মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতের কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের কোন ক্ষতি হবে না বলে ফের একবার দাবি করলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল।
তিনি বলেন, আমেরিকার সঙ্গে নতুন এই বাণিজ্য চুক্তির ফলে ভারতীয় কৃষক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প যেমন সুরক্ষিত থাকবে, তেমনই মার্কিন বাজারের দরজা খুলে যাবে বহু ভারতীয় কৃষিপণ্যের জন্য।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই চুক্তিতে চূড়ান্ত সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শনিবার অন্তর্বর্তীকালীন এই বাণিজ্য রূপরেখা ঘোষণার পর পীযূষ গোয়েল জানান, ভারতের স্বার্থে বেশ কিছু রেড লাইন বা কঠোর অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। চাল, গম, ভুট্টা এবং দুগ্ধজাত পণ্যের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে কোন ছাড় দেওয়া হয়নি। যে সমস্ত পণ্যে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ সেগুলোকে এই চুক্তির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ভারতের বাজারের দরজা আমেরিকার জন্য খোলা হয়েছে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে, যেমন উন্নতমানের ওয়াইন ও স্পিরিট।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে দীর্ঘ এক বছরের আলোচনার পর এই সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে বলে গোয়েল দাবি করেছেন। গোয়েল জানান, ভারতের বেশ কিছু কৃষিপণ্য এখন থেকে শূন্য শতাংশ শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করবে। এর মধ্যে রয়েছে চা, কফি, মশলা এবং নারকেল তেল। এছাড়া কলা, আম, পেয়ারা, অ্যাভোকাডো, কিউই, পেঁপে, আনারস এবং মাশরুমের ক্ষেত্রেও কোন শুল্ক থাকবে না।
পীযূষ গোয়েল বলেন, ভারতের রপ্তানিকারকদের সামনে এখন প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন বাজার উন্মুক্ত হলো। তিনি জানান, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারি, ভারতের কৃষক, কারিগর বা ক্ষুদ্র শিল্প মালিকদের কোন ক্ষতি হবে না। বরং মার্কিন বাজারে আমাদের সহজ প্রবেশাধিকার কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করবে।’
শাসক পক্ষ এই চুক্তিকে 'মাস্টারস্ট্রোক' হিসেবে বর্ণনা করলেও, বিরোধীরা সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী মার্কিন চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছেন। তার কথায়, প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষকদের স্বার্থ এবং দেশের সম্মান বিক্রি করে দিয়েছেন।
সরকারি সূত্রে অবশ্য দাবি করা হয়েছে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত কেবল তার বাজারকেই সুরক্ষিত রাখেনি, বরং মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের অবাধ প্রবেশের পথ আরও প্রশস্ত করেছে। বিশেষত কৌশলগত জ্বালানি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানির বিষয়টি এই চুক্তির অন্যতম বড় দিক হতে চলেছে।
আমেরিকার অভ্যন্তরে বিভিন্ন মহলে এই চুক্তি নিয়ে যা আলোচনা সামনে আসছে, তাতে সন্দেহ আরও বাড়ছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ভারত আমেরিকার ওপর সমস্ত রকম শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত বাধা শূন্যে নামিয়ে আনবে। কৃষি, বিদ্যুত, বৈদ্যুতিন পণ্য, ভারী শিল্প থেকে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে চলেছে। খোদ আমেরিকার কৃষি সচিব ব্রুক রোলিন্সের সাম্প্রতিক মন্তব্যই এই আশঙ্কাকে কার্যত খোলসা করে তুলে ধরেছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর সোমবার রোলিন্স এক পোস্টে বলেন, ‘‘চুক্তি অনুযায়ী ভারতের বিশাল বাজারে মার্কিন কৃষিজ পণ্যের অবাধ বিচরণ সম্ভবপর হবে। আমেরিকার গ্রামাঞ্চলে বিপুল পরিমান নগদ অর্থায়ন হবে। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার ১৩০ কোটি ডলারের কৃষি ঘাটতি কমবে।
কৃষি ক্ষেত্রের মতো ভারতের খুচরো থেকে বৃহৎ উৎপাদনী ক্ষেত্র সার্বিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওয়াশিংটনের চাপের কাছে সমর্পণ করেই যে মোদী সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা কার্যত পরিষ্কার। ভারত নিজের বাজার সম্পূর্ণ খুলে দিলেও আমেরিকা তার দরজা বন্ধ রেখেছে। এই ধরণের বাণিজ্য সম্পর্ক মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং পুরোপুরি বৈষম্যমূলক। শুল্ক-মুক্ত মার্কিন পণ্য ভারতের বাজারে সুনামির মতো ঢুকে পড়লে, দেশীয় শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং কৃষকরা টিকে থাকতে পারবেন না। আমেরিকার সরকারি ভরতুকিপ্রাপ্ত শিল্প ভারতের এই সমস্ত ক্ষেত্রকে দেউলিয়া করে ছাড়বে।
দেশের কারখানা বন্ধ হলে বা উৎপাদন কমলে হাজার হাজার শ্রমিকের রুজি-রোজগার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে বিদেশি কর্পোরেট মুনাফা। এই ধাঁচের চুক্তির ধাক্কায় আমদানি বাড়বে এবং রপ্তানি তলানিতে গিয়ে ঠেকবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে চাপ পড়বে, ডলার পিছু টাকার দর আরও কমবে। ‘শূন্য বাধা’ মানে মার্কিন ‘টেক-জায়ান্ট’-দের হাতে ভারতের তথ্য, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন অর্থনীতির আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া। এর ফলে কোণঠাসা হবেন দেশীয় স্টার্টআপ ও উদ্ভাবকরা।
পাশাপাশি, আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখলে, এই অর্থনৈতিক শক্তি রাজনৈতিক চাপের রূপ নেবে— যা ভারতের স্বাধীন বিদেশ নীতিকে সীমাবদ্ধ করবে। শক্তিশালী ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ার বদলে, ভারত বিদেশি পণ্যের বিশাল বাজারে পরিণত হবে। এতে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। উৎপাদনের চেয়ে ভোগ প্রধান হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের শিল্প-নিষ্কাশনের পথ প্রশস্ত হবে।
India USA trade deal
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি কৃষি ক্ষেত্রে বিপদ তৈরি করবে না দাবি কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী
×
Comments :0