কৌশিক দাম
আরও একবার চরম বঞ্চনার মুখে পড়ল উত্তরবঙ্গের চা শিল্প। রবিবার লোকসভায় পেশ হওয়া কেন্দ্রীয় বাজেটে উত্তরবঙ্গের ‘জীবনরেখা’ হিসেবে পরিচিত চা শিল্পের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা তো দূরের কথা, একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। কাজু, নারকেল কিংবা পশুপালনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের জন্য বিশেষ প্যাকেজের ঘোষণা থাকলেও কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে যুক্ত এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করায় তরাই-ডুয়ার্স জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার আবহ তৈরি হয়েছে।
বাজেটে চা শিল্পের ভবিষ্যৎ ও চা শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনও দিশা না থাকায় গোটা চা বলয় জুড়ে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। চা বাগান মজদুর ইউনিয়ন-সহ একাধিক বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন কেন্দ্রের এই উদাসীনতার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে। চা বাগান মজদুর ইউনিয়ন নেতা তিলক ছেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘এই বাজেট আবারও প্রমাণ করল বিজেপি সরকার চা শ্রমিকদের উন্নয়ন নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়। উন্নয়নের বড় বড় কথা শোনা গেলেও বাস্তবে চা বাগানের শ্রমিকরা বারবার ব্রাত্যই থেকে যাচ্ছেন। গোটা অঞ্চলের অর্থনীতি চা শিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের কোনও রূপরেখা এই বাজেটে নেই।’’
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলি থেকে। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলার কয়েক লক্ষ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বহু চা বাগান রুগ্ন অবস্থায় থাকলেও সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনও পরিকল্পনা বা আর্থিক সহায়তার কথা এবারের বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’র মানোন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং বা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়েও কেন্দ্র কোনও বিশেষ বরাদ্দ ঘোষণা করেনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, লোকসভা নির্বাচনের আগে চা বলয়ে বিজেপি নেতৃত্ব যে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির তালিকা তুলে ধরেছিল, এবারের বাজেট তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি তুলে ধরেছে। দীর্ঘদিন ধরেই চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও বন্ধ বাগান খোলার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি। কিন্তু বাজেটে সেই দাবিগুলিকে কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
চা বাগানের শ্রমিক অজয় মহালি বলেন,‘‘চাতক পাখির মতো আমরা বাজেটের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম এবার হয়তো আমাদের জন্য কিছু হবে। কিন্তু হতাশা ছাড়া কিছুই জুটল না। এখন আলাদা কোনও বিশেষ প্যাকেজের দাবিতে আন্দোলন ছাড়া আর পথ নেই।’’
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি মূলত চা, কাঠ ও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পরিবেশগত কারণে কাঠ শিল্প ক্রমশ সংকুচিত হওয়ায় চা শিল্পই ছিল এই অঞ্চলের প্রধান ভরসা। সেই ভরসার জায়গায় বারবার আঘাত আসায় শ্রমিক সংগঠনগুলি এবার আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায় ও কেন্দ্রীয় বঞ্চনার প্রতিবাদে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলে জানিয়েছে চা বাগান মজদুর ইউনিয়ন-সহ বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি।
UNION BUDGET 2026
কেন্দ্রীয় বাজেটে ব্রাত্য উত্তরবঙ্গের চা শিল্প ও শ্রমিক, তীব্র ক্ষোভ
×
Comments :0