ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে যেভাবে রাজ্যবাসীকে শুনানিতে ডেকে পাঠিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে তাতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ডেকে পাঠানো হচ্ছে, নামের বানান, বাবার নামের সঙ্গে মিল, বয়স, সন্তানের সংখ্যা ইত্যাদি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা যৌক্তিক অসঙ্গতির কারণ দেখিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার ভোটারের নাম, বাবা মায়ের নাম ইত্যাদিতে বানান ভুলের দায় নির্বাচন কমিশনেরই। তারাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলা ও ইংরেজিতে একাধিক জায়গায় একাধিক বানানের সৃষ্টি করেছে। এখন কমিশনের ভুলের দায় ভোটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে তাঁদের শুনানিতে ডেকে নথি দেখিয়ে প্রমাণ করতে বলা হয়রানি ছাড়া কিছুই নয়। তাছাড়াও নির্বাচন কমিশন যেভাবে সন্তানসংখ্যা কিংবা একই ব্যক্তির নাম পরিবর্তন নিয়ে কৈফিয়ত তলব করছে তাতে কমিশনের এই হাঁকডাককে আদৌ ‘যুক্তিসম্মত’ বলাও যাচ্ছে না। আমাদের দেশ এবং এরাজ্যের সমাজ সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকলে এই ‘অসঙ্গতি’গুলিকে নির্বিচারে শুনানিতে ডাকার কারণ হিসাবে বিবেচনা করা যায় না। আদতে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিসম্মত অসঙ্গতি আইনানুগভাবে সংজ্ঞায়িতই নয়, এর নামে তালিকা তৈরির স্পষ্ট কোনও আইনি ভিত্তিই নেই। আরও সন্দেহজনক নির্বাচন কমিশনের শুনানি নোটিসের জন্য ‘অসঙ্গতি’ বাছাইয়ের ধরনে। যেভাবে কোনও কোনও বুথের ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটারদের নোটিস দেওয়া হয়েছে, তাতে এই প্রশ্নই স্বাভাবিক যে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্ট এলাকা ও বুথ বাছাই করে নির্দিষ্ট কোনও রাজনৈতিক দলকে সুবিধা করে দিতেই কি এসআইআর করা হচ্ছে?
ভোটার তালিকা থেকে মৃত ও স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিতদের এবং ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু কমিশনের দায়িত্ব মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক, অর্থাৎ বাসিন্দাদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের ভোটাধিকার প্রদান করা, এটাই সংবিধানের নির্দেশ। নির্বাচন কমিশন আদৌ নাগরিকত্বের প্রশ্ন নিষ্পত্তি করতে পারে কি? বিশেষ করে যখন ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৬ এবং ১৯ ধারা অনুযায়ী, বিপরীত কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত নির্বাচকদেরই ভারতের নাগরিক ধরে নেওয়াটাই স্বাভাবিক। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর অধীনে কোনও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের রেফারেন্স ছাড়াই ভারতের নির্বাচন কমিশন বা তার আধিকারিকরা একজন বর্তমান নির্বাচকের কাছে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি দাবি করতে পারে না, অথচ এর মাধ্যমে সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলি লঙ্ঘন করে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়ভার বেআইনিভাবে নির্বাচকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, নিজ দায়িত্ব ও এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে নির্বাচন কমিশন এমন কাজে নেমেছে কেন? আরএসএস-বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ছেয়ে গেছে এবং তারাই বাংলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অমূলক প্রচার চালিয়েছে, সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা, ঘুষপেটিয়া ইত্যাদির কথা বলে তারা ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। এর মারাত্মক পরিণতিতে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা আক্রান্ত হয়েছেন, প্রাণও হারিয়েছেন। এরাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এই ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতির দায় অস্বীকার করতে পারেন না, কারণ তিনিও বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন একই কথা বলতেন, এমনকি ভোটার তালিকায় বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারী’র অভিযোগ করে লোকসভায় উপাধ্যক্ষের দিকে কাগজের বান্ডিল ছুঁড়েছিলেন। এসআইআর’র বর্তমান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীর কোনও খোঁজ নির্বাচন কমিশন দিতে পারেনি। অগত্যা তারাই কি এখন মানুষকে শুনানিতে ডেকে, হয়রানি করে নাম বাদ দিয়ে আরএসএস-বিজেপি’র রাজনৈতিক প্রকল্পকে রূপায়ণ করতে নেমেছে? জবাব নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে। এমন অপচেষ্টা বাংলার মানুষ মেনে নেবেন না, শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মতভাবেই তাঁরা প্রতিবাদে শামিল হবেন।
SIR
কার দায় কার ঘাড়ে!
×
Comments :0