- মোদীর বিকশিত ভারত কি তার গতি হারালো? বাজেট অধিবেশনের আগে বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে প্রায় আঠশো পাতার অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মোদীর সেই উদ্দাম ‘রিফর্ম এক্সেপ্রেস’-র হাল-হকিকতের চিত্রটি কেমন?
চলতি অর্থবর্ষে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি)বৃদ্ধির হার বেড়ে ৭.৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল মোদী সরকার। কিন্তু পেশ করা আর্থিক সমীক্ষায় আগামী অর্থবর্ষের (২০২৬-২৭) আর্থিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস তার থেকে কমে গেল। রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে, তা থাকবে ৬.৮ শতাংশ থেকে ৭.২ শতাংশের মধ্যে। এর আগে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার বা আইএমএফ আগামী অর্থবর্ষে জিডিপি’র হার কমবে বলেই আভাস দেয়। তারা পূর্বাভাসে জানায়, বৃদ্ধির হার কমে ৬.৪ শতাংশ হবে।
এদিকে আর্থিক সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, ভারতের অর্থনীতি খুবই স্থিতিশীল। তবে বিশ্ব বাজারের সঙ্কট মোকাবিলায় ভারত কতটা সক্ষম হবে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। টাকার দাম কমে যাওয়া, দেশের বাজারের শ্লথ বৃদ্ধি, আমেরিকার চড়া শুল্কের কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সঙ্কট রপ্তানিকারী এবং লগ্নিকারীদের আস্থা কমাতে পারে বলে সমীক্ষায় সতর্ক করা হয়েছে। ইতিমধ্যে টাকার দাম কমায় বিদেশী বিনিয়োগ দেশ থেকে পাততাড়ি গুটাচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের উদ্বিগ্ন হলেও সমীক্ষার দাবি, চিন্তার কারণ নেই। বিদেশি মুদ্রার মজুত ভালোই রয়েছে।
এদিকে আর্থিক বৃদ্ধির হারে সব থেকে পিছিয়ে যাওয়া রাজ্যের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে চলে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের নেট ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (এনএসডিপি) বর্তমান মূল্য হারে ৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। টাকার অঙ্কে তা ১৬.২৩ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ সালে এই হার ছিল ৮.৯৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১৪.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধির হার মাত্র এক শতাংশের মতো। এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে তামিলনাডু। তার এনএসডিপি হার ১৫.৭৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বিহার, ওডিশা ও ঝাড়খণ্ডের এনএসডিপি হারও পশ্চিমবঙ্গের থেকে বেশি। তাদের এনএসডিপি হার যথাক্রমে ১৩.১৭ শতাংশ, ১৩.০৪ শতাংশ এবং ১০.৮৮ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প বাণিজ্যে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় তার এনএসডিপি হার প্রতি বছর অন্য রাজ্যগুলির থেকে কমেই চলেছে। এতে রাজ্যে কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। মহামারীর আগে ২০২১-২২ সালে পশ্চিবঙ্গের এনএসডিপি হার ছিল ১৭.৬৬ শতাংশ। তা প্রতি বছর কমে চলতি বছরে তার হার প্রায় অর্ধেকে এসে দাড়িয়েছে।
আর্থিক সমীক্ষায় ভারতের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত বলে দাবি করা হলেও টাকার দামে লাগাতার পতন রোধে কোনও ভরসা মেলেনি সমীক্ষা রিপোর্টে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার রিপোর্টে টাকার দামে পতনের ফলে বিদেশি বিনিয়োগ দেশ ছাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে টাকার দাম কমে ডলার প্রতি ৯১.৯০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে সমীক্ষা রিপোর্ট টাকার দামে পতনের কারণ হিসাবে বিশ্ব বাণিজ্যের অস্থিরতাকে দায়ী করেছে।
এদিকে ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি শিল্পে ব্যাঙ্কের ঋণ বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা বাড়েনি। ছোট মাঝারি শিল্পে ৮.১ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কের ঋণ বিনিয়োগ আটকে রয়েছে। তা শিল্পে বিনিয়োগ হয়নি। রিপোর্টে বলা এই বিপুল বিনিয়োগ না হওয়ায় ছোট মাঝারি শিল্প পুঁজির অভাবে চরম সঙ্কটে পড়েছে। ছোট শিল্পে ব্যাঙ্কের বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণ বিলি প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে রেগা কাজ বাতিলের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে গ্রামীণ ভারতে কাজের সুযোগ বেড়ে গেছে। তাই রেগার চাহিদা নেই। বলা হয়েছে, ২০২১ সালে মহামারীর সময় রেগা কাজে ৩৮৯ কোটি শ্রম দিবস তৈরি হয়। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১৮৩ কোটি শ্রম দিবস। যা দাবি করা হয়েছে তাতে দেখা গেছে, রেগা কাজের চাহিদা ৫৩ শতাংশ হারে কমেছে। রিপোর্টে বলা হচ্ছে, গ্রামে অকৃষি কাজের জোগান বেড়ে যাওয়ার কারণে রেগা কাজের চাহিদা কমে গেছে। তাতে আরো দাবি করা হয়েছে, গ্রামে বেকারত্বের হার নাকি কমে গেছে। ২০২০-২১ সালে গ্রামে বেকারির হার ছিল ৩.৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে তা কমে ২.৫ শতাংশ হয়েছে। এদিকে রেগা কাজের চাহিদা কমলেও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নাকি নতুন জি রামজি প্রকল্প চালু করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, এতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান নাকি দুর্নীতি মুক্ত হবে।
Economic Survey
অর্থ মন্ত্রকের রিপোর্টে কমলো বৃদ্ধির হার, এনএসডিপি’তে তলানিতে পশ্চিমবঙ্গ
×
Comments :0