‘‘গান্ধীজী মরিয়াছেন, এখন যদি দেশের কল্যাণ হয়’’- গান্ধীজীর মৃত্যুতে হিন্দু মহাসভার সদম্ভ উক্তি। মুর্শিদাবাদের খাগড়া থেকে এই শিরোনামে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ গান্ধীজীকে হত্যার চার দিনের মাথায়। ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার জন্য প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা সুধীন সেন। ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (আইবি) নিয়মিত নজর রাখতো কমিউনিস্ট পার্টির চিঠিপত্র এবং ডাকযোগে স্বাধীনতা পত্রিকায় আসা প্রতিবেদনের উপরে। পোস্ট অফিসে আটক চিঠিপত্র, প্রতিবেদনগুলি খুলে পড়া হতো। বহু চিঠি বাজেয়াপ্ত করা হতো। বাকি চিঠিপত্রের অনুলিখন করে আসলটি নির্ধারিত ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো। গুরুত্বের নিরিখে ইংরেজি অনুবাদ করে বাংলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের পাঠানো হতো আটক করা চিঠিপত্রের বিষয়বস্তু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কংগ্রেস শাসনেও এই পদ্ধতি বজায় ছিল। তাই স্বাধীনতার পরেও স্বাধীনতা পত্রিকার উপরে নজরদারি ছিলই। সেই সূত্রেই আটক হয়েছিল এইরকম অনেক চিঠিপত্র।
আই.বি ফাইলে থাকা এমনই কয়েকটি আটক চিঠির সূত্রে দেখে নেওয়া যায় ৭৮ বছর আগে হিন্দুত্ববাদীরা গান্ধীজীকে হত্যা করার পরে বাংলার নানা প্রান্তে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এমনই আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে ছিলেন অনিল ঘোষ। বাগবাজারের ১১এ, হরলাল মিত্র স্ট্রিট থেকে। ১২ ফেব্রুয়ারি লেখা চিঠি, যা ১৩ ফেব্রুয়ারি আটক করা হয় জিপিও-তে; ছত্রে ছত্রে ছিল ক্ষোভ। তিনি লিখছেন- ‘‘গতকল্য গান্ধীজীর চিতাভস্ম বিসর্জনের সময় আমি ব্যারাকপুরে গিয়েছিলাম। ক-এক লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়েছিল। বহু নেতার সমাবেশ হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হোমের কিছু পূর্ব্বে একটি ভদ্রলোক (বোধহয় কোন নেতা) মাইকের সামনে দাড়িয়ে জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, -আজ এই শোকের দিনে এখানে বহু দেশনেতা উপস্থিত আছেন, তার ভেতরে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জি অন্যতম। বক্তা এইটুকু বলে আর কোনো নেতার নাম বললেন না। এতে মনে হয় আজকের দিনেও কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক নেতাদের সাধারণের কাছে দেশপ্রেমিক বলে প্রচার করতে চান। কিন্তু কেন? এইটাই আমরা নেতাদের কাছে খোলাখুলি জানতে চাই, যে শ্যামাপ্রসাদের সাথে গডসের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল, তাকে আমাদের নেতা বলে আমি কেন বহু লোকই স্বীকার করবেনা। ... সাম্প্রদায়ীক প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানই বেআইনী ঘোষণা করা হল কিন্তু হিন্দু মহাসভা বা হিন্দুস্থান ন্যাশনাল গার্ডকে অক্ষত রাখা হ’ল। কিন্তু কেন?’’
ফেরা যাক মুর্শিদাবাদ থেকে পাঠানো সুধীন সেনের প্রতিবেদনে। তিনি লিখছেন- ‘‘স্থানীয় হিন্দু মহাসভার নেতা শক্তিপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রমথ রঞ্জন সরকার গান্ধীজির মৃত্যু সংবাদ পাইবার পর কংগ্রেস সম্পাদক শ্রী ভূতনাথ সরকার ও অন্যান্য বহু ভদ্রলোকের সমক্ষে বলেন, ‘‘গান্ধীজি মরিয়াছেন, এখন যদি দেশের কল্যাণ হয়।’’ এরপরে সুধীন সেন লিখেছেন- ‘‘হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি হওয়ার পর উক্ত প্রমথবাবু বর্তমানে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছেন।’’ প্রতিবেদনটির অন্য অংশে আরএসএসের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। সেখানে বলা হয়েছে, সম্প্রতি শক্তিপুরে আরএসএসের উদ্যোগে ভবানী পুজো হয়। এরপর আরএসএসের লোকেরা সেই ভবানী মূর্তি নিয়ে মসজিদের পাশ দিয়ে শোভাযাত্রা করে অশান্তির চেষ্টা করে। মুসলিমরা আপত্তি করলে মূর্তিটি মসজিদের পাশে ফেলে রেখে থানায় গিয়ে অভিযোগ করে। সুধীন সেন লিখছেন, ‘‘মুসলমান গ্রামবাসীরা সারারাত জাগিয়া মূর্তিটিকে রক্ষা করে এবং ভোরবেলায় কংগ্রেস সেবাদলের নিকট গিয়া মূর্ত্তিটির দায়িত্ব তাহাদের অর্পণ করে।’’ প্রতিবেদনের শেষে সুধীন সেন জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত পুলিশ আরএসএসের স্থানীয় পাণ্ডা বিমলকান্তি মৈত্র এবং মহারাষ্ট্রীয় সংগঠক কালীদাস সারলেকরকে গ্রেপ্তার করে।
জলপাইগুড়ি জেলার দোমহনী থেকে ৮ই ডেকার্স লেনে ‘স্বাধীনতা’ সম্পাদককে চিঠি দিয়েছিলেন বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। এই চিঠিটিও ১৩ ফেব্রুয়ারি কলকাতা জিপিও-তে আটক করা হয়। চিঠিটির অনুলেখন করা হয়। অনুলেখনগুলি অধিকাংশ সময়েই পেন্সিলে করা হতো। থাকতো কার্বন কপিও। এই চিঠিটির অনুলেখনও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মী করেছিলেন পেন্সিলেই। চিঠিতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য লিখেছেন, সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না করে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকার চালে ভুল করছে। একদিন এই সাম্প্রদায়িক শক্তিই সরকারকে গিলে খাবে। তিনি লিখছেন, ‘‘বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গান্ধীজীর মৃত্যুই সব চেয়ে বেশি আন্দোলনের সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ সাম্প্রদায়ীকতার বিরুদ্ধে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বর্তমান বাংলা (পশ্চিম) মন্ত্রীসভা ঐ সব সাম্প্রদায়িক দলের বিরুদ্ধে কোন কিছু না বলে নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ করলেন স্বাধীনতার উপর! বাঃ কি নিরাপত্তা!” চিঠি থেকে স্পষ্ট হয়, কমিউনিস্ট দৈনিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সেই সময়ে কোনো পদক্ষেপ করেছিল সরকার। চিঠিতে সেই কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
স্বাধীনতা ও দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলা থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলিতে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা থাকতো। চিঠিতে সেই কথাও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন দোমহনীর এই পাঠক। তিনি লিখছেন- ‘‘... যখন হিন্দু মহাসভা কংগ্রেসকে বধ করতে চায় আর লীগ জাতীয়তাবাদ অস্বীকার করে এখনও মুসলমানদের মধ্যে বিষ ছড়ায়, তখন তারা রেহাই পায় কেন? লীগের সাম্প্রদায়ীকতাবাদী আজাদ, পুঁজিবাদীর উচ্ছিষ্ঠভোজী হিন্দুস্থান, জাতীয়তাবাদের মুখোস পড়া আনন্দবাজার, বসুমতী, ভারত, এরা বিগত দু’বৎসরে একদিনও কি সাম্প্রদায়ীকতার বিষ ছড়ায়নি? ... তবে এরা আজও বহাল তবিয়তে আসর মাৎ করেন কোন সাহসে? এদের মেজাজ বিগড়নোর তাগদ তথাকথিত দেশপ্রেমিক সরকারের নাই।’’
গান্ধীজীর হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা পত্রিকায় পাঠানো চিঠি তিনটি ঘটনাচক্রে রাজ্যের উত্তর-মধ্য এবং দক্ষিণ অংশের। ফলে চিঠিগুলির বক্তব্য থেকে গোটা রাজ্যের মনোভাবটাই সামনে আসে। চিঠি, প্রতিবেদনে সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গের জনমানসের মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। হিন্দুত্ববাদীদের বাড়বাড়ন্তের যে ধরন জানা যায়, তার সঙ্গে আজকের সাদৃশ্য খুবই বেশি, তেমনই তা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতার কথাও আছে। অনেক ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে সরকারের সমঝোতার কথাই বলেছেন লেখকরা। সেটার সঙ্গেও বর্তমান সময়ের অমিল রয়েছে বলা যায় না। তেমনই সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের সীমাহীন ঘৃণার প্রকাশও আছে- গ্রাম, শহর নির্বিশেষে। রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান যেমন স্পষ্ট হয়, সংবাদপত্রগুলির ভূমিকাও সামনে চলে আসে চিঠিগুলি থেকে। স্পষ্ট হয় কমিউনিস্ট পার্টি এবং পার্টির দৈনিক ‘স্বাধীনতা’র অসবস্থান।
‘স্বাধীনতা’র ওই দিনের-মাসের কাগজ বর্তমানে অমিল। সেক্ষেত্রে তখনকার পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এই দৃঢ় মনোভাব জানার একটি সূত্র পুলিশের আটক করা চিঠিগুলি। যা এতদিন পরেও সমান গুরুত্বপূর্ণ, গান্ধী হত্যার দিনে স্মরণযোগ্যও বটে।
Assassination of Mahatma Gandhi
গান্ধী হত্যা ও আটক করা কয়েকটি চিঠিপত্র
×
Comments :0