সাধারণত শিল্পপতি তথা মালিক পক্ষ, নব্য উদার তথা বাজার অর্থনীতির মুখপাত্ররা এবং শিল্প-বাণিজ্য মহলের মুখে যে কথাগুলি সব সময় শোনা যায় সেই কথাগুলিই আরও জোরালো ও স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। গৃহ সহায়িকাদের কাজের শর্ত, ন্যূনতম মজুরি ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক মামলা প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সরাসরি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন নিয়ে বিস্ময়করভাবে এমন মন্তব্য করেন যা শ্রমিক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাংবিধানিক অধিকারকেই অস্বীকার করে। সংবিধানের রক্ষক বা অভিভাবকের দায়িত্ব যে সুপ্রিম কোর্টের উপর বর্তায় সেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান কীভাবে বলতে পারেন ট্রেড ইউনিয়নের দাপটে নাকি দেশের সব ঐতিহ্যবাহী শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে! আরও বলেছেন, দেশের শিল্পোন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী প্রধানত ইউনিয়ন নেতারা। শ্রমিকরা নাকি কোনও কাজ করতে চায় না। কোন নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য সরকারি তথ্য পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে সূর্যকান্ত এমন পর্যবেক্ষণ হাজির করেছেন তা জানা যায়নি। তবে এমন কোনও সরকারি রিপোর্ট বা তথ্য সাধারণের পরিসরে নেই যেখানে প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সমর্থন মিলতে পারে। বরং এমন তথ্যেরই ছড়াছড়ি যেখানে উল্টোটাই সত্য। ধরা যাক, কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম ব্যুরোর প্রতিবেদন ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস, ক্লোজার্স, রিট্রেঞ্চমেন্ট অ্যান্ড লে অফ ইন ইন্ডিয়া’র কথা। তাতে দেখা যাচ্ছে গত ১৭ বছরে শ্রম বিরোধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০০৬ সালে দেশে শ্রম বিরোধের সংখ্যা ছিল ৪৩০টি। ২০২৩ সালে কমে হয়েছে মাত্র ৩০টি। তেমনি শিল্প বিরোধ অর্থাৎ শ্রমিক-মালিক বিরোধের দায় একা শ্রমিকের উপর চাপানো যায় না। শ্রমিকরা শখ করে আন্দোলন করে না। আইন অনুযায়ী অধিকার এবং সুযোগ সুবিধা থেকে মালিক বঞ্চিত করলে তবেই তারা আন্দোলন করে প্রাপ্য আদায় করার জন্য। দেশে এমন কোনও শ্রম বিরোধের ঘটনার নজির নেই যেখানে মালিক আইন মোতাবেক শ্রমিকদের দেয় ও প্রাপ্য মেটানোর পরও শ্রমিকরা বিরোধ সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া ছোট, মাঝারি, ক্ষুদ্র, বড় ও বৃহৎ যত শিল্প-বাণিজ্য সংস্থা আছে তার বেশির ভাগেই শ্রমিকদের কোনও ইউনিয়ন নেই। যেখানে ইউনিয়ন আছে সেখানেও মোট শ্রমিকের অল্প অংশই ইউনিয়নে সংগঠিত। সিংহভাগ সংস্থাতেই ইউনিয়ন বা প্রায় অনুপস্থিত। এমতাবস্থায় শ্রমিক আন্দোলনের জেরে শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা শিল্পায়ন থমকে যাচ্ছে এমনটা অবাস্তব ও অযৌক্তিক কষ্ট কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রধান বিচারপতি গৃহসহায়িকাদের শোষণ ও বঞ্চনা মেনে নিয়েছেন। তারপর এই শোষণ-বঞ্চনা নিরসনের জন্য একটি আইনি কাঠামো প্রণয়নের মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ শ্রমিকরা শোষিত হোক, বঞ্চিত হোক, নিপীড়িত হোক তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু তার প্রতিকারে সরকারকে আইনি কাঠামো তৈরিতে নির্দেশ দিতে প্রধান বিচারপতির প্রবল আপত্তি। এরপর যদি তারা আন্দোলন করে ন্যায্য অধিকার দাবি করে, সংগঠিত হয়, ধর্মঘট করে তখন গেল গেল রব উঠবে। সব দায় চাপানো হবে শ্রমিকদের ওপর।
Editorial
কার মুখে কার কথা
×
Comments :0