গল্প
মুক্তধারা
-------------------------------
ঘূর্ণাবর্ত
-------------------------------
রাহুল চট্টোপাধ্যায়
বাইরে সেদিন প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টি।সকাল থেকেই খুব খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে বেরিয়েছিল রতন। চারিদিক অন্ধকার।রতনের হাতে ধরা ছাতাটা বারবার উল্টে যাচ্ছে। তবু তো বেরোতে হবেই। ইন্টারভিউ।
কাজটা ওকে পেতেই হবে। খগেন আর পেরে উঠছে না। একটা চায়ের দোকান ভর করে সারাটা জীবনের সংগ্ৰাম। রতনের মা চলে যাওয়া পর থেকে ছেলেকে বড়ো করে তোলা, পড়াশোনা শেখানো সব একা করতে হয়েছে।এই লড়াই জিততে হবে,এই ধনুকভাঙা পণ করে আজ যেন কিছুটা হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে তার।কথায় কথায় মাঝে মাঝে এই ক্লান্তি বেরিয়ে আসে খগেনের।রতন আঁচ পায়। কষ্ট হয় বাবার জন্য। মনে হয় এখন তো বাবাকে বিশ্রাম দেওয়ার সময়।
সে বছর ইন্টারভিউ দিল রতন। গ্ৰামের ছেলে। বুকটা ঢিপ ঢিপ করছিল। ইংরেজি বলার অভ্যেস না থাকা ,কথার জড়তা নিয়েই অতগুলো মানুষের মুখোমুখি হল সে। তবে সব ভাবনা সরিয়ে সে ইন্টারভিউ ভালো দিল। চাকরিটা পেয়েও গেল।খুশির হাওয়া বইল সংসারে। খগেন দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটু স্বস্তি নিয়ে। নীরবে রতনের মায়ের কথা মনে করলো। দুফোঁটা জল গড়িয়ে এর গাল বেয়ে।
রতনের অফিসটা বড়ো ।ওর। বয়সী অনেক ছেলেমেয়ে কাজ করে চলেছে কম্পিউটার নিয়ে। বারো ঘন্টা নিষ্পলক কাজ করার পর যখন মাসের টাকাটা বাবার হাতে দিতে তখন এক গভীর শান্তি হত তার। খাটুনিকে খাটুনি বলে মনে হতো না।
কিন্তু সময় একভাবে চলে না। হঠাৎ করেই কোথা থেকে যুদ্ধ এসে হাজির হল। যুদ্ধের বাজারে সংকট অনিশ্চয়তা
চাকরিটাকে অনিশ্চিত করে দিল। ছাঁটাই হল রতনের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে।
রতন আবার বেকার হল। চোখের সামনে ভাসতে থাকা বাবার মুখ,সংসার এক লহমায় তাকে নিরাশ্রয় করে তুললো।কি বলবে বাবাকে! কিভাবে আবার শুরু করবে এই ভাবনা তাকে অস্থির করে তুলতে লাগলো।
রতন বাড়ি ফিরে এল। বাবার সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়াল,চোখ থেকে অজস্র জলের ফোঁটা ঝরতে লাগলো। খগেন এগিয়ে এসে ছেলের হাতদুটো ধরল।তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে চৌকির ওপর বসিয়ে,বললো-
'রতন, কাঁদতে নেই, আমাদের ঠিক চলে যাবে। আমি চায়ের দোকান চালিয়ে যাব।তোর লড়াই চলুক। লড়াই ছাড়া বাঁচার কোন পথ নেই। একদিন তুই জিতবি,দেখিস'
রতন জলভরা চোখে নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
Comments :0