সৌদি আরবের কিঞ্চিৎ উৎসাহে এবং ইজরায়েলের প্রবল চাপাচাপিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিপুল উদ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেও, এমনকি প্রথম ধাক্কায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খামেনেই সহ যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত শীর্ষ কর্তাদের খুন করতে সক্ষম হলেও সময় যত এগচ্ছে পরিস্থিতি হেলায় জেতার মতো জায়গায় মোটেই থাকছে না। তাই ট্রাম্পকে বলতে হচ্ছে যুদ্ধ কয়েক মাস চলবে। ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল একযোগে যেভাবে যুদ্ধ বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ড্রোন নিয়ে চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং খামেনেইকে যেভাবে খুন করেছিল তাতে ধরে নেওয়া হয়েছিল ইরানের প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো উবে যাবে। ইরান সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার পদতলে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু হয়নি। চারদিনের মাথায় প্রবল বিক্রমে পালটা হানা দেয়। পশ্চিম-এশিয়ার বিভিন্ন দেশে (সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, জর্ডন, ইউএই ইত্যাদি) মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে উড়ে যায় ইরানি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে আমেরিকাকে বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দিয়ে সমরাস্ত্র অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে। বন্ধ করতে হয়েছে একাধিক দূতাবাস। দূতাবাস কর্মীদের ফিরিয়ে নিতে হয়েছে। যুদ্ধ বিমান, রাডার ব্যবস্থা বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম ও পরিকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মুখে হুমকি থাকলেও ভিতরে ভেতরে চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের।
ইজরায়েলের স্থায়ী সুরক্ষার স্বার্থে তিনি এত বড় একটা ঝুঁকি নিলেও দেশে কিন্তু এর পক্ষে জনসমর্থন নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক এক জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি মার্কিন কংগ্রেসও। কংগ্রেসকে না জানিয়ে একতরফা যুদ্ধের সিদ্ধান্তে কংগ্রেস সদস্যদের একাংশ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। তারা সরাসরি জানতে চাইছেন কোন স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে এই যুদ্ধ। কীভাবে এর থেকে বেরোনো যাবে এবং আমেরিকাকে কত জীবন ও ডলার ব্যয় করতে হবে।
ঘরের সমস্যার পাশাপাশি বাইরের সমস্যাও কম নয়। অতীতে আফগানিস্তান, ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকা রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সবুজ সঙ্কেত আদায় করেছিল। ন্যাটোও ছিল যুদ্ধের সঙ্গী। এবার ইজরায়েলকে নিয়ে আমেরিকা একাই যুদ্ধে নেমেছে। ইউরোপের বন্ধু দেশগুলিও কার্যত তার পাশে নেই। স্পেন, তুরস্ক ও ডেনমার্ক তো সরাসরি বিরোধিতা করেছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো দু’কূল সামলানোর কৌশল নিয়েছে।
তাছাড়া ট্রাম্পের অবস্থানও গোলমেলে। ট্রাম্প ও তার সচিবরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কথা বলছেন। হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ট্রাম্প নিজেই তিনবার তিনরকম কথা বলেছেন। ফলে অস্বচ্ছতা, অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এদিকে যুদ্ধ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ায় ভূরাজনৈতিক সঙ্কট বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্ব বাজারে তেল, গ্যাসের দাম বাড়তে শুরু করেছে। দেশে দেশে শেয়ার বাজারে পতন শুরু হয়েছে। মুদ্রার বিনিময় মূল্য অস্থির হয়ে গেছে। পণ্য চলাচলে বাধা, বিশ্ব বাণিজ্যের গতি থমকে দিচ্ছে। সব দেশই তাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও বেশিরভাগ দেশই এই যুদ্ধ চাইছে না। কিন্তু ট্রাম্পের পক্ষে সরে আসা সম্ভব নয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে তার ইগোর লড়াই বড় হয়ে দেখা দিলে তার চরম মূল্য চোকাতে হবে আমেরিকা সহ সব দেশের সাধারণ মানুষকে।
Iran
চিন্তায় আছেন ট্রাম্প
×
Comments :0