজ্যান্ত আছে, এদেশেই জন্মেছে, প্রতিবার ভোট দিয়ে আসছে, এই অসামঞ্জস্যর জন্য তার নাম বাদ দেওয়া কেন? আর আসল সত্যিটা হচ্ছে, কী অসামঞ্জস্যর জন্য তাঁদের নাম অসামঞ্জস্য তালিকায়, বেশির ভাগক্ষেত্রে বিএলও-রা তা বলতে পারেনি।
উদাহরণ হিসাবে, কলকাতার দুটি বুথের অসামঞ্জস্য তালিকা ও তার ফলাফলের কথা বলছি। একটি বুথে ১১০৬ জনের মধ্যে ৬১৮ জনের নামের তালিকা বের করেছে নির্বাচন কমিশন অসামঞ্জস্য তালিকা  হিসাবে, তাদের ডেকে পাঠিয়েছে। এখানে ২০২৫-এর শেষে  ভোটার ছিল ১৩৮৫, এসআইআর’র প্রথম পর্বের পর আগেই বাদ হয়ে গেছে ২৭৯ জন। তারপরেও দেখা যাচ্ছে ৫৬ শতাংশেই গণ্ডগোল।  শুনানি হয়েছে। বুথটি মুসলিম প্রধান। ১১০৬ ভোটারের মধ্যে ১০৭৩ জন মুসলিম (৯৭ শতাংশ)। ৩৩ জন অ-মুসলিমের  মধ্যে ৪ জনকে ডাকা হয়েছে (১২ শতাংশ), ১০৭৩ জন মুসলিমদের মধ্যে ৬১৪ জনকে ডাকা হয়েছে (৫৭ শতাংশ)। চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে ২২৪ জন ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’ তালিকায় ও তাদের প্রত্যেকেই মুসলিম ।
কলকাতার আরেকটা বুথে ১২০৪ জনের মধ্যে অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে ৬৪৩ জনের (৫৩ শতাংশ)।  এসআইআর’র প্রথম পর্বে এখানে বাদ পড়েছে ১৯৬ জন। বুথটি অ-মুসলিম প্রধান, মুসলিম মাত্র ৭২ জন (৬ শতাংশ), তার মধ্যে  ৬৩ জনকে ডেকে পাঠানো হয়েছে (৮৭ শতাংশ)। অমুসলিম ১১৩৬ জনের মধ্যে ডাক পড়েছে ৫৮০ জনের (৪৯ শতাংশ)। এই বুথের অসামঞ্জস্যের নামের তালিকা অনুযায়ী, পদবি দেখে বোঝা যায়  যে এই ভোটাররা বেশিরভাগই নিম্ন বর্ণের মানুষ। যেমন এই পদবিগুলির ছড়াছড়ি– নস্কর, দলুই, হালদার , সর্দার, মণ্ডল, বিশ্বাস, দাস, ইত্যাদি। তাঁরা নিশ্চয়ই প্রথম দফায় সব কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এখন যখন চূড়ান্ত এসআইআর তালিকা বেরিয়েছে, তাতে ৬৪৩ জনের মধ্যে আবার ৬৮ জনের নাম ঠিক হয়েছে, যাদেরকে ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’ বলে দেখানো হয়েছে। এই ৬৮ জনের মধ্যে ৬৩ জনই মুসলিম  (৯৩ শতাংশ)।  মানে যে মুসলিমদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল, তাদের সবাইকেই ঠেলে দেওয়া হয়েছে ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’ তালিকায়।
কলকাতার এই দুটি বুথ ব্যতিক্রম নয়। বেশি দীর্ঘ যেখানে অসামঞ্জস্য তালিকা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মোটামুটি একই চিত্র ধরা পড়বে। বোঝাই যাচ্ছে, অসামঞ্জস্য তালিকা ও তার পরে নাম বাদ দেওয়ার যে তথ্য আছে, তাতে নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতহীন বলা যাচ্ছে না।
এসআইআর’র কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিজেপি নেতারা বলে আসছেন যে এবার বাংলাদেশের মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ পড়বে। কিন্তু গত ডিসেম্বরে এসআইআর’র প্রথম তালিকায় ৫৮ লক্ষ লোকের নাম বাদ গেছে, তাতে দেখা গেল তাদের বেশিরভাগই হিন্দু। ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-তে গণশক্তিতে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে যে এসআইআর’র প্রথম তালিকায় কলকাতায় বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে দাস পদবি মিলেছে ১৬.৭৩ শতাংশ, সিং পদবি ১২.১১ শতাংশ, সাউ ৭.৮২ শতাংশ, অন্যদিকে আলম পদবি ৩.১২ শতাংশ, খান ৩.৭৫ শতাংশ। ফলে বিজেপি নেতাদের দাবি যে হাস্যকর তা প্রমাণ হয়ে গেছিল। তার পরেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তায় ‘অসামঞ্জস্য তালিকা’ প্রকাশ।
প্রথম কথা, এই অসামঞ্জস্য তালিকায় মুসলিম এবং গরিব প্রান্তিক মানুষদের আধিক্য কেন? তা কি বিজেপি নেতাদের নির্দেশেই হয়েছে?  এখানেই  শোনা যাচ্ছে একটা কথা, এআই টেকনোলজি লাগিয়ে নাকি এই তালিকা তৈরি হয়েছিল। মানে বিজেপি নেতারা কেউ দায়ী নয়। যা কিছু করছে, তার সব করছে এক বুদ্ধিমান বস্তু, তার নাম ‘এআই’ মানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। শব্দটার একটা মাধুর্য আছে, ভাব সাব এমন যে খুব বুদ্ধিমান একটা যন্ত্র এবার এসে গেছে, তাঁকে ফাকি দেওয়া যাবে না, সব ভুয়ো ব্যাপার স্যাপার যন্ত্রটা ধরে ফেলতে পারে। তাই কে বাংলাদেশি আর কে বাংলাদেশি নয়, তা সে সহজেই ধরে ফেলবে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, কলকাতায় যে বুথ দুটির কথা বললাম, অসামঞ্জস্য তালিকায় ‘আন্ডার আডজুডিকেশন’-এ বাদ পড়া ওই মুসলিমরা উর্দু ভাষী, তাঁদের বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা হওয়ার প্রশ্নই নেই।  যদি এআই এক্ষেত্রে থেকেও থাকে, বাংলাদেশি ধরতে যে সে ব্যর্থ সেটা বলার অপেক্ষা  রাখে না। তবে সে মুসলমান ধরেছে।   
এআই এমন একটা বিষয়, যেখানে যন্ত্র নিজে নিজেই শেখে, তার পরে যন্ত্র তার সেই শেখা থেকে নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, যন্ত্রটা যে নিজে নিজে শিখবে, তার শেখার জন্য কী বই পত্র, তথ্য তাকে দেওয়া হবে। সেই তথ্য তো মানুষই সরবরাহ করবে, বা যন্ত্রটি পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করবে। একটা সহজ উদাহরণ দিই। অনেকেই জানেন, এআই আজকাল এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় অনুবাদ করতে পারে। ধরুন আপনি এআই-কে বাংলা থেকে ইংরেজি করতে বললেন ‘সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে’, এআই ইংরেজিতে অনুবাদ করতে পারে ‘He is studying in university’, আবার ধরুন আপনি অনুবাদ করতে দিলেন ‘সে রান্না করছে’, খুব সম্ভব এআই অনুবাদ করবে ‘She is cooking’। একটায় ‘He’, আরেকটায় ‘She’। আপনি কিন্তু আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে ইন্টারনেটে এই অনুবাদ একবার করে দেখতে পারেন, এটাই পাবেন। তারাও নাকি আজকাল এআই ব্যবহার করছে। এখন এআই বা আপনার স্মার্ট ফোন এটাই শিখছে যে ছেলেরা পড়াশোনা  করে, আর মেয়েরা রান্না করে। এখন যদি এআইকে এটা শেখানো হয় যে মুসলিম (আলম,খান, বেগম, বিবি, ইত্যাদি) মানে অনুপ্রবেশকারী বা বাংলাদেশি, তবে সেই এআই-ও অসামঞ্জস্য তালিকায় বেছে বেছে মুসলিম নামগুলিই বেশি ঢোকাবে। 
যদি এআই ব্যবহার করেও থাকে নির্বাচন কমিশন, সেই এআই-কে বিজেপি নেতাদের কাজে লাগিয়ে মুসলিমদের এবং গরিব প্রান্তিক মানুষদের ঠেলতে চেষ্টা করেছে নাম বাতিলের তালিকায়। এটা অবশ্য এআই ব্যবহার না করেও করা যায়। কিন্তু, এআই কথাটা বলা হচ্ছে, বেশ একটা রহস্য তৈরি করার জন্য, ভাবটা এমন যে বেশ একটা দারুণ শক্তিশালী যন্ত্র আমাদের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়ে এসেছে। আসলে কাজটা করা হচ্ছে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই।  

Comments :0

Login to leave a comment