Post editorial

অরণ্য কাড়তে বিভাজনের ব্লু প্রিন্ট লুণ্ঠিত হচ্ছে অরণ্যের অধিকার

উত্তর সম্পাদকীয়​

অমিত সরকার
 

দেশের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক অশান্তির কিছু ঘটনা যদি খুঁটিয়ে বিচার করা যায় তাহলে তার মধ্যে একটা স্পষ্ট ছক উঠে আসে। সেই ছক হলো একেবারে সুপরিকল্পিত উপায়ে দেশের বনজ ও খনিজ সম্পদ লুটের সুযোগ দেশি-বিদেশি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া। এই পরিকল্পনা রচনা ও কার্যকর করছে কেন্দ্রের ও বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকার। একাজে নিচুতলায় তাদের মদত দিচ্ছে আরএসএস, যাদের সংগঠনের অনুপ্রবেশ এদেশের আদিবাসী ও জনজাতিদের মধ্যে রয়েছে। এই লক্ষ্যপূরণে  তারা ব্যবহার করছে বিভাজনের রাজনীতি। তারা চাইছে, অরণ্য ও খনিজ সম্পদ লুটের অধিকার যাতে দেশি ও বিদেশি কর্পোরেট তুলে দেওয়া যায় সে জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আদিবাসী ও মূলবাসী জনগণকে উচ্ছেদ করা। তাদের আজন্মের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। এই লক্ষ্যেই ধর্ম ও বিভাজনের রাজনীতিকে ব্যবহার করে তারা প্রথমে বিভিন্ন এলাকায় অশান্তি বাধিয়ে তুলছে।
মণিপুর থেকেই শুরু করা যাক। এক বছরের বেশি সময় হয়ে গেল মেইতেই ও কুকি জো গোষ্ঠীর সহিংস দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জেরে পুড়ছে মণিপুর। গোড়ায় বোঝাতে চাওয়া হয়েছিল মেইতেই ও কুকি জোদের মধ্যে সংঘাত আসলে জাতিদ্বন্দ্ব। কিন্তু পরে ক্রমশ প্রকাশ্যে এল, এর পিছনে রয়েছে লুটের সমীকরণ। মেইতেইরা আদিবাসী নয়। কুকি জো ও নাগারা আাদিবাসী। এরা থাকেন মণিপুর রাজ্যের ৯০ শতাংশ এলাকায়। সেই সব পাহাড়ি এলাকা অরণ্য সম্পদে ভরা। আবার অরণ্যভূমির মাটির নিচে রয়েছে লাইমস্টোন, ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা এবং প্ল্যাটিনাম গ্রুপ এলিমেন্টসের মতো মূল্যবান ও দরকারি । কুকি জো-রা আদিবাসী। নিয়ম অনুযায়ী তাদের জমি কেনা যায় না। মেইতেইরা আদিবাসী নয়। তবে তাদের জমি কিনতে পারে আদিবাসীরা। সম্প্রতি মেইতেইদের তফসিলি উপজাতির তকমা দিতে চাইছে কেন্দ্র। কুকি জো গোঠীর আশঙ্কা, এই স্বীকৃতি পেলে কুকি জো এলাকার বিরাট বিরাট জমি লিজে নিয়ে কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পাবে সম্পন্ন মেইতেইরা। এভাবেই মণিপুরে কৌশলে কুকি জো এলাকার অরণ্য ও খনিজ সম্পদ লুটের ছক কষেছে বিজেপি সরকার। অন্যদিকে ড্রাগ পাচারের তকমা দিয়ে, অরণ্য সংরক্ষণের নামে এবং ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে ওই এলাকার জমির অধিকার থেকে কুকি জো ও নাগা আদিবাসীদের উৎখাত করার চেষ্টা করেছে বীরেন সিং সরকার। জমি, অরণ্য ও খনিজ লুটের এই ছক কার্যকর করতে মেইতেই ও কুকিদের মধ্যে সংঘাত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বিজেপি’র তরফে। এবং মণিপুরের বিজেপি সরকার মেইতেইদের পক্ষে দাঁড়িয়ে কুকি জো গোষ্ঠীর জীবন বিপন্ন করে তুলেছে। এবং দুই গোঠীর বহুকালের মৈত্রীকে বিপন্ন করে তুলেছে। তবে এই ছক সফল ভাবে কার্যকর করা যায়নি বলেই মণিপুর এখনও অচলাবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে বীরেন সিং সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে মণিপুরের পাহাড়ি এলাকার জমি ও খনিজ লুটের ছক এখনও বদলায়নি বিজেপি নেতৃত্ব। এভাবে কর্পোরেটের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যেই সংঘাত দীর্ণ মণিপুরকে রাজনৈতিক অশান্তির মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে।
একই ঘটনা আসামের কার্বি আঙলঙ এলাকায়।  দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে আরেকটি অশান্ত এলাকা আসামের পশ্চিম কার্বি আঙলঙ জেলা।এই জেলায় মাটির নিচে রয়েছে লাইমস্টোন, কয়লা, চীনা মাটি, গ্র্যানাইট, সিল্লিমানাইট, প্ল্যাটিনাম, লৌহ আকর, ভানাডিয়াম এবং টাইটানিয়ামের মতো মূল্যবান খনিজ। সম্প্রতি এই এলাকায় অবৈধভাবে শুরু হয়ছে নদী থেকে বালি ও পাথর খাদানের কাজ। এর জেরে রাজস্ব হারাচ্ছে কার্বি আঙলং স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ। অভিযোগ,আসামের বিজেপি সরকারের মদতে বেআইনি এই সব কাজে মদত দিচ্ছে স্বশাসিত পরিষদের শীর্ষ নেতারা। পরিষদের বিরুদ্ধে এনিয়ে আন্দোলনে নেমেছে কার্বি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং অটোনোমাস স্টেট ডিমান্ড কমিটি। এই আন্দোলনের জেরে অশান্ত হয়ে ওঠে এই এলাকা। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য তুলিরাং রংহাঙের পৈতৃক বাড়িতে আগুন লাগায়। পরে সেই বাড়ি মেরামতের চেষ্টা না করে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেয় প্রশাসন। সেই সময় একাধিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নষ্ট করার ছবি ধরা পড়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ঘুষের টাকা ও অবৈধ অস্ত্রের প্রমাণ নষ্ট করতেই বাড়িটি বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয় প্রশাসনের উদ্যোগে। অন্যদিকে, চা বাগান বিক্রির নামে কোটি কোটি টাকা নয় ছয় করা হয়েছে এবং পাহাড়ি এলাকায় মাদাকসক্তিতে মদত দিয়েছে বিজেপি।
কারবি, কুকি ও ডিমাসারা এই এলাকার মূল আদিবাসী গোষ্ঠী। সংবিানের ষষ্ঠ তফসিলে এলাকার জমির, অরণ্য সম্পদের ওপর এদের অধিকার সুরক্ষিত। তবে এদের আশঙ্কা, আসামের বিজেপি সরকার ধীরে ধীরে তাদের সুরক্ষিত অধিকারগুলি বিপন্ন করে তুলছে। এর জেরে ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে এই সব এলাকা। সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কার্বি আঙলঙ স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের সিইএম তুলিরাম রঙহাঙ এবং কর্পোরেট গোষ্ঠর মধ্যে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলে অভিযো। হিমন্ত-তুলিরাম চক্র ও তাদের সহযোগীরা এতদঞ্চলের জমি ও সম্পদ তুলে দিচ্ছে কর্পোরেটদের হাতে। তাতেই কারবি, কুকি ও ডিমাসাদের সাংবিধানিক অধিকার, জমির নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অবৈধ উপাযে জমি হস্তান্তর করে কোটি কোটি টাকা আয় করার অভিযোগ উঠেছে বিজেপি নেতাদর বিরুদ্ধে। সেই ক্ষোভের আগুনেই পুড়েছে তুলিরাম রঙহাঙের বাড়ি। এই অঞ্চলের হাজার হাজার বিঘা জমি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার ছক কষা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে শান্তপূর্ণ আন্দোলনের ওপরেও পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যদি মধ্যভারতের দিকে তাকানো যায়, তাহলে দেখা যাবে সেখানে রয়েছে  ছত্তিশগড়, মধ্য প্রদেশ,ওডিশা ও ঝাড়খণ্ডের বিপুল অরণ্য এলাকা। তার নিচে সঞ্চিত বিপুল খনিজের ভাণ্ডার। এসব জায়গায় জল–জমি–জঙ্গলের অধিকার আদিবাসীদের। ছত্তিশগড়ে রয়েছে লৌহ আকর, বক্সাইট, কয়লা ও ম্যাঙ্গানিজ। মধ্য প্রদেশেও রয়েছে লৌহ আকর, বক্সাইট, কয়লা, লাইমস্টোন, ডলোমাইট, সোনা, হিরে,কোরানডান এবং নানা ধরনের রত্ন। ওড়িশায় রয়েছে লোহা, বক্সাইট,ক্রোমাইট, ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, টিন, ভানাডিয়াম, গ্রাফাইট , লাইমস্টোন ও রত্ন। ঝাড়খণ্ডের মাটির নিচেও মিলবে এমনই সব গুরুত্বপর্ণ খনিজ সম্পদ। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, মাওবাদী দমনের নামে কার্যত এই সব এলাকার আদিবাসী আন্দোলনকে উচ্ছেদ করাই কেন্দ্রের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে আদিবাসীদের ভিটেছাড়া করে জল, জঙ্গল ও খনিজের একচেটিয়া অধিকার কেন্দ্র তুলে দিতে চায় দেশি–বিদেশি ক্রোনি পুঁজির হাতে। মাওবাদী দমনের পর এই সব এলাকা দখলদারির আনন্দ ও উল্লাস চেপে রাখতে পারছেন না ওই রাজ্যগুলির বিজেপি নেতারা। 
জমি ও খনি লুটের আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ  আরাবল্লী। বিগত সাত বছরে শুধুমাত্র রাজস্থানের ২০টি আরাবল্লী লাগোয়া জেলায় ৪০ হাজার ১৭৫টি অবৈধ খননের অভিযোগ রয়েছে। গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লি মিলিয়ে চার রাজ্যের প্রায় ৩৯টি জেলায় ৬৯০ কিমি এলাকাজুড়ে আরাবল্লী পার্বত্য এলাকার বিস্তৃতি। রাজস্থানের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সমীক্ষায় দেখা গেছে এই এলাকার ১৫৮২ বর্গকিমি জুড়ে খনন চলছে।এর কতটা বৈধ ও অবৈধ তার প্রমাণ মেলেনি। আরাবল্লী অঞ্চলে নজরে আসছে দামি গ্রানাইট, পিঙ্ক গ্রানাইট, বেরিল, কোয়ার্টজ পাথর ও ফেল্ডস্পার। এছাড়া রয়েছে বিপুল পরিমাণ খনিজ — দস্তা, সীসা, রুপো, ক্যাডমিয়াম, টাংস্টেন, মার্বেল পাথর, রক ফসফেট সোপ স্টোন, জিপসাম , অ্যালবেস্টস ও মাইকা। আরাবল্লীকে ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে এই সম্পদ কুক্ষিগত করতে চায় খনি মাফিয়ারা। মনে রাখা দরকার, এই সব এলাকাভিল, গার্সিয়া, মিনা, কোঙ্কনা,ওয়ারলি, চৌধুরি, দুবলা, দোধিয়া, ঢঙ্কা, রাথোয়া উপজাতিদের বাসভূমি। এই অঞ্চলের খনির অধিকার যদি নির্বিচারে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে বিপুল সংখ্যায় ভূমিচ্যুত হবেন এই সব আদিবাসীরা। 
চোখ ফেরানো যাক আন্দামানের দিকে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জও এখন ভারত সরকারের বিস্তৃত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। ক্রান্তীয় বনভূমি আচ্ছাদিত এলাকাকে বৃক্ষশূন্য করে গড়ে তোলা হবে এক আধুনিক শহরের বাস্তুতন্ত্র।  এতে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি তো হবেই। এই দ্বীপের জনসংখ্যা এখন ৮ হাজারের কাছাকাছি। উন্নয়নের পর বেড়ে হবে সাড়ে আট লক্ষ। এর মানে এখানকার জনজাতিভুক্ত মানুষের আজন্মকালের সম্পদ কেড়ে নিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়া হবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
মণিপুর ও অসম থেকে মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমে আরাবল্লী, ওদিকে আন্দামানের গ্রেট নিকোবর আইল্যান্ড— মানচিত্রের এই বিন্দুগুলিকে একটা সূত্রে গেঁথে ফেলা যায়। সেটা হল, এই সব অরণ্য ও খনিজ সমৃদ্ধ ভূমির একচেটিয়া অধিকার দেশি–বিদেশি ক্রোনি পুঁজির হাতে তুলে দিতে চাইছে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলি। এর জেরে উচ্ছেদ হতে হবে আদিবাসী, জনজাতি ও ভূমি পুত্রদের।  হারাতে হবে অরণ্যের অধিকার। নির্বিচার খননের ফলে ধ্বংস হবে পরিবেশ। আরাবল্লী বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হলে এগিয়ে আসবে মরুভূমি।
বাদ যাচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গও। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলির মতো একই কায়দায় তৃণমূল শাসিত পশ্চিমবঙ্গেও আদিবাসীদের জমি, অরণ্য লুট হচ্ছে দেদার ডেউচা পাঁচামী কয়লা উত্তোলন প্রকল্পে। এই প্রকল্পে যে ১১,২২২ একর প্রস্তাবিত খনির জমি রয়েছে, তার মধ্যে ৯১০০ একর জমিই আদিবাসীদের। এর মানে মোট প্রকল্পে বরাদ্দ ৮১% জমিই আদিবাসীদের জমি। এখানকার কয়লা ব্লকটি প্রস্তাবিত ১৩.৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে। সেই এলাকার ওপর রয়েছে ৪১৩৪টি বাড়ি যা আসলে আদিবাসী, তফসিলি জাতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও অন্যান্যদের বাড়ি। এই প্রকল্পে প্রায় ২১ হাজার মানুষের উচ্ছেদের আশঙ্কা রয়েছে যার মধ্যে ৯০০০-এর বেশি আদিবাসী এবং মূলত সাঁওতাল। এখানেও ব্যাসল্ট খনির কারণে পরিবেশ দূষণ, গাছ কাটা এবং বন ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা থাকছে। রাজ্য সরকার কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা ভুয়ো। বাস্তবে এই এলাকার আদিবাসীদের জন্য কাজ কম দেওয়া হয় এবং মজুরিও কম দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা, জমি ও অরণ্যভূমি আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত এবং তা তারা হারতে চান না। পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী অধিকার মঞ্চের সম্পাদক পুলিনবিহারী বাস্কে বলেছেন, এই প্রকল্পে ২০-২১ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করার ব্যবস্থা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ডেউচা পাঁচামীতে আদৌ কয়লা খনি হচ্ছে না। বরং, ব্যাসল্ট পাথর তুলে বেচে দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে। এখানে কার্যত আদিবাসী ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্মতি ছাড়াই প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে রাজ্য সরকার। এ থেকেই স্পষ্ট, ডেউচা পাঁচামী প্রকল্পে আদিবাসীদের জমি এবং জমির নিচে থাকা খনিজ সম্পদ বিজেপি-আরএসএস’র মতো কায়দায় দেদার লুটের জন্য কর্পোরেট পুঁজিকে অবাধ ছাড়পত্র দিয়েছে তৃণমূল সরকার, যা উন্নয়নের নামে এই এলাকাকে স্থায়ী ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারে। এখানে একথা স্পষ্ট যে, কর্পোরেট ও ক্রোনি পুঁজির সঙ্গে আঁতাত গড়ে আদিবাসীদের অধিকার হরণে বিজেপি’র সঙ্গে তৃণমূলের কোনও ফারাক নেই।
আসলে গোটাটাই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নয়া উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিণতি। জমি, অরণ্যভূমির অধিকার, পরিবেশের ছাড়পত্র, খনিজ সম্পদ উত্তোলন, খনির অধিকার বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া — এসবের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট যে কেন্দ্র এদেশে অরণ্য ও খনির অধিকার পুরোপুরি তুলে দিতে চায় কর্পোরেটের হাতে। ২০১৫ সালের মাইনিং অ্যান্ড মিনারালস (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বেসরকারি খনি কোম্পানিগুলির হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। এই সংশোধনীতে খনির জন্য লিজের সময়সীমা বাড়িয়ে ৫০ বছর করা হয়েছে। এবং সেজন্য স্থানীয় গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে পরামর্শ করার কোনও প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। খনিজ সম্পদের জন্য বেপরোয়া এই প্রতিযোগিতার কারণে জমি, অরণ্য, জলাভূমি ধ্বংস হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় গোষ্ঠীগুলি দারিদ্রে তলিয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন গতি পেয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমণ বেড়েছে। ফলে সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্য ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবার উল্টোদিকে দেখা যাচ্ছে, বেদান্তর মতো কোম্পানিগুলির বৈভব ও সমৃদ্ধি কী দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং এই লুট করা সম্পদ ঘুর পথে গিযে ’ কোষাগারে জমা হয়নি একথাও বলা যাবে না।
এদেশে আদিবাসী এলাকাগুলিতে আরএসএস’র সংগঠনের শিকড় অনেক গভীরে। বনবাসী নাম দিয়ে তারা বহুকাল ধরেই এই সব এলাকার মানুষজনের মধ্যে সক্রিয়। ইদানীং এই সব অঞ্চলের নির্বাচনেও অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে আরএসএস। এখানে আরএসএস’র ভূমিকা দ্বিবিধ। একদিকে তারা নিচুতলায় শিকড় চারিয়ে আদিবাসী সমাজের আস্থা অর্জনের সক্রিয়। অন্যদিকে, বিশ্বাস অর্জন করার পর নানা ধরনের বিভাজনের নীতিকে হাতিয়ার করে তাদের মধ্যে সঙ্ঘাতের জন্ম দিচ্ছে। এইভাবে তারা কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের জমি ও খনি লুটের পরিকল্পনায় শামিল হচ্ছে নিচুতলা থেকে। এভাবেই ওপর থেকে বিজেপি এবং নিচে থেকে আরএসএস— তাদের যুগলবন্দির মাধ্যমে কর্পোরেটের লুটের সুযোগকে বাস্তবায়িত করে তুলছে। 
 

Comments :0

Login to leave a comment