শমীক লাহিড়ী
২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২১টি অধ্যায়ে বিভক্ত প্রায় ২৪০০ পাতার এই চুক্তি ভারতীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে– এটাই ভারত সরকারের দাবি। সত্যিই কি তাই!
এই চুক্তি দেশের অর্থনীতির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বড় বিপদ তৈরি করবে— এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃষি, ওষুধ, ইস্পাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ওপর এই চুক্তির প্রভাব এবং ‘কার্বন কর’ (সিবিএএম), মেধাস্বত্ব আইন, ইইউ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক হ্রাসের ফলে দেশীয় শিল্পের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাই এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
ভারত-ইইউ’র মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ জিডিপি-কে এক বাজারের আওতায় নিয়ে আসবে একথা ঠিকই, তবে এই উন্মুক্ত বাজারের সুযোগ নিতে গিয়ে ভারতকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে– এই অভিযোগ উঠেছে।
অন্যায্য বাণিজ্যিক বাধা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশগত কঠোর নীতি বা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) নিঃসন্দেহে ভারতের ভারী শিল্প রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হতে চলেছে। এই নীতির কারণে ভারতীয় ইস্পাত, সিমেন্ট এবং অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের ওপর পরোক্ষভাবে ১৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশ অতিরিক্ত খরচের বোঝা চেপেছে। যেহেতু ভারতে ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও মূলত কয়লা-নির্ভর, তাই এই শিল্প থেকে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেশি। ইইউ’র তুলনায় বেশি মাত্রায় কার্বন নিঃসরণ করে এই জাতীয় শিল্পের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানোর ফলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় ইস্পাতের দাম অনেক বাড়ার ফলে ভারত বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এই বছর জানুয়ারি মাস থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিবিএএম পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করেছে। ভারত, রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল সহ জি-৭৭ জোটের ১৩৪টি দেশ 'বৈষম্যমূলক' এবং একতরফা আরোপিত 'বাণিজ্যিক বাধা' এই করের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, ইউরোপে আমদানিকৃত উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী পণ্য যেমন— ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট, সার, বিদ্যুৎ ইত্যাদি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বা 'সবুজ শুল্ক' আরোপ করা হয়েছে। এটিও ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপের বাজারে প্রবেশের জন্য ভারতীয় রপ্তানিকারকদের এখন কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে 'সার্টিফিকেট' কিনতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ভারতীয় ইস্পাতের ওপর ২০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত কর চাপতে পারে। চীন বা ইউরোপের উৎপাদনকারীরা যদি 'গ্রিন হাইড্রোজেন'-এর মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তবে ভারতীয় ইস্পাত অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। কারণ ভারতের ইস্পাত শিল্পের ৮০ শতাংশ এখনও কয়লা-ভিত্তিক 'ব্লাস্ট ফার্নেস' প্রযুক্তি ব্যবহার করে। ইউরোপীয় মানদণ্ডে পৌঁছাতে ভারতের ইস্পাত শিল্পক্ষেত্রে অন্তত ৫-১০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। ভারত সরকারের পক্ষে এই বিশাল অর্থ জোগান দেওয়া অসম্ভব এবং ২/৪টে বড় ইস্পাত কোম্পানিগুলো চেষ্টা করলেও ছোট কারখানাগুলোর পক্ষে এই ব্যয় বহন করা অসম্ভব। ফলে সেগুলো সবই বন্ধ হয়ে যাবে।
ভারতের মোট ইস্পাত রপ্তানির ২৬ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়াম রপ্তানির ২৫ শতাংশ ইউরোপে যায়। এই 'সবুজ সংরক্ষণবাদ'-এর ফলে রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং ইইউ’র ক্রেতারা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে ২০২৬-৩০ সালের মধ্যে ভারত বার্ষিক ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হারাতে পারে। ইউরোপের বাজারের লোকসান পুষিয়ে নিতে ভারতীয় কোম্পানিগুলো অভ্যন্তরীণ বাজারে ইস্পাতের দাম বাড়িয়ে দেবেই। এছাড়াও অনেক ছোট-মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই ও বেকারত্ব বাড়বে।
এছাড়াও সিবিএএম’র নিয়ম মেনে উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরের তথ্য ইউরোপকে দিতে হবে, যার ফলে ভারতের শিল্প গোপনীয়তা ও উৎপাদন কৌশলের তথ্য ফাঁসের ঝুঁকিও তৈরি হবে।
নিচের সারণি থেকে বোঝা যায় যে ইইউ’র কার্বন কর-এর কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর কত শতাংশ অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপছে।
পণ্য ভারতীয় রপ্তানির হার (ইইউ-তে) সিবিএএম’র কারণে সম্ভাব্য শুল্ক বৃদ্ধি
ইস্পাত ২৭ শতাংশ ২০ শতাংশ – ৩৫ শতাংশ
অ্যালুমিনিয়াম ২৫ শতাংশ ১৫ শতাংশ – ২৬ শতাংশ
সিমেন্ট ৫ শতাংশ ৩০ শতাংশ – ৪০ শতাংশ
জেনেরিক ওষুধ শিল্পে আঘাত
ভারতকে বলা হয় ‘বিশ্বের ওষুধের দোকান’। কারণ এদেশের জেনেরিক ওষুধ শিল্প একাই বিশ্বের ২০ শতাংশ জেনেরিক ওষুধের চাহিদা পূরণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের উদ্ভাবক কোম্পানিগুলো যেমন, রোশ, সানোফি, বেয়ার ইত্যাদি কোম্পানিগুলির স্বার্থ রক্ষায় চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করেছে যা ভারতের এই সস্তা ওষুধের মডেলকে ধ্বংস করতে পারে। ওষুধ শিল্প ও মেধাস্বত্ব-এর অধীনে ইইউ’র 'TRIPS-Plus' শর্তাবলী ভারতের জেনেরিক ওষুধ শিল্পে গভীর সঙ্কট তৈরি করবে।
এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ভারতীয় কোম্পানিগুলো মূল ওষুধের ‘ক্লিনিকাল ট্রায়াল ডেটা’ ব্যবহার করতে বাধার সম্মুখীন হবে। এর ফলে সস্তা জেনেরিক ওষুধ বাজারে আসতে ৩-৫ বছর অতিরিক্ত সময় লাগবে এবং জেনেরিক ওষুধের জোগানের অভাবে চিকিৎসার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে।
‘ডেটা এক্সক্লুসিভিটি’ এই চুক্তির সবচেয়ে ক্ষতিকর শর্ত। বর্তমানে, একটি ওষুধের পেটেন্ট শেষ হলে ভারতীয় জেনেরিক কোম্পানিগুলো মূল কোম্পানির নিরাপত্তা সংক্রান্ত ‘ক্লিনিকাল ট্রায়াল ডেটা’ ব্যবহার করে সস্তায় একইধনের ওষুধ তৈরি করতে পারে। ইইউ যদি 'ডেটা এক্সক্লুসিভিটি' বাধ্যতামূলক করে, তবে পেটেন্ট শেষ হওয়ার পরও ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে আরও ৫-১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে অথবা কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন করে ক্লিনিকাল ট্রায়াল করতে হবে। এর ফলে সস্তা জেনেরিক ওষুধ বাজারে আসতে কয়েক বছর দেরি হবে এবং খরচও হবে অনেক বেশি। যার ফলে ক্যানসারের ওষুধ বা ডায়াবেটিসের মতো জীবনদায়ী ওষুধের দাম সম্পূর্ণভাবেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
‘পেটেন্ট টার্ম এক্সটেনশন’ এই চুক্তির আর একটি বিপজ্জনক দিক। ইইউ দাবি করেছে, একটি ওষুধের অনুমোদনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় যদি দেরি হয়, তবে সেই হারানো সময় পোষাতে পেটেন্টের মেয়াদ ২০ বছরের পরেও বাড়াতে হবে। এতে জেনেরিক ওষুধের প্রবেশাধিকার আরও দীর্ঘায়িত হবে। ভারতের বর্তমান পেটেন্ট আইন Section 3(d) অনুযায়ী 'এভারগ্রিনিং' বা সামান্যতম পরিবর্তন করেও পেটেন্টের মেয়াদ বাড়ানো নিষিদ্ধ, কিন্তু ইইউ’র চাপে এই আইনি সুরক্ষা দুর্বল হয়ে গেল।
এই চুক্তির একটি বিতর্কিত অংশ হলো 'এনফোর্সমেন্ট' বা কার্যকরীকরণ। যদি ইউরোপের কোনও বন্দর দিয়ে ভারতের জেনেরিক ওষুধ অন্য কোনও উন্নয়নশীল দেশে যেমন আফ্রিকা বা অন্য কোনও দেশে পাড়ি দেয়, তবে ইইউ’র সেই রপ্তানিকে 'পেটেন্ট লঙ্ঘন' বা 'জাল ওষুধ' সন্দেহে বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা থাকবে। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং দরিদ্র দেশগুলোর ওষুধের অধিকার, এমনকি ন্যূনতম মানবাধিকারকেও লঙ্ঘন করে।
ভারতে গড়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ব্যয় হয় শুধুমাত্র ওষুধের জন্য। সস্তা জেনেরিক ওষুধ না থাকলে সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলো আরও রুগ্ন হয়ে পড়বে। এইচআইভি, যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস ছাড়াও অন্যান্য বিরল রোগের ওষুধ সরবরাহকারী হিসাবে ভারতের বিশ্বব্যাপী যে ভূমিকা রয়েছে, তাও সঙ্কটের মুখে পড়বে। চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস' (Médecins Sans Frontières, MSF) সতর্ক করেছে যে, ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি দরিদ্র দেশগুলোর জন্য 'মৃত্যুদণ্ড' হতে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপীয় ওষুধের মেধাস্বত্ব নিয়মগুলো মানলে ভারতের জেনেরিক ওষুধের রপ্তানি ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। ইইউ’র দাবি মেনে নিলে ভারতের উদ্ভাবনী ওষুধ কোম্পানিগুলো অর্থাৎ যারা নতুন গবেষণা করে, তারা লাভবান হতে পারে, কিন্তু ৯৫ শতাংশ জেনেরিক ওষুধ তৈরির কোম্পানি যারা সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধ তৈরি করে, তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কেন 'ডেটা এক্সক্লুসিভিটি' ভারতের জন্য ক্ষতিকর, তা নিচের সারণি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
ওষুধের ধরন পেটেন্ট থাকা অবস্থায় দাম টাকায় (গড়) জেনেরিক হওয়ার পর দাম টাকায় (গড়) দামের হ্রাস (শতাংশ)
ক্যান্সারের ওষুধ ১,৫০,০০০ ৮,০০০ - ১০,০০০ ৯৩ - ৯৫
এইচআইভি (HIV) ৫০,০০০ ৩,০০০ ৯৪
ভারতের ওষুধ শিল্পের জন্য এই চুক্তিটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইইউ’র শর্ত মেনে নিলে ভারতের ওষুধ শিল্পের প্রধান শক্তি সস্তায় গুণমান সম্পন্ন ওষুধ তৈরি— তা চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই ভারতের আলোচনায় প্রধান দাবি হওয়া উচিত ছিল 'ডেটা এক্সক্লুসিভিটি' এবং 'পেটেন্ট টার্ম এক্সটেনশন' থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি। কিন্তু এই প্রশ্নে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারত সরকার নির্লজ্জ আত্মসমর্পণের রাস্তাই বেছে নিয়েছে।
কৃষি ও দুগ্ধ শিল্প ক্ষেত্র
কৃষি ও দুগ্ধ শিল্প ক্ষেত্রে (Agri-Food Sector) যদিও কিছু প্রধান ফসল সুরক্ষিত রাখা হয়েছে, তবুও ইইউ থেকে সস্তা আমদানির ঝুঁকি রয়ে গেছে। অলিভ অয়েল, মার্জারিন এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনায় ভারতের স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। এছাড়াও রয়েছে অ-শুল্ক বাধা (Non-Tariff Barriers)। ইইউ’র কঠোর স্যানিটারি মানদণ্ডের কারণে ভারতের অনেক সবজি ও ফল রপ্তানির সময় 'অনিরাপদ' তকমা দিয়ে বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে বহুদিন ধরেই। এই চুক্তির ফলে ইচ্ছেমতো সেই কাজ করার লাইসেন্স পেয়ে গেল ইইউ-ভুক্ত দেশগুলি।
অটোমোবাইল সেক্টর
বিলাসবহুল ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার ফলে দেশীয় প্রিমিয়াম অটোমোবাইল শিল্পে গভীর মন্দা দেখা দেবে। শুল্ক কমার ফলে কোম্পানিগুলো ভারতে উৎপাদনের পরিবর্তে সরাসরি গাড়ি আমদানি করতে বেশি উৎসাহী হবে, যা ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করবে। মোদীজি’র ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-এর স্লোগান পালটে এখন হলো ‘মেক ইন ইউরোপ’।
অস্তিত্ব রক্ষার দুই শর্ত
ক. ভারতকে নিজস্ব একটি 'কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং সিস্টেম' দ্রুত কার্যকর করতে হবে। যদি ভারত দেশীয়ভাবে কার্বন কর আদায় করে, তবে আন্তর্জাতিক নিয়মানুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সেই পরিমাণ কর ছাড় দিতে হবে। এতে ভারতের টাকা ভারতেই থাকবে।
খ. সবুজ প্রযুক্তিতে রূপান্তর তহবিল তৈরি করতে হবে। ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের জন্য সরকার ও ব্যাঙ্কগুলোকে সম্মিলিতভাবে একটি 'কম সুদে ঋণ' বা 'ভরতুকি তহবিল' গঠন করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে 'গ্রিন হাইড্রোজেন' বা 'স্ক্র্যাপ-ভিত্তিক' উৎপাদনে উৎসাহিত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে।
গ. মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় কঠোর দর কষাকষি (IPR Safeguards) করতেই হবে। ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে ভারতকে স্পষ্ট দাবি করতে হবে, ‘ডেটা এক্সক্লুভিসিটি’ বা 'পেটন্ট টার্ম এক্সটেনশন’ কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না। ভারতের বর্তমান পেটেন্ট আইনের ৩(ডি) ধারা কোনও অবস্থাতেই শিথিল করা যাবে না, যাতে সস্তা জেনেরিক ওষুধের সরবরাহ অব্যাহত থাকে।
ঘ. অ-শুল্ক বাধা দূরীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। ইইউ’র কঠোর স্যানিটারি মানদণ্ড (SPS) মোকাবিলা করতে ভারতের রপ্তানি পণ্য পরীক্ষার ল্যাবরেটরিগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। ইইউ’র সাথে এমন একটি চুক্তি করতে হবে যাতে ভারতের স্বীকৃত ল্যাবরেটারির সার্টিফিকেট ইউরোপীয় বন্দরে সরাসরি গ্রহণযোগ্য হয়।
২০২৬ সালের এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ভারত ইইউ থেকে আমদানিকৃত ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যের ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে দেবে অথবা ব্যাপক হারে কমিয়ে দেবে। এর মধ্যে রয়েছে অটোমোবাইল যার শুল্ক ১১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৪০ শতাংশ, যা পরবর্তী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে আরও কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশে নিয়ে আসা হবে। একইভাবে ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর শুল্ক ১৫০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। লোহা ও ইস্পাত ২২ শতাংশ, ওষুধ ১১ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ৫০ শতাংশ এবং ভেড়ার মাংস ৩৩ শতাংশ— এগুলোর ওপর এই শুল্ক সম্পূর্ণ তুলেই দেওয়া হয়েছে।
শুল্কের এই ব্যাপক হ্রাসের ফলে ভারতের অটোমোবাইল, ওষুধ এবং যন্ত্রপাতি শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইইউ নিজেই পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে তাদের রপ্তানি ১০৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে অটোমোবাইল এবং ইলেকট্রিক্যাল মেশিনারির মতো ক্ষেত্রে আমদানির জোয়ার আসবে, যা ভারতের কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিলাসবহুল গাড়ি এবং ওয়াইনের দাম কমলে কেবল ধনীরাই লাভবান হবে, কিন্তু এই শুল্ক হ্রাসের ফলে শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংস হবে।
এছাড়াও, এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য হলো 'ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর'-কে শক্তিশালী করা, যেখানে ইজরায়েলের হাইফা বন্দরকে একটি প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন গাজায় গণহত্যার জন্য সমগ্র বিশ্ব ইজরায়েলকে 'বর্ণবাদী রাষ্ট্র' ঘোষণা এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে ইজরায়েলের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। এই সিদ্ধান্ত ভারতকে আগামী দিনে বিশ্বে আরও বেশি একঘরে করে দেবে নিঃসন্দেহে।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ধারাবাহিকভাবে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় ভারতীয় কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়ে এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদনের আগে দেশের সংসদে কোনও আলোচনাই করেনি বিজেপি সরকার।
ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি তখনই সফল হবে, যখন এটি একটি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তিতে পরিণত হবে। ভারত সরকারের উচিত ছিল কেবলমাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ভারতীয় কোম্পানিকে ইইউ’র বাজার পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোকে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া। এই চুক্তি বাতিল করে নতুন ভাবে আবার আলোচনায় বসা অত্যন্ত জরুরি দেশের মানুষের স্বার্থেই।
Post editorial
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি— কার লাভ?
×
Comments :0