অনিন্দিতা দত্ত : শিলিগুড়ি
ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়। আইন যেখানে অন্যায়ের পক্ষে থাকে সেখানে প্রতিরোধই একমাত্র অস্ত্র। সেই প্রতিরোধ গড়তে পারে বামপন্থাই। অধিকারের লড়াই কোনও ভিক্ষা নয়। নতুন শক্তিতে বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটছে। বাংলাকে বাঁচাতে হলে সমস্ত বামপন্থীদের এককাট্টা হতে হবে।
শনিবার দার্জিলিঙ জেলার বামপন্থী দলসমূহের আহ্বানে শিলিগুড়ি টিকিয়াপাড়া ময়দানে সমাবেশে এই আহ্বান জানান সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
সেলিম বলেন, বামপন্থী দলসমূহের বাইরেও বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত ব্যক্তি, গোষ্ঠীসমূহকেও এককাট্টা হতে হবে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিকায় লাল ঝান্ডার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও ভরসা বাড়ছে। বামপন্থীদের লড়াই আন্দোলনকে আরও প্রসারিত করতে হবে। এদিন জনসভায় সভাপতিত্ব করেন সমন পাঠক।
গত ৪ অক্টোবর উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের পুর্নবাসন ও বাড়ি তৈরির কাজ শেষ করা হয়। এদিন সভা মঞ্চ থেকে থারবু চা বাগানের বাসিন্দা রানু রাই, অনু তামাঙ ও রতন রাইদের হাতে বাড়ির চাবি তুলে দেন সেলিম।
মহম্মদ সেলিম বলেন, গোটা বিশ্বে রাজনীতি হচ্ছে লুট ও মুনাফা, দখলদারির জন্য। আমাদের লড়াই পাড়া, মহল্লা, গ্রাম, শহর, জেলা, পঞ্চায়েত সহ রাজ্যের যে কোনও প্রান্তের লুটেরাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধের প্রভাবে এখানে গ্যাসের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। গ্যাস নিয়ে কালোবাজারি হচ্ছে। হোটেল, অটো রিক্সা, রান্না সব বন্ধ হবার উপক্রম। বিজেপি রাজ্য মহারাষ্ট্রে মিড ডে মিল রান্না বন্ধ হয়ে গেছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আকালের কথা তুলে ধরেন তিনি। সেলিম বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, যাঁকে এখন বিজেপি নেতা বানায়, তিনি ছিলেন সে সময় খাদ্যমন্ত্রী। আর সেই সময়েই বাংলায় সব চেয়ে বেশি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গিয়েছিলেন। মজুতদারি, কালোবাজারি বেড়ে গিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়।
বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু মুসলমান। সেখানে মৌলবাদী জামাত ইসলামকে ব্যবহার করে সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি করে। সেখানে বামপন্থীরা সেই মৌলবাদের বিরুদ্ধে। ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এখানে ফ্যাসিবাদকে কায়েমের জন্য ধর্মের নামে মৌলবাদকে ব্যবহার করে বিজেপি-আরএসএস। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে শেষ করতে চায়। সেলিম ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিরোধিতায় বলেন যে রাজনীতি হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, স্কুল, কলেজ হাসপাতাল, গণপরিবহণ, ট্রেনের জন্য। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, চা বাগান সর্বত্রই লুটের রাজত্ব চলছে। আর পরিবেশ রক্ষার আইন পালটে দিয়েছে মোদী সরকার। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
সেলিম বলেন, কোচবিহার থেকে হুগলী, বর্ধমান, মেদিনীপুর পর্যন্ত ফসলের দাম পাচ্ছেন না কৃষক। চাষ করার জন্য সার, বীজের দাম বাড়ছে। সারের কালোবাজারি হচ্ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহণের খরচ বাড়ছে। বামফ্রন্টের সময়ে পঞ্চায়েতের মধ্যে দিয়ে ভালো বীজ, মিনিকিটের ব্যবস্থা হয়েছিলো। এখন সব উঠে গেছে। এখন সব মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানি। এতো সবের পরেও আলু চাষে যা খরচ হয় সেই দাম পাচ্ছেন না।
মোদীর রামমন্দির আর মমতার জগন্নাথ মন্দির-মহাকাল মন্দির-দুর্গাঙ্গনের ঘোষণার উল্লেখ করেন করেন সেলিম। তিনি বলেন, বিজেপি ধর্মের নামে হোলসেল ব্যবসা করছে। মল খুলেছে। আর তৃণমূল ছোট ছোট দোকান খুলেছে। তাতেও হয়নি, তাই হুমায়ুন কবীর বললেন বাবরি মসজিদ করব। সেলিম ব্যাখ্যা করেন যে আপত্তি ধর্ম বা ধর্মস্থান নিয়ে নয়। ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে ভাগাভাগিতে।
সেলিম বলেন, ধর্মের পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে যাতে ভাগ করা না হয়। কমরেড জ্যোতি বসু বলেছিলেন, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মেলাবেন না। কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন, আমাদের রাজ্যে কেউ যদি ধর্মের নামে উন্মাদনা ও দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করে তাহলে মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন আরএসপি’র বিনয় চক্রবর্তী, সিপিআই’র অনিমেষ ব্যানার্জি, সিপিআই(এম-এল)’র অভিজিৎ মজুমদার ও ফরওয়ার্ড ব্লকের অনিরুদ্ধ বসু। উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতা অসোক ভট্টাচার্য, জীবেশ সরকার। ছিলেন সিপিআই(এম) নেতা গৌতম ঘোষ, নুরুল ইসলাম, দিলীপ সিং, জয় চক্রবর্তী, ঝরেন রায় প্রমুখ।
এদিনের সমাবেশে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েকটি মিছিল সভাস্থলে আসে। সভার শুরুতে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের উত্তরধ্বনী শাখার শিল্পীরা।
Comments :0