অনিল কুণ্ডু : আনন্দপুর
নাজিরাবাদের বাতাসে ভাসছে পোড়া গন্ধ, বিক্ষোভের মুখে দমকল মন্ত্রী
মৃত্যু মিছিল! বিধ্বংসী আগুনে তালা বন্ধ গুদামে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শ্রমিকরা। একের পর এক ৮ জনের দগ্ধ কঙ্কালসার দেহ উদ্ধার হলেও এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ২১ জন। কান্না আর হাহাকার তাঁদের পরিবার পরিজনদের। মৃতদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত করতে পাঠানো হয়েছে। দেহ সনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। সোমবার ভোররাতে আনন্দপুরের কাছে নাজিরাবাদ এলাকায় একটি অন লাইন খাদ্য ডেলিভারি সংস্থার গুদামে প্রথমে আগুন লাগে। বিধ্বংসী আগুন পাশের ডেকোরেটার্সের গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ২টি বড় গুদাম বিধ্বংসী আগুনে পুরো ভস্মীভূত হয়েছে। ঘটনাস্থলে আসে দমকলের ১২টি ইঞ্জিন। সোমবার রাত পর্যন্ত ৮ জন শ্রমিকের দগ্ধ কঙ্কালসার দেহ উদ্ধার করেছেন দমকল কর্মীরা। বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি। যদিও প্রশাসনের তরফে চূড়ান্ত তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। সোমবার রাতেই সুভাষগ্রামে সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতালে মৃতদেহগুলি নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে আলিপুরে মোমিনপুর মর্গে মৃতদেহ ময়নাতদন্ত করতে পাঠানো হয়েছে।
অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর ওই দুটি গুদামে থাকা শ্রমিকদের পরিবার পরিজনেরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছেন। নিখোঁজদের খোঁজ না মেলায় কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ২১ জন। ইতিমধ্যে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশের কাছে তাঁদের পরিবার পরিজনরা নিখোঁজ ডায়েরি করেছেন।
সোমবার ভোররাতে আগুন লাগে। মঙ্গলবারও আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন দমকল কর্মীরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, গুদামের ভিতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার পর পর বিস্ফোরণ হওয়ায় আগুন ভয়াবহ চেহারা নেয় ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গুদামের পাশে থাকা মেস ও বাড়ি থেকে লোকজনদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সোমবার ঘটনাস্থলে আসেন বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ফিরদৌসী বেগম। মঙ্গলবার আসেন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু, পৌর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনার প্রায় ৩২ ঘন্টা পর ঘটনাস্থলে দমকল মন্ত্রী আসায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় মানুষেরা তাঁকে দেখে গো ব্যাক শ্লোগান দেয়। এদিন সকাল থেকে নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবার পরিজনদের দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশি ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে ঘটনাস্থল।
মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে আমি এখানে এসেছি। দেহ শনাক্তের কাজ সম্পন্ন হলে পরিবারের হাতে ডেট সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হবে। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য করা হবে। ঘটনার কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই ক্ষতিপূরণের পরপেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার জানিয়েছেন, ২৭ বছরের তরতাজা প্রাণ চলে গিয়েছে। এখন এই দশলক্ষ টাকা দিয়ে কি হবে। কতদিন চালবে। কি করে সংসার চলবে আমাদের।
গোডাউনের ভিতরে দমকল কর্মীরা এদিনও ভস্মীভূত ছাই চাপা আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়েছেন দিনভর। তার ভিতর থেকে ধোয়া বেরোতে থাকে অনবরত। এদিন ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক টিম নমুনা সংগ্রহ করেছে। দমকলের ডিজি ও এডিজিসহ অন্যান্য আধিকারিকরা নমুনা সংগ্রহ করেন। গোটা এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। একনও নাজিরাবাদের বাতাসে ভাসছে চামড়া পোড়া গন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে ওই দুটি গুদামে কোন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
৮ জন শ্রমিকের দেহ উদ্ধার হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, মৃতদের সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে। গুদাম দুটিতে বাইরে থেকে তালা বন্ধ থাকায় ভিতরে আগুন লাগলেও বাঁচবার আপ্রাণ চেষ্টা করেও কেউ বেরোতে পারেননি। বিধ্বংসী আগুনে গুদামের ভিতরেই তাঁরা দগ্ধ হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এদিন অভিযোগ করে আরও বলেছেন, অন লাইন খাদ্য ডেলিভারি সংস্থার গুদামে বেআইনিভাবে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরি করা হতো। প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ মজুত করা হয়েছিল।
এদিকে ঘটনার পর বারুইপুর পুলিশ জেলার পদস্থ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে আসলেও সরকারিভাবে এখনও পর্যন্ত মৃত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের কোন তথ্য জানাতে পারেননি। পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, মৃতদেহ ময়নাতদন্তর পর দেহ সনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
Comments :0