গল্প
নতুনপাতা
----------------
নিম-বেগুন
----------------
সৌরীশ মিশ্র
রবিবারের দুপুর। প্রায় একটা বাজতে যায়। এই চৌধুরি বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজনের পর্ব শুরু হতে চলেছে। ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে এই পরিবারের তিন প্রজন্ম- এই বাড়ির কর্তা, ষাটোর্ধ্ব শরদিন্দুবাবু, তাঁর ছেলে সাত্যকি আর সাত্যকির বছর দশেকের মেয়ে ঝিল। ডাইনিং টেবিলে ইতিমধ্যেই খাবার সব সাজিয়ে ফেলেছেন এই বাড়ির বৌমা অর্থাৎ সাত্যকির স্ত্রী পরমা।
শরদিন্দুবাবু কতোবার বলেছেন পুত্রবধূকে, ওদের তিনজনের সাথেই খেয়ে নিতে। কিন্তু, পরমা খান না। পরমা দেখেছেন, নিজেও খেতে বসে পড়লে ভালো করে, যত্ন করে খাওয়ানো যায় না। তাই, ওরা তিনজন খেয়ে নিলে, তারপর নিজে খেতে বসেন পরমা।
থালায়-থালায়, ভাত দেওয়া হয়ে গেছিল পরমার। এবার ডাইনিং টেবিলটা থেকে একটা ছোটো বাটি তুলে নিলেন তিনি। তারপর সেটা থেকে হাতা দিয়ে একটা পদ দিলেন ভাতের একপাশটায়।
ঝিল একমনে দেখছিল, মা কি পদ দিচ্ছে পাতে। আর এখন তার থালায় যেটা দিয়েছে, সেটা এইবার দেখতে পেয়েই সে আহ্লাদিত গলায় বলেই উঠল, "নিম-বেগুন! মা, নিম-বেগুন করেছো! আমাদের গাছের নিম পাতা, না মা?"
আসলে, তেতো খেতে খুব পছন্দ করে ঝিল। আর, নিম-বেগুন তো তেতো ডিশগুলোর মধ্যে ওর মোস্ট মোস্ট ফেভারিট।
"হ্যাঁ রে। আমাদের গাছেরই নিমপাতা।" বলেন পরমা মেয়েকে।
মায়ের কথা শুনতে-শুনতেই একটু খানি নিম-বেগুন থালা থেকে নিয়ে শুধু-শুধুই মুখে ফেলে টেস্ট করে নেয় ঝিল। আর মুখে দিয়েই বলে ওঠে সে, "দারুণ হয়েছে মা।"
মেয়ের কথা শুনে ঠোঁটের কোণে একটু হেসে পরমা মেয়েকে বললেন, "নে, এবার ভাত দিয়ে মেখে খা।"
"দাঁড়াও মা, এসে খাচ্ছি। থ্যাংক ইউ-টা তো বলে আসি।" বলতে বলতেই চেয়ার থেকে উঠে একছুট লাগায় ছাদে যাওয়ার সিঁড়ির দিকে ঝিল।
ঐ ডাইনিং রুমে উপস্থিত বাকি তিনজনই ভালো করে জানেন যে কাকে থ্যাংক ইউ বলতে ছুটল ঝিল, তাই কেউ আর বাধা দিলেন না ওকে তাতে।
এদিকে, ইতিমধ্যেই এক ছুটে ঝিল সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছে ওদের বাড়ির ছাদে। ছাদে বেশ রোদ্দুর। ক'দিন হোলো গরম পড়েছে ভালোই। ছাদে এসেই এক দৌড়ে ঝিল চলে এল ছাদের পশ্চিম কোণটায়। সারা ছাদে রোদ্দুর থাকলেও এই দিকটায় এখনও বেশ ছায়া। আর সেটা ঝিলদের বাড়ির পাঁচিলের ভিতর যে বিশাল নিমগাছটা আছে তার জন্য। সেটারই যে ছায়া এসে পড়ছে এখন ছাদের ঐ অংশটায়।
ঝিল নিমগাছটার ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াল। কি ঠাণ্ডা! এতো চড়া রোদ্দুর থেকে এসে নিমগাছটার ছায়াতে আসতেই প্রাণটা পুরো যেন জুড়িয়ে গেল ঝিলের।
ঝিল এবার ওর ডানহাতটা বাড়িয়ে, ধরল নিমগাছটার একটা ডাল। ঐ ডালটা ছাদের প্যারাপিট ক্রস করে ছাদের মধ্যে এসে পড়েছে কিছুটা। ডালটা ধরে ওতে একটু হাত বুলিয়ে দিল ঝিল। আর ফিসফিসিয়ে বলল, "থ্যাংক ইউ, নিমগাছ। থ্যাংক ইউ সো মাচ।"
ঠিক তখনই, একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। আর তাতেই, নিমগাছটার একটা কচি পাতায় ভরা বড়ডাল, যেটাও ঝিলদের এই ছাদের দিকেই এগিয়ে এসেছে, সেটা হাওয়ায় দুলে উঠে আলতো করে ছুঁয়ে গেল ঝিলের মাথাটা।
ঝিল তো বড্ড ছোটো তাই ও বুঝতে পারলো না যে, সে নিমগাছটাকে থ্যাংক ইউ বলেছে বলে খুশি হয়েছে খুব খুব নিমগাছটা। তাই ঐভাবে ঝিলের মাথায় সস্নেহে ওর নরম-নরম কচি পাতায় ভরা ডালটা বুলিয়ে দিয়ে ঝিলকে আদর করে দিল সে।
--------------------------------
Comments :0