New Monarchy

নতুন সম্রাটতন্ত্র

সম্পাদকীয় বিভাগ

দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামে যোগ দেবার পথে ট্রাম্প আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরছেন না। যে কোনও উপায়ে হোক, এমনকি প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও গ্রিনল্যান্ডের দখল তিনি নেবেনই। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ডে আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সমস্ত ধরনের আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, রীতিনীতিকে অগ্রাহ্য করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশকে সামরিক ক্ষমতার জোরে বলপূর্বক কেড়ে নেবার এমন উদ্যোগ একটি বিরল দৃষ্টান্ত। এরজন্য ট্রাম্প যে ছেলেমানুষি অজুহাত খাড়া করার চেষ্টা করছেন সেটা হলো চীন ও রা‍‌শিয়া নাকি গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মুখিয়ে আছে। তাদের হাত থেকে ডেনমার্ক নাকি গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করতে পারবে না। তাই ট্রাম্প আগেভাগে গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার দখলে নিতে চাইছেন। যদিও চীন বা রাশিয়া কোনোদিন তাদের এমন আকাঙ্ক্ষার কথা কোথাও কোনওভাবে ব্যক্ত করেনি। তেমন কোনও উদ্যোগ, প্রস্তুতি বা পদক্ষেপও নেয়নি। কথায় আছে দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। এক্ষেত্রেও ট্রাম্প একটা মনগড়া অজুহাত খাড়া করার চেষ্টা করেছেন নিজের অপকর্মের বৈধতা পাবার জন্য।
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে একটি স্বশাসিত অঞ্চল। চিরতুষারাবৃত দ্বীপটিতে বাস করেন ৫৭ হাজার মানুষ। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমী সামরিক জোট ন্যাটের সদস্য ডেনমার্কও। ন্যাটো চুক্তির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ন্যাটোর সদস্য কোনও দেশ বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে ধরে নেওয়া হবে সব ন্যাটো সদস্য দেশই আক্রান্ত। তখন সেই দেশকে রক্ষা করার জন্য বাকি সব দেশ (আমিরেকার নেতৃত্বে) একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে। নিয়ম অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড অর্থাৎ ডেনমার্ক চীন ও রাশিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে আমেরিকার নেতৃত্বে গোটা ইউরোপ পালটা আক্রমণে নামবে। তাহলে রাশিয়া-চীন কর্তৃক গ্রিনল্যান্ড দখলের আশঙ্কা আসে কোথা থেকে? তেমন হলে ন্যাটো বাহিনী কি ছেড়ে কথা বলবে?
ন্যাটো চুক্তির দৌলতে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই রয়েছে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি। পেন্টাগনের নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্যে আছে ইউরোপ। এমনকি গ্রিনল্যান্ডেও আছে মার্কিন বিমান ঘাঁটি, নৌঘাঁটি। মার্কিন সেনারা ইতিমধ্যেই প্রবলভাবে গ্রিনল্যান্ডে আছে। চীন-রাশিয়া দখল করতে এলে আমেরিকার সঙ্গে করেই তা করতে হবে। সেটা নিতান্তই অবাস্তব কষ্টকল্পনা। চীন-রাশিয়ার গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনও প্রশ্নই নেই। বরং গ্রিনল্যান্ড দখলে মরিয়া এবং বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প স্বয়ং। দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেই সমস্ত আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে মধ্যযুগীয় রাজ্য বা সম্রাটের মতো আচরণ শুরু করেন ট্রাম্প। কানাডা, মেক্সিকো, পানামা খাল দখল করার কথা বলেছেন প্রথমেই। পরে যোগ হয়েছে গ্রিনল্যান্ড। নিজের সমাজমাধ্যমে একটি ম্যাপ পোস্ট করে তিনি দেখিয়েছেন কানাডা এবং গ্রিনল্যান্ড আমেরিকারই অংশ। তাঁর গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রক্রিয়ায় যে বা যারা বাধা দেবে বা বিরোধিতা করবে তাদের কাউকে তিনি ছেড়ে কথা বলবেন না। ইতিমধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি সহ ৮টি ইউরোপের দে‍‌শের বিরুদ্ধে শুল্ক অস্ত্র প্রয়োগ করেছেন। অর্থাৎ আমেরিকার তালে তাল না মেলালে উচ্চ হারে শুল্ক ও বিধিনিষেধ আরোপিত হবে।
ট্রাম্পের এমন এক তরফা পদক্ষেপে গোটা ইউরোপ জুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ৭০ বছরের ন্যাটো জোটে ভাঙনের পূর্বাভাস উঁকি মারছে। ট্রাম্পের হুমকিতে ইউরোপের সার্বভৌমত্বই শুধু বিপন্ন নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার মৌলিক ধারণা ও কাঠামোকেই ট্রাম্প অস্বীকার করতে শুরু করেছেন। অর্থহীন করে দিতে চাইছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘকেও। বদলে আমেরিকাকেই বসাতে চাইছেন বিশ্ব সম্রাটের আসনে। মার্কিন ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে মান্যতা দিয়ে চলবে বাকি বিশ্ব। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে নতুন বৈশিষ্ট্যের সাম্রাজ্যবাদী চেহারায় রূপান্তর ঘটাতে চাইছেন। আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী রাজতন্ত্রের মতো।

Comments :0

Login to leave a comment