East Kolkata Wetland

জলাভূমি ধ্বংস— এক অশনি সংকেত

বিশেষ বিভাগ ফিচার পাতা

বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়, রাহুল রায়


অতি সম্প্রতি আনন্দপুরে জতুগৃহ কাণ্ডের পর পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী তাঁর অধীনস্ত প্রশাসনের কাজকর্মে যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে তোপ দেগেছেন। প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণে রাজ্যজুড়ে জলাভূমি বেআইনিভাবে বোজানো হচ্ছে বলে ক্ষোভ জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, এসব অপকর্ম চলবে না। অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে আইনমাফিক, তা সে যত বড় মাতব্বরই হোক না কেন। এমনকি তাঁর দলের কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও। মুখ্যমন্ত্রীর এই ক্ষোভ সুনাগরিকদের কাছে অত্যন্ত স্বস্তির ও সাধুবাদ যোগ্য। এই প্রশাসনিক শুদ্ধিকরণের প্রচেষ্টার মধ্যেই কলকাতা তথা রাজ্যের নানান অঞ্চলে জলাভূমি বোজানো কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক মদত এবং প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা ছাড়া জলাভূমি বোজানো কিছুতেই সম্ভবপর নয়।

*পূর্ব কলকাতা জলাভূমি সংরক্ষণ*

পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার গড়ার জন্য এক অনাবাসীকে রাজ্য সরকার ২২৭ একর জমি বরাদ্দ করে। এর প্রতিবাদে ১৯৯২ সালে পাবলিক নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা  কলকাতা উচ্চ আদালতে এক জনস্বার্থ মামলা করলে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাননীয় বিচারপতি  উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রায় দিয়েছিলেন, জলাভূমি যত ছোটই হোক, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে তার গুরুত্ব অসীম। পূর্ব কলকাতার জলাভূমির চরিত্র যাতে বদলে না ফেলা হয়, তার জন্য রাজ্য সরকারকে তিনি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের আদেশ দেন। এর পর ২১ ডিসেম্বর, ১৯৯৪, কলকাতা উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারকদ্বয় ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও  অশোক চক্রবর্তী তাঁদের আদেশে বলেন, জলাশয় ছোট হলেও তাকে কখনোই ভরাট করা চলবে না। রাজ্য সরকার এসব আদেশ মেনে ঘোষণা করলেন কোনও জলাভূমি বোজানোর চেষ্টা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২০০২ সালের ১৯ আগস্ট পূর্ব কলকাতা জলাভূমি আন্তর্জাতিক রামসার কনভেনশন অনুযায়ী রামসার অঞ্চল (রামসার সংখ্যা ১২০৮) হিসাবে স্বীকৃত হয়। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৩১ মার্চ ২০০৬ তারিখে এই জলাভূমির পরিচালন ও সংরক্ষণের জন্য ইকেডাব্লিউএমএ গঠন করে ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (সংরক্ষণ ও পরিচালন) আইন’ চালু করেন।

*তিলোত্তমা জলাভূমির যে সব পরিষেবা পায়*

পূর্ব কলকাতা জলাভূমি পৃথিবীতে নাগরিক বর্জ্যের বৃহত্তম প্রাকৃতিক অনাময় (রিকভারি) ব্যবস্থা। এই জলাভূমির ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে হওয়ায় সমস্ত নাগরিক বর্জ্য এবং বৃষ্টির জল এসে (বা কখনো পাম্প করে) এই জলায় পড়ে। এই জলাভূমির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বেশ কিছু অগভীর পুকুর, যেখানে জলাভূমিতে বসবাসকারী গ্রামবাসীরা মাছ চাষ করে। এসব জলাভূমিতে সূর্যের আলোয় প্রাকৃতিকভাবে মহানগরীর বর্জ্যের শোধন চলে একেবারে বিনি পয়সায়, টাকার অঙ্কে বছরে যার মূল্য প্রায় ৪৬৮ কোটি টাকা। জলাভূমির প্লাঙ্কটন মাছের প্রধান খাদ্য। মহানগর থেকে রোজ প্রায় ১০০০ লিটার বর্জ্য জল এই জলায় মিশে প্রাকৃতিকভাবে মাছের খাদ্যে পরিণত হয়। মহানগরবাসী বছরে প্রায় ২০,০০০ মিলিয়ন টন মাছ খাদ্য হিসাবে পায়। রাজ্য সরকারের হিসাবে বর্ষার নিকাশি জলে এবং মাছের ভেড়ির বর্জ্য জলে পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে বছরে প্রায় ৫০,০০০ মিলিয়ন টন শাকসবজি উৎপন্ন হয়। হতদরিদ্র হাজার পঞ্চাশেক মানুষ এসব মাছ, শাকসবজি ও ফুল চাষ করে মহানগরীর নানান বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে।

পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কার্বন সিঙ্ক রূপে মহানগরীর বায়ু দূষণ কমাতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই জলাভূমি বর্জ্য জলের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন স্বতন্ত্র রাখতে (সিকোয়েস্ট্রেশন) পারে। এতে বাতাসে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস মেশা কমে। পশ্চিমে হুগলী নদীতীর এবং পূর্বে অবস্থিত কুলটি গাঙের মধ্যবর্তী নিচু জায়গা মহানগরের জলধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই প্রাকৃতিক বাফারটি ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকেও শহরকে রক্ষা করে।

*বিপন্ন জলাভূমি ও জীববৈচিত্র*

রাজ্য সরকারি সংস্থা 'ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস্ ম্যানেজমেন্ট অথরিটি'-এর (ইকেডাব্লিউএমএ) তথ্য অনুযায়ী ২২০২৫′-২২°৩৫′ উত্তর অক্ষরেখা এবং ৮৮°২০′-৮৮°৩৫′ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার মধ্যে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অবস্থিত। এর আয়তন ১২,৫০০ হেক্টর। ১৯৯১-২০২১ সালে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির সামগ্রিক আয়তন ৩৫-৪০ শতাংশ কমেছে। রিমোট সেন্সিং মারফত প্রাপ্ত তথ্য এবং ক্ষেত্র-সমীক্ষায় ধরা পড়েছে মূলত তিনটি কারণ পূর্ব কলকাতা জলাভূমির আয়তন হ্রাসের জন্য দায়ী। এগুলি হলো- রিয়েল এস্টেট প্রোমোটার/ডেভেলপারদের জলাভূমি দখল, ইউট্রোফিকেশন (জলাশয়ে শ্যাওলা ও প্লাঙ্কটন-এর অত্যধিক বৃদ্ধি) এবং জলা অঞ্চলকে মাছের ভেড়িতে পরিণত করা। ইকেডাব্লিউএমএ’র প্রতিবেদন (ফেব্রুয়ারি, ২০২১) 'ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান অব ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস, ২০২১-২৬' থেকে জানা যাচ্ছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জলাভূমির চরিত্র সবচেয়ে বেশি বদলে ফেলা হয়েছিল। ১৭০০ হেক্টর জলাভূমি বরাদ্দ হয়েছিল মাছের ভেড়ি গড়তে। জলা অঞ্চলে বাসস্থান গড়তে বরাদ্দ পরিমাণ ছিল ১০০০ হেক্টর। আর কঠিন বর্জ্য ডাঁই করে রাখার জায়গাটিও দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৯০ হেক্টর করা হয়।

ওই একই প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, ১৯৬৪-১৯৬৯ সালে জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া-র পাখির প্রথম ক্ষেত্র-সমীক্ষায় এই অঞ্চলে প্রায় ২৪৮টি প্রজাতির পাখি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বিগত ৩০ বছরে তা কমে গিয়ে কমবেশি ১৬২টি প্রজাতিতে দাঁড়িয়েছে। শিকারি পাখি সহ বেশ কিছু বড় আকারের পাখি, যেগুলি সাম্প্রতিক অতীতেও ছিল, সেগুলোকে এখন আর দেখা যায় না।

*প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা*

পশ্চিমবঙ্গে জলাভূমি বাঁচানোর জন্য কেবল ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (সংরক্ষণ ও পরিচালন) আইন, ২০০৬’ ছাড়াও বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে, যেমন- ‘জল দূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৭৪’, ‘পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬’, ‘জীববৈচিত্র আইন, ২০০২’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ জলাভূমি এবং জলাশয় সংরক্ষণ আইন, ২০১২’। এতগুলি আইনি রক্ষাকবচ থাকা সত্ত্বেও পূর্ব কলকাতার জলাভূমি বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণ থেকে অননুমোদিত বাণিজ্যিক কাজকর্ম (যেমন, বর্তমানে একটি রেডি-মিক্স প্লান্ট চলছে) সব কিছুই প্রশাসনের নাকের ডগায় খুল্লামখুল্লা চলছে। ইকেডাব্লিউএমএ’র ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে গত ১৫ বছরে এই জাতীয় অবৈধ কাজকর্মের বিরুদ্ধে ৩৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইনে জানতে চাওয়া এক নাগরিকের চিঠির উত্তরে রাজ্য পরিবেশ দপ্তর জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত জলাভূমি সংক্রান্ত আইন ভাঙায় ৪৯৩টি ফৌজদারি মামলা নানান থানায় দায়ের হয়েছে। ইকেডাব্লিউএমএ’র ওয়েবসাইট থেকে হাতে গোনা মাত্র দুইটি অবৈধ নির্মাণ ভেঙে ফেলার আদেশের কথা জানা যাচ্ছে। বস্তুত গোটা পশ্চিমবঙ্গজুড়েই জলাভূমি ও জলাশয় বোজানো চলে আসছে। কখনোই এগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ বা সংস্কার করা হয় না। জলাভূমি বা জলাশয়ের চরিত্র বদলে যাচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য নির্দিষ্ট দপ্তর বা সংস্থা থাকলেও তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্বাক দর্শক হয়ে থাকে। 

*নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী*

তিনটি কারণ এই প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার পেছনে রয়েছে বলে মনে করা হয়— রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, কম মাত্রায় গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং বাজারি শক্তির দাপট। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবটি ২০২৪-২৫ সালের রাজ্য বাজেটের দিকে তাকালেই বেশ বোঝা যায়, যখন পরিবেশ দপ্তরের জন্য বরাদ্দ হয় মোট বাজেটের মাত্র ০.০০০৩ শতাংশ অর্থ। এত কম বরাদ্দে কোন পরিচালন সংস্থা কীভাবে নাগাড়ে নজরদারি করে জলাভূমি দখল রুখবে, তা বোধগম্য নয়। আজও পূর্ব কলকাতা জলাভূমির সীমানা পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি। জলাভূমি-শিকারিদের কাছে এটি পৌষ মাস হয়ে দেখা দিচ্ছে। সরকার বা প্রশাসন থেকে স্থানীয় গোষ্ঠীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে খুব একটা তৎপরতাও নজরে আসে না।

*অতঃকিম্‌*

জলাভূমি এক অত্যন্ত উৎপাদনশীল বাস্তুতন্ত্র। জলাভূমির অন্যতম প্রধান কাজ বর্জ্য জলে মিশে থাকা ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানগুলিকে সূর্যের আলোর সাহায্যে নষ্ট করে সেই জলকে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। জলাভূমি নানান সরীসৃপ, অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও জল-নির্ভর পাখিদের আবাসস্থল। এক বর্গমিটার পরিমাণ জলাভূমি জলজ প্রাণীদের প্রয়োজন মিটিয়েও প্রতি মিনিটে ২৪ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করে। উল্লেখ্য,একজন মানুষের বাঁচার জন্য প্রতি মিনিটে অক্সিজেনের প্রয়োজন ২.১ গ্রাম। 
পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জলাভূমি রক্ষার ব্যাপারে রাজ্য সরকারকে কলকাতা উচ্চ আদালত ২০০৫ সালের আদেশনামায় একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিতে বলেন। কিন্তু সেরকম কোনও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের জানা নেই। দেশের মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্বের মধ্যে জলাভূমি রক্ষা একটি গুরুদায়িত্ব। মহানগরীর সমস্ত রকম অশোধিত তরল বর্জ্যকে কলকাতার বৃক্ক স্বরূপ পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নীলকণ্ঠ হয়ে ধারণ ও শোধন করে। একটি মানুষের বৃক্ক চলে গেলে তার পরিণতি সম্ভবত কারোর অজানা নয়। পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি ক্রমান্বয়ে হত্যা মানেই তিল তিল করে তিলোত্তমার মৃত্যুকেই আহ্বান করা।

 

Comments :0

Login to leave a comment