প্রবন্ধ
মুক্তধারা
উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা
সুমন চ্যাটার্জী
২০২৬ মার্চ ১২ | বর্ষ ৩
চৈত্রের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, সেই গান, সেই ব্রিগেড, সেই উজ্জ্বল পায়রার বাংলা_
চৈত্রের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, আজ ২৭শে ফাল্গুন। বসন্তের এই প্রায় দাবদাহের মধ্যে পঞ্জিকার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, কলকাতার ইতিহাসের এক অদ্ভুত দৃশ্যের কথা মনে পড়ে।
১৯৫৫ এর নভেম্বর এর শেষ, শহর ঢাকতে চলেছিল শীতের কম্বলে কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছিল চৈত্রের উষ্ণতা, পুরো শহরে। ঠান্ডা যুদ্ধের শুরুর দিন গুলিতে সমগ্র বিশ্ব তখন আড়াআড়ি দুই শিবিরে বিভক্ত, একদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক, অন্যদিকে সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। সেই প্রবল উত্তেজনাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পর্বেই তৎকালীন সোভিয়েত প্রিমিয়ার নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও নিকোলাই বুলগানিনের ভারত তথা কলকাতা সফর। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সেদিন যে মানুষের ঢল নেমেছিল, তা আজকের দিনের মত কোন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট-এর আয়োজন ছিলনা; ছিল বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে বাংলার এক বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগের মূহূর্ত।
সেই মঞ্চেই সলিল চৌধুরীর সুরে, বিমল ঘোষ (মৌমাছি)-র কথায় এবং গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখার্জীর কণ্ঠে ভেসে উঠেছিল—
"উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা, সূর্য্যের উজ্জ্বল রৌদ্রে, চঞ্চল পাখনায় উড়ছে।"
গানটি শুধুমাত্র আর দশটা অভ্যর্থনা সঙ্গীত ছিলনা, ছিল বিশ্বশান্তির প্রতীক, ভারত সোভিয়েত মৈত্রীর এক জীবন্তগাথা। তৎকালীন বাংলার রাজনীতিতে ছিল আন্তর্জাতিকতার পরিমিত বোধ, শিল্প সঙ্গীত, কলায় ছিল বামপন্থার সগর্ব উপস্থিতি। বাংলার সমাজ তখনও বিগত ১৫ বছরের মতন "আমি কিকি পাব?" তে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়নি, মিছিল, সভা, গান, সব মিলিয়ে রাজনীতি তখন এক সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করত।
আজকে ফাল্গুনের শেষে দাঁড়িয়ে, যখন আবার ক্যালেন্ডারের নিয়মেই চৈত্র আসছে, তখন মনে হয়, একসময় এই শহর বিশ্ব রাজনীতির ভাষায়-ও গান গাইতো। বলা বাহুল্য, আজকে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছে, তবু সলিল চৌধুরির অমর সুরারোপিত সেই পায়রার ঝাঁক এখনও উড়ে বেড়ায় স্মৃতি আর আকাশের অবকাশে।
কারণ, ইতিহাসের ধারায় এমন কিছু সময় থাকে যখন একটি শহর শুধু একটি সভা নয়, বরং একটি যুগের মননশীলতা ও মানসিকতা, উভয়কেই বহন করে। ১৯৫৫ এর কলকাতার আকাশে ওড়া সেই উজ্জ্বল, সুরের এবং নানান রঙের পায়রাগুলি ছিল সেই চেতনারই স্মাতক।
Comments :0